‘রাহাত আরাই আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি’: মির্জা ফখরুল

রাজনীতির কঠিন সময়ে স্ত্রীর সাহস ও সহযোগিতার কথা স্মরণ করলেন বিএনপি মহাসচিব

ডেস্ক রিপোর্ট :
নিজের সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা কঠিন সময় ও সংকটে স্ত্রী যেভাবে পাশে থেকেছেন, সেই স্মৃতিও তুলে ধরেছেন তিনি।

সম্প্রতি একটি শীর্ষস্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিজের পারিবারিক জীবন, স্ত্রী এবং রাজনীতিতে তাঁর নেপথ্য সহযোগিতার কথা খোলামেলা বলেন মির্জা ফখরুল।

স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, রাহাত আরা বেগম তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। বিয়ের পরপরই তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। ফলে পরিবারকে নিয়ে শুরু হয় অনিশ্চিত এক জীবন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী সব পরিস্থিতি সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। আল্লাহর কাছে আমি সব সময় শুকরিয়া আদায় করি। আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে তাঁর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল।’

তিনি বলেন, শিক্ষকতার তুলনায় রাজনীতির জীবন ছিল অনেক বেশি অনিশ্চিত। রাজনীতিতে আসার পর কখনো জেল, কখনো মামলা, আবার কখনো নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে স্ত্রী কখনো তাঁকে নিরুৎসাহিত করেননি।

সংসারের দায়িত্ব সামলেছেন স্ত্রী

পারিবারিক জীবনের কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল জানান, তাঁর স্ত্রী দীর্ঘদিন একটি বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। সেই চাকরির আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি মেয়েদের পড়াশোনার খরচও বহন করেছেন।

রাজনীতিতে ব্যস্ততার কারণে পরিবারের প্রতি সব সময় প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারেননি মির্জা ফখরুল। সে সময় সংসারের অনেক দায়িত্বই স্ত্রীকে একাই সামলাতে হয়েছে।

তিনি জানান, মেয়েদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সময় পরিবারকে আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও চলতে হয়েছে। সন্তানদের নিয়ে সাধারণ গণপরিবহন ও টেম্পোতে যাতায়াত করতে হয়েছে। অনেক সময় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও তাঁর স্ত্রী সেসব নিয়ে অভিযোগ করেননি।

মির্জা ফখরুলের ভাষায়, জীবনের শুরুতে তাঁদের পথ মোটেও সহজ ছিল না। একদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে পরিবারকে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

তবে এসব পরিস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী ধৈর্য হারাননি। বরং নিজের চাকরি, সংসার এবং সন্তানদের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলে স্বামীকে রাজনৈতিক জীবনে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন।

গ্রেপ্তারের সময়ও ছিলেন সাহসী

রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর কথা বলতে গিয়ে মির্জা ফখরুল তাঁর স্ত্রীর সাহসিকতার বিশেষ প্রশংসা করেন।

তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে বাসায় এসেছে। এমন পরিস্থিতিতেও তাঁর স্ত্রী আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, পুলিশ যখন তাঁকে গ্রেপ্তার করতে আসত, তখন তাঁর স্ত্রী বিন্দুমাত্র বিচলিত হতেন না। বরং ধীরস্থিরভাবে তাঁর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতেন।

এমনকি ২০১৩ কিংবা ২০১৪ সালের এক গভীর রাতে পুলিশ তাঁদের বাসায় অভিযান চালানোর ঘটনাও স্মরণ করেন তিনি।

মির্জা ফখরুল বলেন, ওই রাতে পুলিশ বাসায় এলেও তাঁর স্ত্রী ভোর হওয়ার আগে দরজা খুলতে রাজি হননি। এর মধ্যে বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সাংবাদিকরাও তাঁদের বাসার সামনে উপস্থিত হন। পরে ভোরবেলায় দরজা খোলা হয়।

তাঁর মতে, ওই সময় তাঁর স্ত্রী যে সাহস দেখিয়েছেন, তা ছিল অসাধারণ।

বিপদের সময় ‘ঢাল’ হয়ে পাশে ছিলেন

রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ পথচলায় নানা সময় মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দলীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এসব সময়ে তাঁর স্ত্রী কখনো তাঁকে একা থাকতে দেননি বলে জানান তিনি।

মির্জা ফখরুল বলেন, প্রতিটি বিপদের সময় তাঁর স্ত্রী সাহস নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কখনো তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে বলেননি। বরং কঠিন পরিস্থিতিতে মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক জীবনে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী এসব প্রতিকূলতাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন। স্বামীর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে পরিবারকে যে চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা তিনি নীরবে সহ্য করেছেন।

নীরব প্রেরণা

মির্জা ফখরুলের মতে, একজন রাজনৈতিক নেতার সাফল্যের পেছনে শুধু তাঁর নিজের পরিশ্রম থাকে না। পরিবারের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যখন অনিশ্চয়তা ও সংকট তৈরি হয়, তখন পরিবারের সদস্যদের মানসিক সমর্থন বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

তাঁর স্ত্রীও দীর্ঘদিন ধরে সেই ভূমিকা পালন করেছেন বলে জানান বিএনপি মহাসচিব।

তিনি বলেন, জেল-জুলুম, রাজনৈতিক চাপ কিংবা নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁর স্ত্রী কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেননি। বরং নীরবে পাশে থেকে তাঁকে সাহস দিয়েছেন।

রাজনীতির কারণে পরিবারকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। বিশেষ করে সন্তানদের বড় করে তোলা, তাঁদের পড়াশোনা ও পারিবারিক নানা দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রীর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি—এমনটাই জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল।

অনিশ্চিত জীবনেও অভিযোগ করেননি

শিক্ষকতা থেকে রাজনীতিতে আসার পর মির্জা ফখরুলের জীবনে স্থিরতা কমে যায়। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে আয়-রোজগার ও পারিবারিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়।

কিন্তু এসব নিয়ে তাঁর স্ত্রী কখনো অভিযোগ করেননি বলে জানান তিনি।

বরং সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে স্বামীকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। চাকরি করার পাশাপাশি সন্তানদের দেখাশোনা এবং সংসারের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোও সামলেছেন।

মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে উঠে আসে, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য বা দীর্ঘ পথচলার পেছনে স্ত্রী রাহাত আরা বেগমের অবদান অনেকটাই নেপথ্যে থাকা একটি অধ্যায়।

পরিবারকে সময় দেওয়ার গুরুত্ব

সাক্ষাৎকারে নিজের পারিবারিক জীবনের কথা বলতে গিয়ে মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতার বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি মনে করেন, রাজনীতির ব্যস্ততার পাশাপাশি পরিবারকে ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার ও সাংগঠনিক দায়িত্বের মধ্যে। ফলে পরিবারের সঙ্গে সব সময় স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগ তাঁর হয়নি।

এই অবস্থায় স্ত্রী যেভাবে সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব সামলেছেন, সেটিকে তিনি নিজের জীবনের বড় পাওয়া হিসেবে দেখছেন।

স্ত্রীর ত্যাগের কথা স্মরণ

মির্জা ফখরুল বলেন, রাজনীতিতে থাকা একজন ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদেরও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও চাপের মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু রাহাত আরা বেগম কখনো সেই চাপকে স্বামীর ওপর বোঝা হিসেবে চাপিয়ে দেননি।

বরং তিনি নিজের মতো করে সব পরিস্থিতি সামলেছেন।

মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে স্ত্রীকে নিয়ে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর স্ত্রীকে শুধু জীবনসঙ্গী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ের একজন নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী হিসেবেও দেখেন।

‘আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান’

নিজের স্ত্রী সম্পর্কে বলতে গিয়ে মির্জা ফখরুলের সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো কৃতজ্ঞতা।

তিনি মনে করেন, জীবনের কঠিন সময়গুলোতে একজন সাহসী ও সহযোগী জীবনসঙ্গী পাশে থাকা বড় সৌভাগ্যের বিষয়। আর সে কারণেই রাহাত আরা বেগমকে তিনি তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আজও স্ত্রী তাঁর পাশে রয়েছেন—এটিকে নিজের সৌভাগ্য হিসেবেই দেখছেন বিএনপি মহাসচিব।

রাজনীতির মাঠে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পরিচিতি একজন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। তবে ব্যক্তিগত জীবনের এই স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—দীর্ঘ পথচলায় স্ত্রী রাহাত আরা বেগমের নীরব ত্যাগ, সাহস ও সহযোগিতা।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted