মির্জা ফখরুলের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি; ‘ভোট মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, উন্নয়ন কোনো দলের আনুগত্যের পুরস্কার নয়’
প্রতিনিধি
রংপুরের মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন, সেটি তাঁদের নিজস্ব গণতান্ত্রিক অধিকার। কোনো অঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের রাজনৈতিক পছন্দকে শর্তযুক্ত করা যায় না—এমন মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলার ১১ জন সংসদ সদস্য।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে মঙ্গলবার রাতে রংপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা এসব কথা বলেন।
রাত আটটার দিকে রংপুর নগরের জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টারে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংসদ সদস্যরা বলেন, উন্নয়নের জন্য ক্ষমতাসীন দলকেই ভোট দিতে হবে—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। এ ধরনের চিন্তা একদলীয় শাসনের ধারণাকে উৎসাহিত করে।
তাঁরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য প্রত্যাহারেরও দাবি জানান।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্য নিয়ে আপত্তি
গত ৯ আগস্ট রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে একটি অনুষ্ঠানে রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সংবাদ সম্মেলনে তাঁর ওই বক্তব্যের অংশবিশেষ তুলে ধরে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা বলেন, মন্ত্রী রংপুরের মানুষ বিএনপির পরিবর্তে জাতীয় পার্টি বা জামায়াতকে ভোট দেওয়ার কারণে পিছিয়ে থাকার কথা বলেছেন।
তাঁদের মতে, কোনো এলাকার মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করবেন, তা তাঁদের ব্যক্তিগত ও সাংবিধানিক অধিকার। সেই রাজনৈতিক পছন্দের কারণে কোনো অঞ্চল উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হবে—এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রংপুরের মানুষ বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করায় উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে আছে—এমন ধারণা প্রকাশ করা শুধু রাজনৈতিকভাবে আপত্তিকর নয়, এটি রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিও অসম্মান।
‘ভোট মানুষের নিজস্ব অধিকার’
সংসদ সদস্যরা বলেন, বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা কোনো অঞ্চলের মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন, তা সম্পূর্ণভাবে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার।
কোনো সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শর্ত হিসেবে ভোটকে ব্যবহার করা যায় না। জনগণ যাঁকে বা যে দলকে সমর্থন করবেন, সেটি তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
তাঁদের বক্তব্য, একটি সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, তখন সেই সরকারকে দেশের সব নাগরিকের জন্য কাজ করতে হয়। সরকার শুধু যে দলকে ভোট দেওয়া হয়েছে, সেই এলাকার মানুষের জন্য কাজ করবে—এমন কোনো ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে থাকতে পারে না।
সংসদ সদস্যরা বলেন, সরকার পরিচালিত হয় জনগণের জন্য এবং জনগণের অর্থে। রাষ্ট্রের আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার পাওয়ার দাবিদার।
তাই কোনো অঞ্চলের মানুষ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করলে তাঁদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে—এমন ধারণা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
‘উন্নয়ন কোনো দলের পুরস্কার নয়’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রংপুরের উন্নয়ন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার হতে পারে না।
রংপুরের মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষের মতো সমান অধিকার ও ন্যায্য উন্নয়ন পাওয়ার অধিকার রাখেন। তাঁরা কোন দলকে ভোট দিয়েছেন বা ভবিষ্যতে কোন দলকে ভোট দেবেন, তার ওপর উন্নয়ন নির্ভর করতে পারে না।
সংসদ সদস্যরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলমত-নির্বিশেষে রংপুরের মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সে কারণে রংপুরের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
রংপুরের উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যা ও দীর্ঘদিনের দাবির কথা তুলে ধরেন সংসদ সদস্যরা।
তাঁরা বলেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রংপুর এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। এই বৈষম্য দূর করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
রংপুরের মানুষের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন।
এ ছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিও রয়েছে।
সংসদ সদস্যরা বলেন, এসব সমস্যা সমাধান করা সরকারের দায়িত্ব। কোনো এলাকার মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়েছেন, তার সঙ্গে এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়।
তাঁদের মতে, রংপুরের উন্নয়নকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত না করে মানুষের প্রয়োজন ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা নিতে হবে।
মাহবুবুর রহমান বেলালের বক্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল।
তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা। তাঁর কাছ থেকে এমন বক্তব্য প্রত্যাশিত নয়।
বেলালের মতে, এ ধরনের বক্তব্য সংবিধানে দেওয়া বাক্স্বাধীনতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এটি রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকারের প্রতিও অসম্মানজনক।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ বেছে নেবেন—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মানুষকে নির্দিষ্ট কোনো দলকে ভোট দেওয়ার সঙ্গে উন্নয়নকে যুক্ত করে দেখানো উচিত নয়।
সব অঞ্চলের জন্য সমান উন্নয়ন
সংসদ সদস্যরা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা।
কোনো অঞ্চলে যে দল বেশি ভোট পেয়েছে, শুধু সেই এলাকার উন্নয়ন হবে—এমন নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাঁদের মতে, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে হবে প্রয়োজন ও বৈষম্য দূর করার ভিত্তিতে। যে অঞ্চল তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে, সেখানে বরং বেশি গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম নেওয়া দরকার।
এই বিবেচনায় রংপুরের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও উন্নয়ন ঘাটতি দূর করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রশ্ন
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
তাঁরা বলেন, রংপুরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে আসছেন। তাঁদের রাজনৈতিক পছন্দকে কোনোভাবেই ভুল বা অজ্ঞতার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
একটি অঞ্চলের মানুষ কোনো নির্দিষ্ট দলকে ভোট না দিলে তাঁরা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এমন ধারণাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে যায় না।
ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাঁদের মতামত প্রকাশ করেন। নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করার সুযোগ থাকাই গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তাই রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক পছন্দকে সম্মান করার পাশাপাশি তাঁদের উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্যরা।
১১ সংসদ সদস্যের উপস্থিতি
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধার মোট ১১ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৩ আসনের মাহবুবুর রহমান বেলাল এবং রংপুর-৫ আসনের গোলাম রব্বানী।
নীলফামারীর চারটি আসনের মধ্যে নীলফামারী-১ আসনের আবদুস সাত্তার, নীলফামারী-২ আসনের আল ফারুক আব্দুল লতিফ, নীলফামারী-৩ আসনের ওবায়দুল্লাহ সালাফী এবং নীলফামারী-৪ আসনের আব্দুল মুনতাকিম সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া গাইবান্ধা-১ আসনের মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-২ আসনের আবদুল করিম, গাইবান্ধা-৩ আসনের নজরুল ইসলাম এবং গাইবান্ধা-৫ আসনের আব্দুল ওয়ারেছও উপস্থিত ছিলেন।
তাঁরা সবাই মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান এবং বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি তোলেন।
উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক শর্ত না দেওয়ার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে সংসদ সদস্যরা বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেই সেই দলের সমর্থকদের জন্য শুধু উন্নয়ন হবে—এমন ধারণা দেশের মানুষের মধ্যে তৈরি করা উচিত নয়।
সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো নাগরিক বা অঞ্চল বৈষম্যের শিকার হলে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
তাঁরা বলেন, জনগণ যে দলকে ভোট দেবেন, সেই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হবে। নির্বাচনের পর সরকারকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।
রংপুরের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করার দাবি জানান তাঁরা।
তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন দাবি
রংপুর অঞ্চলের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিস্তা নদীকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন সংসদ সদস্যরা।
তাঁরা তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান।
তাঁদের মতে, রংপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্পকারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রংপুরের মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
সংসদ সদস্যরা বলেন, এসব উন্নয়নমূলক কাজ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের বিনিময়ে দেওয়া উচিত নয়। এগুলো নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এবং সরকারের দায়িত্বের অংশ।
‘দলমত-নির্বিশেষে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে’
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে সরকারের প্রতি আবারও আহ্বান জানান জামায়াতের ১১ সংসদ সদস্য।
তাঁরা বলেন, রংপুরের মানুষ কোন দলকে ভোট দিয়েছেন বা দেবেন, সেটি তাঁদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের কারণে তাঁদের উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
রংপুরের উন্নয়নকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে না জড়িয়ে প্রয়োজন ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
তাঁদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার পাওয়ার যোগ্য। রংপুরের মানুষও দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষের মতো সমান সুযোগ, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
তাই রাজনৈতিক মতের পার্থক্য ভুলে দলমত-নির্বিশেষে রংপুরের মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।
সবশেষে তাঁরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু কোনো অঞ্চলের উন্নয়নকে মানুষের রাজনৈতিক পছন্দের সঙ্গে যুক্ত করা হলে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে এবং নাগরিকদের সমান অধিকারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়।

