চাকরির পরীক্ষায় প্রক্সি ঠেকাতে বায়োমেট্রিক, তল্লাশি ও ১২ দফা নির্দেশনা

ডেস্ক রিপোর্ট

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি বা ভুয়া পরীক্ষার্থী ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। লিখিত পরীক্ষা থেকে শুরু করে ভাইভা এবং চাকরিতে যোগদান—নিয়োগের প্রতিটি ধাপে প্রার্থীর পরিচয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি নিম্ন গ্রেডের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা ও চাকরিতে যোগদানের সময় জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। এরপর এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ করতে বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণসহ ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) এ বিষয়ে একটি অফিস স্মারক দেশের সব মন্ত্রণালয়, সচিব, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে তাদের অধীন দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে এসব নির্দেশনা জানাতে বলা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো—একজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা এবং চাকরিতে যোগদানের সময় একই ব্যক্তি কি না, তা নিশ্চিত করা। এ জন্য পরিচয় যাচাইয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদারের কথা বলা হয়েছে।

আবেদনের ছবিও হবে সাম্প্রতিক

নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি বন্ধের প্রথম ধাপ হিসেবে আবেদনপত্র যাচাইয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চাকরির আবেদনে প্রার্থীর সাম্প্রতিক রঙিন ছবি ব্যবহার করতে হবে। ছবিটি আবেদনের সময় থেকে এক মাসের মধ্যে তোলা হতে হবে।

লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার আগে প্রতিটি আবেদনপত্র ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। প্রার্থীর ছবি, নাম, পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য ঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্তৃপক্ষ মনে করছে, আবেদনের সময় থেকেই তথ্য যাচাই করা হলে পরবর্তী ধাপে ভুয়া পরীক্ষার্থী প্রবেশের সুযোগ কমবে।

পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর তল্লাশি

পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সময়ও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, পরীক্ষাকেন্দ্রে ব্যাগ, বই কিংবা কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে পরীক্ষার্থীদের মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করতে হবে।

নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কোনো প্রার্থীকে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। এতে পরীক্ষার মাঝপথে বাইরে থেকে কেউ এসে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে না।

শুধু পরীক্ষার্থীদের নয়, পরীক্ষা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো ডিভাইস ব্যবহারে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

প্রবেশপত্রের ছবি মিলিয়ে দেখতে হবে

পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সময় প্রার্থীর পরিচয় যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রবেশপত্র ও হাজিরা শিটে থাকা ছবির সঙ্গে পরীক্ষার্থীর চেহারা মিলিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে নাম, রোল নম্বরসহ অন্যান্য তথ্যও পরীক্ষা করতে হবে।

সম্ভব হলে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর ছবি তুলে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ভাইভা ও চাকরিতে যোগদানের সময় ওই ছবি ব্যবহার করে প্রার্থীর পরিচয় মিলিয়ে দেখা হবে। অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষায় যে ব্যক্তি অংশ নিয়েছেন, পরবর্তী ধাপেও তিনিই আছেন কি না, তা নিশ্চিত করা হবে।

ভাইভায় হাতের লেখাও পরীক্ষা

প্রক্সি পরীক্ষার্থী শনাক্ত করতে শুধু ছবি বা পরিচয়পত্রের ওপর নির্ভর করতে চায় না সরকার। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীর হাতের লেখাকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মৌখিক পরীক্ষার সময় প্রার্থীর হাতের লেখা পরীক্ষা করতে হবে। লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্রে থাকা হাতের লেখার সঙ্গে ভাইভার সময় নেওয়া হাতের লেখার মিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

এতে লিখিত পরীক্ষায় একজন এবং ভাইভায় অন্য একজন অংশ নেওয়ার সুযোগ কমবে।

কর্তৃপক্ষ মনে করছে, কোনো প্রার্থী যদি প্রক্সির মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষা দেন, পরে প্রকৃত প্রার্থী ভাইভায় উপস্থিত হলে হাতের লেখার পার্থক্য ধরা পড়তে পারে।

চাকরিতে যোগদানের সময়ও পরিচয় যাচাই

শুধু লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত পরিচয় যাচাই সীমাবদ্ধ থাকবে না। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থী চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়ও তার পরিচয় আবার নিশ্চিত করতে হবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভার সময় তোলা ছবি এবং সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে যোগদানের সময় উপস্থিত প্রার্থীর ছবি ও পরিচয় মিলিয়ে দেখতে হবে।

সব তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করার পরই নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যোগদানপত্র দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ একজন ব্যক্তি পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে একই ব্যক্তি কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ চূড়ান্ত হবে না।

বায়োমেট্রিক ব্যবস্থায় জোর

নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা।

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে একই ব্যক্তি অংশ নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর মাধ্যমে প্রার্থীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে সংরক্ষণ ও যাচাই করা সম্ভব হবে। ফলে একজনের হয়ে অন্য কেউ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আরও কঠিন হয়ে যাবে।

প্রয়োজন অনুযায়ী বায়োমেট্রিকের পাশাপাশি অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা

নিয়োগ পরীক্ষার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।

পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল কোর্ট বা সামারি ট্রায়াল পরিচালনার প্রয়োজন হলে যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে জন্য আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে।

কোনো ভুয়া বা প্রক্সি পরীক্ষার্থী ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রক্সি ধরা পড়লে ছাড় নয়

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভুয়া বা প্রক্সি পরীক্ষার্থী শনাক্ত হলে বিষয়টি শুধু পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে বহিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।

তার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট, সামারি ট্রায়াল অথবা নিয়মিত মামলা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ পরীক্ষায় জালিয়াতির চেষ্টা করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হবে।

একই সঙ্গে জালিয়াতির সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তিন ধাপেই নজরদারি

সরকারের নতুন নির্দেশনায় নিয়োগ পরীক্ষার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা এবং চাকরিতে যোগদান।

প্রথম ধাপে আবেদন ও ছবির তথ্য যাচাই করা হবে। এরপর পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সময় পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। লিখিত পরীক্ষার পর প্রার্থীর ছবি ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।

দ্বিতীয় ধাপে ভাইভার সময় প্রার্থীর ছবি, পরিচয় ও হাতের লেখা যাচাই করা হবে। এরপর চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হলে চাকরিতে যোগদানের সময় আবার তার পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।

এভাবে পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিকবার যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কেন এই কঠোর ব্যবস্থা

সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রক্সি বা জালিয়াতির ঘটনা পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। একজন যোগ্য প্রার্থী নিজের যোগ্যতায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে চাকরি পাওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন, অন্যদিকে জালিয়াতির মাধ্যমে অযোগ্য কেউ চাকরি পেয়ে যেতে পারেন।

এ ধরনের ঘটনা নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও কমিয়ে দেয়। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনায় শুধু প্রক্সি পরীক্ষার্থী নয়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও পরিচয় যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর

নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।

বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ, ছবি সংরক্ষণ, হাতের লেখা যাচাই, তল্লাশি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা—সবকিছু মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রক্সি পরীক্ষার্থী ও বিভিন্ন ধরনের নিয়োগ জালিয়াতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত প্রার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে।

সরকারি চাকরির পরীক্ষায় একজন প্রার্থী যেন নিজের যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতেই প্রতিযোগিতা করতে পারেন—নতুন ১২ দফা নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য এখন সেটিই।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted