ডারউইনে ইতিহাস বাংলাদেশের, অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বড় জয়

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমেই দুর্দান্ত জয় বাংলাদেশের। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটে লেখা হলো নতুন এক ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ। শুধু জয় নয়, সেটি এল টেস্টের চতুর্থ দিনেই এবং হাতে রয়ে গেল এক দিনেরও বেশি সময়।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয়। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদেরই হারিয়ে সেই ইতিহাসে যোগ হলো আরও বড় অর্জন।

জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিল মাত্র ৫৭ রান। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান দ্বিতীয় ওভারেই জস হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হয়ে ফিরে গেলেও তাতে বাংলাদেশের জয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক এরপর অনায়াসে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন।

সাদমান করেন অপরাজিত ২৫ রান। মুমিনুল অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে। ওয়েবস্টারের বলে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে চার মেরে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন মুমিনুল। সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারি থেকে ভেসে আসে একটাই স্লোগান—‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’।

মিরাজের ঘূর্ণিতে শেষ অস্ট্রেলিয়া

বাংলাদেশের জয়ের পথ তৈরি হয়েছিল মূলত প্রথম তিন দিনেই। চতুর্থ দিনের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া ছিল ৬ উইকেটে ২১৭ রান। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ৪২৬ রানের চেয়ে তারা তখনও ৬৭ রান পিছিয়ে।

ইনিংস হার এড়াতে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল আরও ৬৭ রান। হাতে ছিল ছয় উইকেট। পরিস্থিতি কঠিন হলেও ক্যামেরন গ্রিনের লড়াই অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা আশা দেখায়।

কিন্তু দিনের শুরুতেই বাংলাদেশের স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ বুঝিয়ে দেন, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে। সকালের উইকেট থেকে তিনি পেয়েছেন প্রয়োজনীয় টার্ন ও বাউন্স। অফ স্টাম্পের বাইরে তৈরি হওয়া ফুটমার্ক কাজে লাগিয়ে একের পর এক আক্রমণ চালান তিনি।

লাঞ্চের আগে তিনটি উইকেট তুলে নেন মিরাজ। এরপর লাঞ্চের পরও নিজের কাজ শেষ করেন তিনি। বো ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শেষ করে দেন এই অফ স্পিনার।

সব মিলিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজ নেন ৫ উইকেট। ২৪ ওভার বোলিং করে দেন ৬৬ রান। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তাঁর ১৫তম পাঁচ উইকেটের কীর্তি।

লাঞ্চের বিরতিতে নিজের বোলিংয়ের রহস্যও জানিয়েছেন মিরাজ। তাঁর লক্ষ্য ছিল খুব সহজ—অফ স্টাম্পের বাইরে ফুটমার্কে নিয়মিত বল করা। প্রতিটি বলে উইকেট নেওয়ার চেষ্টা না করে শৃঙ্খলা ধরে রাখাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা।

সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে।

গ্রিনের লড়াইয়ে শুধু হার ঠেকেছে

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে একাই লড়াই করেছেন ক্যামেরন গ্রিন। দলের অন্য ব্যাটসম্যানরা যখন একের পর এক ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন গ্রিন নিজের উইকেট আগলে রেখে বাংলাদেশের বোলারদের মোকাবিলা করেন।

শেষ পর্যন্ত ১০৪ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর সেঞ্চুরির কারণে অস্ট্রেলিয়া ইনিংস হারের লজ্জা থেকে বেঁচে যায়।

কিন্তু গ্রিনের একার লড়াই দলকে ম্যাচে ফেরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য দিতে পারে।

গ্রিনের সেঞ্চুরির পরও অস্ট্রেলিয়ার শেষ চারটি উইকেট খুব দ্রুত পড়ে যায়। মিরাজের ঘূর্ণিতে লেজের ব্যাটসম্যানরা কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেননি।

তবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসের পেছনে শুধু মিরাজ নন, বাংলাদেশের পেসার হাসান মাহমুদের অবদানও ছিল বড়। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া হাসান দ্বিতীয় ইনিংসে নেন ৩ উইকেট। দুই ইনিংস মিলিয়ে তাঁর শিকার ৯ উইকেট।

ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছে হাসান মাহমুদের হাতে।

প্রথম ইনিংসেই তৈরি হয়েছিল জয়ের ভিত

বাংলাদেশের এই জয় অবশ্য চতুর্থ দিনে হঠাৎ করে আসেনি। ম্যাচের প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা দারুণ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ করে ৪২৬ রান। ব্যাট হাতে বড় অবদান রাখেন তানজিদ হাসান। তাঁর সেঞ্চুরি বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। এরপর বাংলাদেশের বোলাররা অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করে দেয়।

ফলে প্রথম ইনিংসেই বাংলাদেশ পেয়ে যায় ২২৮ রানের বিশাল লিড।

এই লিডই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া যতই লড়াই করুক, বাংলাদেশের সামনে তখন জয় ছিল হাতের নাগালে।

অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রান করলেও সেটি বাংলাদেশের বড় লিডের কারণে খুব বেশি কাজে আসেনি। শেষ পর্যন্ত ৫৭ রানের লক্ষ্য পায় বাংলাদেশ।

শেষটা ছিল শুধুই আনুষ্ঠানিকতা

চতুর্থ দিনের সকালে অস্ট্রেলিয়া ইনিংস হার এড়াতে মরিয়া ছিল। বাংলাদেশের ৪২৬ রানের জবাবে তারা দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করছিল।

