বিশেষ প্রতিনিধি
দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হলে তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, শুধু বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর না করে দেশের উদ্যোক্তাদেরও বড় পরিসরে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ—অ্যামচেমের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন।
অ্যামচেম সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চায় অ্যামচেম
সাক্ষাৎকালে অ্যামচেমের প্রতিনিধিরা জানান, প্রায় দুই মাস আগে সংগঠনটির নতুন কমিটি দায়িত্ব নিয়েছে। নতুন কমিটি বাংলাদেশে আরও বেশি মার্কিন বিনিয়োগ আনা এবং দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক আরও জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁদের উদ্দেশে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে বিনিয়োগের পরিবেশ অনুকূল। যারা এ দেশে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে সরকার।
অ্যামচেমের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সংগঠনটির সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের কর রাজস্বে সম্মিলিতভাবে ২০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে। এসব প্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে আরও ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আনতে তারা ভূমিকা রাখতে চায়। এ জন্য সরকারের সঙ্গে কাজ করার কথাও জানিয়েছে অ্যামচেম।
প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ আরও বাড়ানো গেলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আগ্রহও বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।
বৈঠকে অ্যামচেমের সহসভাপতি ও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ ও ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা উর রহমান মাহমুদসহ সংগঠনের নির্বাহী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড, ন্যাটকো বাংলাদেশ, অ্যাভেরি ডেনিসন, শপআপ এবং অ্যামচেমের নির্বাহী পরিচালকের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন।
বাংলাদেশে ভিসার প্রযুক্তি সেন্টার চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তিখাতের বিকাশে ভিসার একটি প্রযুক্তি উন্নয়ন কেন্দ্র বা গ্লোবাল সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভিসার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট স্টিফেন কার্পিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানিয়েছেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও প্রযুক্তির প্রসারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
স্টিফেন কার্পিন বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ভিসার আগ্রহের কথা জানান। একই সঙ্গে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে আগ্রহী ভিসা
বৈঠকে বাংলাদেশের আরও বেশি মানুষকে কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
ভিসার পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশে অনেক ব্যাংক হিসাবধারী এখনো কার্ড ব্যবহার করেন না। তাঁদের কার্ড ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়াতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও নিরাপদ, সহজ ও দ্রুত করার বিষয়েও কাজ করার আগ্রহের কথা জানান স্টিফেন কার্পিন।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল ও সেবাগ্রহণ সহজ করতে বিভিন্ন সরকারি ও জনসেবামূলক ব্যবস্থায় ডিজিটাল পেমেন্ট চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে মেট্রোরেল, টোল প্লাজা ও এক্সপ্রেসওয়েতে ভিসা কার্ড ব্যবহারের সুযোগ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমির বিকাশেও কাজ করতে আগ্রহী ভিসা। বিশেষ করে দেশের ফ্রিল্যান্সাররা যাতে তাঁদের বিদেশ থেকে পাওয়া আয় সহজ ও নিরাপদ উপায়ে দেশে আনতে পারেন, সে জন্য কার্যকর ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
‘দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করাই সরকারের লক্ষ্য’
দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় সরকার—এ কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি তাঁদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দেবে।
গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি পাটকল বেসরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রও শক্তিশালী হয়। সাধারণ মানুষকে অভাবের মধ্যে রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।
তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি দেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ বর্তমান অবস্থার চেয়ে ভালো জীবনযাপন করতে পারবে।
উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে সরকার
দেশের প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
তাঁর মতে, উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা গেলে একই সঙ্গে দুটি বড় সুবিধা পাওয়া যাবে। একদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষকে ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ তৈরি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য বিনিয়োগ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের পরিবেশ উন্নত করতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে অবশ্যই আসবে এবং সরকার তা চায়। তবে দেশের নিজস্ব উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরও উৎসাহিত করতে হবে। তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু নীতিগত সহযোগিতা প্রয়োজন, তা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সরকারের নীতির মূল লক্ষ্য হলো সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করা। সবার সহযোগিতায় একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
বন্ধ পাটকল আবার চালুর উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি বন্ধ পাটকল বেসরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে বিনিয়োগ করবে এবং এসব কারখানায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তিনটি মিলের দায়িত্ব নেওয়া দুই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে ধন্যবাদ জানান। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো সফল হবে এবং সেখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ পড়ে থাকলে সেখানে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হয়। তাই নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে সচল করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, বস্ত্র ও পাট সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী এবং হ্যামকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম মোস্তফা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
বিনিয়োগ বাড়লে বাড়বে কর্মসংস্থান
একই দিনে তিনটি পৃথক বৈঠক ও অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আনা নয়, দেশের উদ্যোক্তাদেরও বড় পরিসরে ব্যবসা ও শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করা। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বাড়িয়ে ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
ভিসার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল আর্থিক সেবা বাড়ানোর পাশাপাশি অ্যামচেমের মাধ্যমে মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বন্ধ শিল্পকারখানাকে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে আবার চালু করার চেষ্টা চলছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। এতে মানুষের আয় বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও একই বিষয় উঠে এসেছে—রাষ্ট্রের শক্তি শুধু রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। তাই সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

