এলএনজি সরবরাহে বাধা, গ্যাসের ঘাটতি বাড়ছে; বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ
দেশে জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই এখন আমদানিনির্ভর। ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আনতে হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট, যুদ্ধ, বৈরী আবহাওয়া কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই দেশের জ্বালানি সরবরাহে তার প্রভাব পড়ে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহে নানা ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেটি আংশিকভাবে চালু হলেও সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন করে এলএনজি সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
গ্যাসের অভাবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং সাধারণ মানুষ। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি নিতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সকে। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের সংকটে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা। একই সময়ে গরম বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে লোডশেডিংয়ে।
চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম
পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
কিন্তু বর্তমানে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি আরও বেড়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রায় ১৬৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে এলএনজি মিলিয়ে মোট সরবরাহ ছিল প্রায় ২১৩ কোটি ঘনফুট। গত তিন সপ্তাহের মধ্যে এটিই ছিল সর্বনিম্ন সরবরাহ।
অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৭ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, সমুদ্রের আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো কঠিন। নতুন একটি জাহাজ এলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেখান থেকে এলএনজি টার্মিনালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দুটি টার্মিনালের ওপর বড় নির্ভরতা
দেশে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। এই টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট। অন্যটি পরিচালনা করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট। এর সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট।
এই দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। ফলে কোনো একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে পুরো জ্বালানি ব্যবস্থায় তার বড় প্রভাব পড়ে।
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে এক ধাক্কায় গ্যাসের সরবরাহ অনেক কমে যায়। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশন—সবখানেই সংকট দেখা দেয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তখন সামিটের টার্মিনাল থেকে সক্ষমতার চেয়েও বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হয়। টানা চার দিন সামিট প্রতিদিন প্রায় ৫৭ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করে। পরে তা কমিয়ে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট করা হয়।
কিন্তু নতুন জাহাজ থেকে এলএনজি নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় গত সোমবার সন্ধ্যা সাতটার পর সামিটও সরবরাহ কমিয়ে দেয়। গতকাল সন্ধ্যায় সামিট থেকে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট এবং এক্সিলারেট থেকে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
এক টার্মিনাল বন্ধ হলেই বড় সংকট
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা যেহেতু আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, তাই যেকোনো ধরনের আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় সংকটের প্রভাব দ্রুত দেশের বাজারে পড়ে।
এবার একটি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। পরে সেটি আংশিক চালু হলেও সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ আবার কমেছে।
এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও বৈরী আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে একটি এলএনজি টার্মিনাল প্রায় সাড়ে তিন মাস বন্ধ ছিল। তখনও দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হয়েছিল।
এবারও সমুদ্রে আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় নতুন জাহাজ থেকে এলএনজি নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে টার্মিনাল থাকলেও প্রয়োজনের সময় তা পুরো সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।
বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে
জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘটনাও এখন বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। তখন গ্যাসের সরবরাহ কমে যায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়ে যায়।
এরপর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে আবারও জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ে। বাংলাদেশকেও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে চাপের মধ্যে পড়তে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ চলাচলে সমস্যা, বৈরী আবহাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়া—যেকোনো একটি কারণেই দেশের ভেতরে সংকট তৈরি হতে পারে।
এক টার্মিনালের মেরামতেও বন্ধ হতে পারে সরবরাহ
অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টার্মিনালটিতে মোট দুটি বয়লার রয়েছে। প্রতিটির সক্ষমতা প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট।
অক্ষত বয়লারটি ব্যবহার করে গত বৃহস্পতিবার আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়েছে। অন্য বয়লারটি চালু করার জন্য এখন কাজ চলছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। এ সময় বর্তমানে চালু থাকা বয়লারটিও বন্ধ রাখতে হবে। ফলে পরীক্ষার সময় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্তত ১২ ঘণ্টা টার্মিনালটি বন্ধ রাখার পর আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়ানো হবে।
তাই গ্যাসের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে—এমন ছুটির দিনে এই কাজ করার পরিকল্পনা করছে পেট্রোবাংলা। তবে এর আগে এক্সিলারেট এনার্জিকে পরীক্ষা ও গ্যাস সরবরাহ চালুর বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে।
পরিকল্পনাটি পাওয়ার পর জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ আর বাড়ার সম্ভাবনা নেই।
নতুন জাহাজ থেকে গ্যাস না পেলে সংকট আরও বাড়বে
গ্যাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে একটি এলএনজিবাহী জাহাজকে ঘিরে। জাহাজটি দেশে এলেও সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার কারণে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর করা যাচ্ছে না।
এই জাহাজ থেকে এলএনজি নেওয়া সম্ভব না হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশনসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন খাতে।
পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সমুদ্রের পরিস্থিতির উন্নতি হলে আজ বুধবার থেকে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেছেন, এলএনজির কার্গো বা জাহাজ কাছেই রয়েছে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে টার্মিনালে এলএনজি নেওয়া সম্ভব হয়নি। গ্যাসের সরবরাহ দ্রুত বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করছে জ্বালানি বিভাগ।
সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ সারি
গ্যাসের সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলেছে পরিবহন খাতে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি এমনকি জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক স্টেশনে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় চালকেরা এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরছেন।
সিএনজি সরবরাহ কমে গেলে শুধু পরিবহন ব্যয়ই বাড়ে না, মানুষের দৈনন্দিন চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। গণপরিবহনেও এর প্রভাব পড়ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলোও উৎপাদন ঠিক রাখতে পারছে না। কোথাও গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে, কোথাও আবার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ
দেশে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু গ্যাসের সংকটে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র চাহিদামতো উৎপাদন করতে পারছে না।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট কমেছে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি সরবরাহ কমে গেলে শুধু গ্যাসের সংকটই হয় না, এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমলে লোডশেডিং বাড়ে। আর লোডশেডিং বাড়লে শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়ে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে গ্যাসের একটি সংকট দ্রুত বিদ্যুৎ সংকটেও পরিণত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের চোখে মূল সমস্যা আমদানিনির্ভরতা
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা অনেক আগেই অতিরিক্ত আমদানিনির্ভর হয়ে গেছে। ফলে দেশের নিজস্ব উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার ঘাটতি পূরণ করতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, দেশে অনেক আগেই অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে। এই নির্ভরতা না থাকলে বর্তমান পরিস্থিতিতে হয়তো এত বড় সংকট তৈরি হতো না।
তাঁর মতে, জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করা গেলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপও কমত। পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা গেলে অনেক সংকট এড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু বিদেশ থেকে জ্বালানি এনে চাহিদা মেটানোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান, বিকল্প জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে।
সরকারের বক্তব্য
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার কাজ করছে।
গতকাল ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি বলেন, আগের সরকার টেকসই উন্নয়ন করেনি। এর ফলে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় সারা দেশে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এবং তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
একই সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। জ্বালানির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সরকার কাজ করছে।
সামনে কী হতে পারে
বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে সমুদ্রের আবহাওয়া এবং এলএনজি টার্মিনালগুলোর কার্যক্রমের ওপর।
আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে নতুন জাহাজ থেকে এলএনজি নেওয়া সম্ভব হবে। এতে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার মেরামত করে চালু করা গেলে সেখান থেকেও সরবরাহ বাড়বে।
তবে এসব ব্যবস্থা মূলত সাময়িক সমাধান। দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে।
দেশীয় গ্যাসের নতুন মজুত অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ একটি টার্মিনালে আগুন, সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা—এসব ঘটনা দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু এসব ঝুঁকির প্রভাব কতটা কমিয়ে আনা যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে দেশের নিজস্ব জ্বালানি অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার ওপর।
বর্তমান সংকট তাই শুধু সাময়িক গ্যাসের ঘাটতির বিষয় নয়। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নির্ভরযোগ্য ও বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে।