গ্রিন তখনও ক্রিজে। অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকেরা তাঁর কাছ থেকে বড় কিছু আশা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সেঞ্চুরি করে দলকে ইনিংস হার থেকে বাঁচান।

কিন্তু তাঁর সেঞ্চুরির পরও অস্ট্রেলিয়ার লড়াই বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।

মিরাজের ঘূর্ণিতে দ্রুত শেষ হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। ২৮৪ রানে অলআউট হওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে আসে ৫৭ রানের ছোট লক্ষ্য।

বাংলাদেশের শুরুটাও অবশ্য একেবারে নিখুঁত ছিল না। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান দ্বিতীয় ওভারেই ফিরে যান। জস হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হন তিনি।

তবে এরপর আর কোনো বিপদ হয়নি।

সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক ধীরে ধীরে রান তুলে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন। দুজনের ব্যাটিংয়ে ছিল আত্মবিশ্বাস ও নিয়ন্ত্রণ। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা আর কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি।

মুমিনুলের ব্যাট থেকে আসা চারেই নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক জয়।

গ্যালারিতে শুধু বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামের পরিবেশ বদলে যায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর আনন্দে গ্যালারিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।

চারদিকে তখন শুধু ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ স্লোগান।

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ড্রেসিংরুমের সামনে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করেন তাঁরা।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে নেমে আসে নীরবতা।

ম্যাচের শুরুতে যে মাঠে অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, শেষ দিনে সেখানে ছিল অন্য চিত্র। অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় যেন আগেই অনুমান করে নিয়েছিলেন স্থানীয় দর্শকেরা।

চতুর্থ দিনের গ্যালারিও ছিল ফাঁকা

টেস্টের প্রথম তিন দিনে ডারউইনের মাঠে ছিল উৎসবের পরিবেশ। কিন্তু চতুর্থ দিনে গ্যালারি অনেকটাই ফাঁকা।

ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও খুব কম অস্ট্রেলীয় দর্শক মাঠে এসেছিলেন। কারণ তৃতীয় দিন শেষেই ম্যাচের ফল অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।

স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জেও ছিল একই চিত্র। সাধারণত যেখানে সাবেক ক্রিকেটার, ক্রিকেট কর্মকর্তা ও স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভিড় থাকে, সেখানেও চতুর্থ দিনে কোনো ব্যস্ততা ছিল না।

ছিল না খাবারের আয়োজনও।

কারণ আয়োজকেরা ধরে নিয়েছিলেন, টেস্ট তৃতীয় দিনেই শেষ হয়ে যাবে। তাই চতুর্থ দিনের জন্য ওই লাউঞ্জের টিকিটও বিক্রি হয়নি।

শেষ পর্যন্ত টেস্ট চতুর্থ দিনে গড়ালেও অস্ট্রেলিয়ার অবস্থার উন্নতি হয়নি। ফলে নতুন করে টিকিট বিক্রির উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

মাঠে অস্ট্রেলিয়া লড়াইটা চতুর্থ দিন পর্যন্ত টেনে নিতে পেরেছিল। কিন্তু ডারউইনের দর্শকেরা যেন তৃতীয় দিন শেষেই বুঝে গিয়েছিলেন, এই ম্যাচের ইতিহাস এবার বাংলাদেশই লিখতে যাচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন অধ্যায়

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। এমন প্রত্যাবর্তনে জয় পাওয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম বড় সাফল্য।

তার ওপর জয়টি এসেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, তাদের নিজেদের মাঠে। ব্যবধানও ছোট নয়—৯ উইকেট।

বাংলাদেশের সামনে এখন সিরিজ জয়ের সুযোগ। দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে ১–০ ব্যবধানে।

এই ম্যাচে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দলীয় পারফরম্যান্স। ব্যাট হাতে তানজিদের সেঞ্চুরি, বোলিংয়ে হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত সাফল্য, মিরাজের স্পিন, আর দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার লড়াই ভেঙে দেওয়ার মতো বোলিং—সব মিলিয়েই এসেছে ঐতিহাসিক জয়।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য এটি আত্মবিশ্বাসেরও বড় বার্তা।

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়াম তাই আজ থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের একটি বিশেষ জায়গা হয়ে থাকল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ২৮৪ (ক্যামেরন গ্রিন ১০৪, স্টিভ স্মিথ ৪৪, মারনাস লাবুশেন ৩১, অ্যালেক্স ক্যারি ৩০, মিচেল স্টার্ক ১৮, নাথান লায়ন ১৫; মেহেদী হাসান মিরাজ ৫/৬৬, হাসান মাহমুদ ৩/৫৬, তাসকিন আহমেদ ১/৬৬, তাইজুল ইসলাম ১/৫১, ইবাদত হোসেন ০/৩৮)।

বাংলাদেশ: ৪২৬ ও ১/৫৭ (মুমিনুল হক ৩০*, সাদমান ইসলাম ২৫*, তানজিদ হাসান ০; জস হ্যাজলউড ১/৫, মিচেল স্টার্ক ০/১৫, নাথান লায়ন ০/২৩)।

ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচসেরা: হাসান মাহমুদ।
সিরিজ: দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted