রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির সব প্রস্তুতি শেষ
নিজস্ব প্রতিবেদক
শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান ও মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যা মামলার শুনানি শেষ হওয়ার পরই রামিসা হত্যা মামলার শুনানি শুরু হবে।
বুধবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এখন হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে এসেছে। একই সঙ্গে আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল করেছেন।
হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষ হওয়ার পর আদালত এ মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
শুনানির জন্য প্রস্তুত হাইকোর্ট
রামিসা হত্যা মামলার শুনানি শুরুর আগে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মামলার শুনানি করবেন।
এর আগে বেঞ্চ থেকে আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের জন্য সলিসিটরকে নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের ওই নির্দেশের পর ২৫ জুন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাফিজুর রহমান খানকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ফলে এখন মামলাটির শুনানির ক্ষেত্রে আসামিদের পক্ষে আইনগত প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, নুসরাত ও আছিয়া হত্যা মামলার শুনানি শেষ হওয়ার পর রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হবে।
কীভাবে এগোবে মামলার কার্যক্রম
বাংলাদেশের আইনে কোনো বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় কার্যকর করার আগে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ ধরনের মামলার নথি হাইকোর্টে এলে সেটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হয়।
পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বা জেল আপিল করতে পারেন।
রামিসা হত্যা মামলাতেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এখন হাইকোর্টে পর্যালোচনা হবে। আদালত মামলার নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন।
অন্যদিকে আসামিদের পক্ষ থেকেও তাঁদের আপিলের বিষয়গুলো আদালতের সামনে তুলে ধরা হবে।
বিচারিক আদালতে দুজনের মৃত্যুদণ্ড
রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করার ঘটনায় সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
মামলার বিচার শেষে ঢাকার শিশু অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেন।
আদালত অপরাধের ধরন ও এর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির রায় দেন।
রায়ের পর সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে কনডেম সেলে পাঠানো হয়।
পরে তাঁরা কারাগার থেকে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের রায় হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে আসে।
এখন হাইকোর্টে দুই পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই নিশ্চিত করতে হাইকোর্ট রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাফিজুর রহমান খানকে দুই আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২৫ জুন তাঁর নিয়োগ সম্পন্ন হয়।
এর ফলে হাইকোর্টে মামলাটির শুনানির সময় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের পক্ষে আইনজীবী তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারবেন।
মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষও নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরবে।
নুসরাত ও আছিয়া হত্যা মামলার পর
রামিসা হত্যা মামলার শুনানি এখনই শুরু হচ্ছে না। এর আগে হাইকোর্টে নুসরাত ও আছিয়া হত্যা মামলার শুনানি হবে।
এই দুটি মামলার শুনানি শেষ হওয়ার পরই রামিসা হত্যা মামলার শুনানি শুরু করার কথা রয়েছে।
ফলে রামিসা হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এখন হাইকোর্টের শুনানি।
আদালতে শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ তাঁদের আপিলের পক্ষে বক্তব্য দেবে।
ডেথ রেফারেন্সের গুরুত্ব
মৃত্যুদণ্ডের মামলায় হাইকোর্টের অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাপ।
বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেই সেই শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা যায় না। উচ্চ আদালতে মামলাটি পর্যালোচনা করা হয়।
হাইকোর্ট মামলার সব দিক পরীক্ষা করে দেখেন। বিচারিক আদালত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে কি না, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না এবং দেওয়া শাস্তি আইন অনুযায়ী যথাযথ কি না—এসব বিষয় আদালতের বিবেচনায় আসে।
রামিসা হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও এখন সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হবে।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর নতুন ধাপ
রামিসা হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর এখন মামলাটি উচ্চ আদালতের পর্যায়ে এসেছে।
দুই আসামি বর্তমানে কনডেম সেলে রয়েছেন। তাঁদের করা জেল আপিল এবং বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের ডেথ রেফারেন্স একসঙ্গে হাইকোর্টে শুনানি হবে।
এ কারণে মামলার পরবর্তী শুনানি আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ—দুই পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
হাইকোর্টের শুনানি শেষে আদালত বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখতে পারেন, পরিবর্তন করতে পারেন কিংবা আইন অনুযায়ী অন্য কোনো আদেশ দিতে পারেন।
তবে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডকে চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা যাবে না।
রামিসা হত্যা মামলার পটভূমি
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৯ মে রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সোহেল রানা সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এ অপরাধে তাঁকে সহযোগিতা করেন।
মামলাটির বিচার শেষে আদালত দুজনকেই দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায়ের পর দুই আসামিকে কারাগারের কনডেম সেলে পাঠানো হয়।
এরপর তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল করেন। একই সময়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়।
এখন সেই ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিলের ওপরই হাইকোর্টে শুনানি হবে।
কী সিদ্ধান্ত আসবে, নজর সেদিকে
রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হলে আদালতে মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
রাষ্ট্রপক্ষ বিচারিক আদালতের রায়ের পক্ষে যুক্তি দেবে। আসামিপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল বা পরিবর্তনের আবেদন জানাবে।
দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পাশাপাশি মামলার নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করবেন হাইকোর্ট।
এরপর আদালত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন।
তবে শুনানি কবে শুরু হবে, তা নির্ভর করছে নুসরাত ও আছিয়া হত্যা মামলার শুনানি শেষ হওয়ার ওপর।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দুটি মামলার শুনানি শেষ হলেই রামিসা হত্যা মামলার শুনানি শুরু হবে।
ফলে এখন সংশ্লিষ্ট সবার নজর হাইকোর্টের কার্যতালিকার দিকে।
