‘কুৎসিত বোন’ বলে অপমান, অভিনয়ে ব্যর্থতার তকমা—শেষ পর্যন্ত জাতীয় পুরস্কার জিতেছিলেন সিম্পল কাপাডিয়া

বিনোদন ডেস্ক

তারকা পরিবারের সন্তান বা স্বজন হওয়া অনেকের জন্য আশীর্বাদ। পরিচিতি পেতে এতে সুবিধা হয়, সুযোগও আসে দ্রুত। কিন্তু একই সঙ্গে শুরু হয় তুলনা। নিজের পরিচয় তৈরি করার আগেই মানুষকে তুলনা করা হয় পরিবারের জনপ্রিয় সদস্যের সঙ্গে।

অভিনেত্রী ও কস্টিউম ডিজাইনার সিম্পল কাপাডিয়ার জীবনেও এমনটাই ঘটেছিল। তিনি ছিলেন বলিউড অভিনেত্রী ডিম্পল কাপাডিয়ার ছোট বোন। আবার অভিনেতা রাজেশ খান্নার শ্যালিকা। ফলে অভিনয়ে পা রাখার পর থেকেই তাঁকে ঘিরে ছিল বাড়তি আগ্রহ।

কিন্তু সেই পরিচয় তাঁর জন্য খুব একটা স্বস্তির ছিল না। বরং বড় বোন ডিম্পলের সঙ্গে চেহারা ও অভিনয়ের তুলনা, ‘কুৎসিত বোন’ বলে কটাক্ষ এবং প্রথম ছবির ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারের শুরুতেই কঠিন সময়ের মুখোমুখি হন তিনি।

অভিনেত্রী হিসেবে খুব বেশি সাফল্য পাননি সিম্পল। কিন্তু সেখানেই তাঁর গল্প শেষ হয়নি। অভিনয় ছেড়ে তিনি কস্টিউম ডিজাইনে মন দেন। নিজের প্রতিভা দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি করেন আলাদা পরিচয়।

শেষ পর্যন্ত ‘রুদালি’ ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে প্রমাণ করেন, তারকা পরিবারের পরিচয় নয়, নিজের যোগ্যতাই একজন মানুষকে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো করে তুলতে পারে।

বড় বোন ডিম্পলের ছায়ায় শুরু

১৯৭৩ সালে ‘ববি’ সিনেমা দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয় ডিম্পল কাপাডিয়ার। প্রথম ছবিতেই তিনি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। তাঁর সৌন্দর্য ও অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে যায় পুরো ভারত।

সেই সময় সিম্পল ছিলেন বোর্ডিং স্কুলের ছাত্রী।

বড় বোনের সাফল্য যখন চারদিকে আলোচনার বিষয়, তখন ছোট বোন সিম্পলও ধীরে ধীরে অভিনয়ে আসার প্রস্তুতি নেন।

১৯৭৭ সালে পরিচালক শক্তি সামন্তর ‘অনুরোধ’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় তাঁর। ছবিটির নায়ক ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি রাজেশ খান্না।

কিন্তু প্রথম ছবির অভিজ্ঞতা সিম্পলের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না।

প্রথম ছবিতেই কঠিন অভিজ্ঞতা

১৯৮৬ সালে সাংবাদিক সুস্মিতা রায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিম্পল তাঁর প্রথম ছবির শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছিলেন।

তাঁর অভিযোগ ছিল, রাজেশ খান্না নতুন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেননি। সিম্পল বলেছিলেন, তিনি তখন ভীষণ নার্ভাস ছিলেন। নতুন পরিবেশে কীভাবে অভিনয় করতে হবে, তা নিয়ে তাঁর স্বাভাবিকভাবেই ভয় ছিল।

কিন্তু রাজেশ খান্না তাঁর সঙ্গে সংলাপের মহড়াও করতেন না বলে অভিযোগ করেছিলেন সিম্পল।

তাঁর ভাষায়, রাজেশ তাঁকে ‘কাচরা’ বা আবর্জনার মতো ব্যবহার করতেন।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে যায় যে সিম্পল কান্নার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন।

বিষয়টি বুঝতে পেরে পরিচালক শক্তি সামন্ত হস্তক্ষেপ করেন। তিনি রাজেশ খান্নাকে বলেন, তিনি যত বড় তারকাই হোন না কেন, নতুন একজন শিল্পীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা উচিত।

এরপর রাজেশ খান্নার আচরণে পরিবর্তন আসে বলে জানিয়েছিলেন সিম্পল।

শ্যালিকা হয়েও সম্পর্ক ছিল দূরের

রাজেশ খান্না ছিলেন সিম্পলের ভগ্নিপতি। কিন্তু পারিবারিক সম্পর্ক খুব কাছের ছিল না বলেও একসময় জানিয়েছিলেন সিম্পল।

ডিম্পল কাপাডিয়ার সঙ্গে রাজেশ খান্নার বিয়ের পর একই পরিবারের অংশ হলেও তাঁদের মধ্যে খুব একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়নি।

