রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে তাঁর নামই আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে, মহাসচিব পদেও আসছে পরিবর্তন
ডেস্ক রিপোর্ট :
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। সবকিছু ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে পারে বিএনপি। দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব—দুই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকেই তাঁকে সরে দাঁড়াতে হবে।
এ কারণে মির্জা ফখরুলের পদত্যাগ এবং তাঁর জায়গায় কে আসছেন, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির মহাসচিব পদে পরিবর্তন এখন অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নতুন মহাসচিব কে হবেন, সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বৃহস্পতিবার মনোনয়ন জমা
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। এরপর ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান আলোচনার বিষয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির একাধিক নেতার নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর নাম বারবার সামনে এসেছে।
তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছে।
গত ১ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষমতা তারেক রহমানকে দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল নিজেই সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
‘আগে হোক, তারপর’
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় আসার পর থেকেই তাঁকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী। তাঁরা মন্ত্রীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাতে চাইলেও মির্জা ফখরুল বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি উৎসাহ দেখাননি।
শুভেচ্ছা জানাতে আসা ব্যক্তিদের উদ্দেশে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে হোক, তারপর।’
তবে পরে তিনি সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সচিবালয়ে অফিস করার পর তিনি বেইলি রোডের সরকারি বাসভবনে যান। সেখানেও সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের আনাগোনা ছিল।
মির্জা ফখরুল নিজেও রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর সম্ভাব্য মনোনয়ন নিয়ে এখনো সরাসরি কিছু বলেননি। গতকাল বিকেলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে এই মুহূর্তে তাঁর কিছু বলার নেই। ১৩ আগস্টের পর দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বিষয়টি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এ নিয়ে লুকোচুরির কিছু নেই। দলের সর্বোচ্চ ফোরাম আগেই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে—রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর বা সম্মতি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, মনোনয়ন ফরম তোলার সময় স্বাক্ষর বা সম্মতির প্রয়োজন নেই। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় স্বাক্ষরের বিষয়টি আসে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে অতিরিক্ত কিছু লেখা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদের নামও ছিল আলোচনায়
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একাধিক নেতার নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামও জোরালোভাবে আলোচনায় ছিল।
এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আবদুল মঈন খানের নামও দলের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
দলের নেতাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বিএনপির কঠিন সময়গুলোতে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে উপযুক্ত মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জাতীয় রাজনীতিতেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে।
এর পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে সংযত ও সজ্জন নেতা হিসেবেও তাঁর একটি আলাদা পরিচিতি রয়েছে।
দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল
বিএনপির রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ পথচলা। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।
দলের রাজনৈতিক সংকটের বিভিন্ন সময়ে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের নানা প্রতিকূলতার সময়ও তিনি নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। পরে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেও দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, দীর্ঘদিন মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের কারণে দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতাও দীর্ঘ।
এই কারণেই রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর নাম সামনে আসায় বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মহাসচিব পদে কে?
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসবেন, তা নিয়েও এখন আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রথম পর্যায়ে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেতে পারেন।
এরপর জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হতে পারে বলে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
তবে কাউন্সিলের আগেই দলের চেয়ারম্যান চাইলে কাউকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দিতে পারেন। ফলে রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেও পরবর্তী সময়ে তিনিই পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তাঁর বক্তব্য, দল তাঁকে যে দায়িত্ব দেবে, তিনি সেটিই পালন করবেন।
মির্জা ফখরুলের শেষ কর্মদিবস কবে?
দলীয় সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শেষ কর্মদিবস আজ অথবা বৃহস্পতিবার হতে পারে।
তবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার আগে মন্ত্রণালয়ের কিছু দায়িত্ব পালনের সুযোগ তাঁর থাকতে পারে। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর একই সঙ্গে মন্ত্রিসভা ও দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে কতটা সম্ভব—এ নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। তাই মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর মির্জা ফখরুলের দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে।
চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকলেও মির্জা ফখরুলের নামই বেশি আলোচিত হচ্ছে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চেয়ারম্যানই নেবেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দলের অভ্যন্তরে এবং স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা চলছে। প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আরও আলোচনা হতে পারে।
ভোট ২০ আগস্ট
নির্বাচন কমিশনের তপশিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে। ১৬ আগস্ট হবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ভোট হবে ২০ আগস্ট।
ওই দিন জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের বিধান রয়েছে। ফলে কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা গোপন থাকে না। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।
ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ কার্যত খুবই সীমিত।
নজর এখন বিএনপির সিদ্ধান্তে
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
তবে বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন ঘনিয়ে আসায় আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে একদিকে যেমন বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির আগমন ঘটবে, অন্যদিকে বিএনপির সরকার ও দলীয় সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষ করে মহাসচিব পদে কে আসছেন, ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কে দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে কাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়েই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর থাকায় আগামী বৃহস্পতিবারই অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