সিম্পল রাজেশ খান্নাকে ‘বোঝা কঠিন একজন মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

অর্থাৎ, একই পরিবারের সদস্য হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গায় একটা দূরত্ব থেকেই গিয়েছিল।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চাপ সম্ভবত এসেছিল অন্য জায়গা থেকে।

‘কুৎসিত বোন’ বলে কটাক্ষ

‘অনুরোধ’ মুক্তির পর সিনেমাটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এরপর শুরু হয় সিম্পলকে নিয়ে নানা সমালোচনা।

সবচেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় ছিল, তাঁকে নিয়মিত বড় বোন ডিম্পলের সঙ্গে তুলনা করা হতো।

ডিম্পল তখন বলিউডের অন্যতম আলোচিত সুন্দরী। ফলে সিম্পলকে তাঁর সঙ্গে তুলনা করে অনেকেই চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করতেন।

একপর্যায়ে তাঁকে বলা হতে থাকে ‘কুৎসিত বোন’

এই মন্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন সিম্পল।

তিনি বলেছিলেন, ডিম্পল অসাধারণ সুন্দর—এ কথা তিনি ছোটবেলা থেকেই জানেন। কিন্তু কোনো সিনেমা ব্যর্থ হলেই তার দায় অভিনেত্রীর চেহারার ওপর চাপানো ঠিক নয়।

সিম্পলের বক্তব্য ছিল, একজন অভিনেত্রীর সাফল্য শুধু সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে না। অভিনয়, গল্প, পরিচালনা, দর্শকের পছন্দ—সবকিছু মিলেই একটি সিনেমার সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারিত হয়।

এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, নিজের চেহারা নিয়ে কটাক্ষ তাঁকে ভেঙে দিলেও তিনি তা মেনে নেননি।

অভিনয় ছিল না তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন

অভিনয়ে সিম্পল খুব বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন না।

তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, মূলত অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কারণে সিনেমায় এসেছিলেন।

প্রায় ২৫টি ছবিতে অভিনয় করার পর তিনি বুঝতে পারেন, অভিনয় তাঁর জন্য কাঙ্ক্ষিত জায়গা নয়।

তাই অন্য পথ বেছে নেন।

এই সিদ্ধান্তই পরে তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

তিনি চলে যান কস্টিউম ডিজাইনের জগতে।

পোশাক ডিজাইনেই খুঁজে পেলেন নিজের জায়গা

ডিম্পল কাপাডিয়ার চলচ্চিত্রে প্রত্যাবর্তনের সময় থেকেই তাঁর পোশাকের নকশা করতে শুরু করেন সিম্পল।

ধীরে ধীরে কাজ বাড়তে থাকে।

শুধু ডিম্পল নয়, শ্রীদেবী, মাধবীসহ বলিউডের একাধিক জনপ্রিয় অভিনেত্রীর পোশাকও ডিজাইন করেন তিনি।

অভিনয়ের সময় যে মানুষটি তুলনা ও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, এবার সেই মানুষটিই নিজের কাজের মাধ্যমে প্রশংসা পেতে শুরু করেন।

কস্টিউম ডিজাইনকে তিনি শুধু পোশাক তৈরি হিসেবে দেখেননি। চরিত্রের ব্যক্তিত্ব, গল্পের সময়কাল, পরিবেশ ও অভিনেত্রীর পর্দার উপস্থিতি—সবকিছুর সঙ্গে পোশাককে মিলিয়ে দেখতেন।

এই কাজেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় তাঁর আলাদা পরিচয়।

‘রুদালি’ এনে দিল জাতীয় পুরস্কার

সিম্পলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ১৯৯৪ সালে।

‘রুদালি’ সিনেমার জন্য সেরা পোশাক পরিকল্পনায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেন তিনি।

এই পুরস্কার তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

যে মানুষকে একসময় ‘কুৎসিত বোন’ বলা হয়েছিল, যে অভিনেত্রীকে তাঁর প্রথম ছবির ব্যর্থতার পর নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল, তিনিই এবার চলচ্চিত্রের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করলেন।

এটি শুধু একটি পুরস্কার ছিল না। নিজের যোগ্যতায় আলাদা পরিচয় তৈরি করার স্বীকৃতিও ছিল।

একের পর এক বড় ছবিতে কাজ

‘রুদালি’র পর সিম্পলের কাজের পরিধি আরও বাড়ে।

তিনি ‘ডর’, ‘বরসাত’, ‘চাচি ৪২০’, ‘দ্য হিরো: লাভ স্টোরি অব আ স্পাই’, **‘সোচা না था’**সহ একাধিক সিনেমায় কস্টিউম ডিজাইনের কাজ করেন।

অভিনেত্রী হিসেবে যতটা আলোচনায় আসতে পারেননি, কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে ততটাই সম্মান অর্জন করেন।

এখানেই তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

সব মানুষকে একই পথে সফল হতে হয় না।

কেউ অভিনয়ে সফল হন, কেউ পরিচালনায়, কেউ ক্যামেরার পেছনে থেকে সিনেমাকে সুন্দর করে তোলেন।

সিম্পল কাপাডিয়া দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।

ডিম্পলের সাফল্যের পেছনেও ছিল বোনের অবদান

ডিম্পল কাপাডিয়া নিজেও বিভিন্ন সময় সিম্পলের অবদানের কথা বলেছেন।

২০২৪ সালে ভোগ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিম্পল জানিয়েছিলেন, তাঁর প্রায় সব সিনেমার পোশাকই সিম্পল ডিজাইন করতেন।

ডিম্পলের জন্য পোশাক শুধু সাজসজ্জার বিষয় ছিল না। সঠিক পোশাক তাঁকে চরিত্রের মধ্যে ঢুকতে এবং ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করত।

অর্থাৎ, একসময় যে দুই বোনকে সৌন্দর্য নিয়ে তুলনা করা হতো, পরে তাঁদের পেশাগত সম্পর্কই হয়ে ওঠে একে অপরের শক্তি।

ডিম্পল ছিলেন পর্দার সামনে। সিম্পল ছিলেন পর্দার পেছনে।

দুজনেই নিজেদের জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন।

বড় বোনকে ঘিরেই ছিল সিম্পলের আলাদা টান

ব্যক্তিগত জীবনেও ডিম্পলের প্রতি সিম্পলের ভালোবাসা ছিল গভীর।

এক সাক্ষাৎকারে মজা করে তিনি বলেছিলেন, যদি কখনো বিয়ে করেন, তাহলে এমন কাউকেই বিয়ে করবেন, যার বাড়ি ডিম্পলের বাড়ির কাছাকাছি।

কারণ তিনি চাইতেন, তাঁর স্বামী যেন ডিম্পলের সঙ্গে সময় কাটানো নিয়ে আপত্তি না করেন।

এই কথার মধ্যেই বোঝা যায়, দুই বোনের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ ছিল।

বলিউডে তাঁদের নিয়ে যত তুলনাই হোক, ব্যক্তিগত জীবনে সিম্পলের কাছে ডিম্পল ছিলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ।

ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল ওঠানামা

১৯৯২ সালে সিম্পল রাজিন্দর সিং শেঠিকে বিয়ে করেন।

তবে সেই দাম্পত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়।

তাঁদের ছেলে করণ কাপাডিয়া পরবর্তী সময়ে বলিউডে অভিনয়ে আসেন।

সিম্পলের ব্যক্তিগত জীবন তাই খুব একটা মসৃণ ছিল না। পেশাগত জীবনের সংগ্রামের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

তবে এসবের মধ্যেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ কমেনি।

মাত্র ৫১ বছর বয়সে মৃত্যু

জীবনের শেষ অধ্যায়টি অবশ্য ছিল খুবই কঠিন।

সিম্পল কাপাডিয়া ক্যানসারে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ তিন বছর এই রোগের সঙ্গে লড়াই করার পর ২০০৯ সালে মাত্র ৫১ বছর বয়সে মারা যান তিনি।

জীবন ছিল ছোট, কিন্তু তাঁর পেশাগত যাত্রা ছিল বৈচিত্র্যময়।

অভিনেত্রী হিসেবে শুরু করেছিলেন। ব্যর্থতার তকমা পেয়েছেন। বড় বোনের সঙ্গে তুলনা সহ্য করেছেন। চেহারা নিয়ে অপমানিত হয়েছেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের শক্তি খুঁজে পেয়েছেন অন্য জায়গায়।

অপমানকে পেছনে ফেলে নিজের পরিচয়

সিম্পল কাপাডিয়ার জীবন তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর জীবনকাহিনি নয়।

এটি নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়ার গল্প।

বড় বোনের জনপ্রিয়তার কারণে তাঁর ওপর সব সময় তুলনার চাপ ছিল। প্রথম ছবির অভিজ্ঞতাও সুখকর ছিল না। এরপর তাঁকে ‘কুৎসিত বোন’ বলে অপমান করা হয়েছে।

কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি।

অভিনয় তাঁর জন্য নয় বুঝতে পেরে পেশা বদলেছেন। কস্টিউম ডিজাইনে মন দিয়েছেন। ধীরে ধীরে দক্ষতা দেখিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে দেখিয়েছেন, মানুষের দেওয়া তকমা একজন মানুষের শেষ পরিচয় নয়।

আজ সিম্পল কাপাডিয়া নেই। কিন্তু তাঁর কাজ রয়ে গেছে।

একসময় যাঁকে শুধু ‘ডিম্পল কাপাডিয়ার বোন’ হিসেবে দেখা হতো, পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন নিজের যোগ্যতায় পরিচিত একজন কস্টিউম ডিজাইনার।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted