কাগুজে নোটের অর্ধেকই ৫০০ ও ১০০০ টাকা, সবচেয়ে কম ২০০ টাকার

ডেস্ক রিপোর্ট

দেশে ব্যাংক ও মানুষের হাতে থাকা কাগুজে টাকার বড় একটি অংশই ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারে থাকা মোট কাগুজে নোটের প্রায় ৪৯ শতাংশই এই দুই মূল্যমানের। বিপরীতে সবচেয়ে কম রয়েছে ২০০ টাকার নোট।

গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক ও মানুষের হাতে বিভিন্ন মূল্যমানের মোট ৯৬৬ কোটি ৫৪ লাখ ৮২ হাজার ৪১৮টি কাগুজে নোট ছিল। এসব নোটের মোট মূল্য প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ফলে মোট কাগুজে নোটের সংখ্যা ও মূল্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে এই দুই মূল্যমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সংখ্যার হিসাবে বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ৫০০ টাকার নোট। গত জুন শেষে এ মূল্যমানের নোট ছিল প্রায় ২৭০ কোটি। এসব নোটের মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে মোট আর্থিক মূল্যের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ১০০০ টাকার নোট। গত জুন শেষে বাজারে প্রায় ২০৩ কোটি ৭৮ লাখ ৮৫ হাজারটি ১০০০ টাকার নোট ছিল। এসব নোটের মোট মূল্য প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং নগদ অর্থ ব্যবহারে বড় মূল্যমানের নোটের ওপর নির্ভরতা এখন অনেক বেশি। বিশেষ করে বড় অঙ্কের কেনাকাটা, ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলন এবং বিভিন্ন ধরনের লেনদেনে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের ব্যবহার বেশি হচ্ছে।

সবচেয়ে কম ২০০ টাকার নোট

বাজারে থাকা বিভিন্ন মূল্যমানের কাগুজে নোটের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে কম ২০০ টাকার নোট। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুন শেষে দেশে ২০০ টাকার নোট ছিল ৫২ কোটি ৮৯ লাখ ২ হাজার ৩৪৯টি। এসব নোটের মোট মূল্য প্রায় ১০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা।

২০০ টাকার নোটের তুলনায় ১০০ টাকার নোট রয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। গত জুন শেষে বাজারে ১০০ টাকার নোট ছিল প্রায় ১১৭ কোটি ১৮ লাখ ৮৬ হাজারটি। এসব নোটের মোট মূল্য প্রায় ১১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ছোট মূল্যমানের নোটগুলোর মধ্যে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটের ব্যবহার সংখ্যায় বেশ উল্লেখযোগ্য হলেও মোট আর্থিক মূল্যের দিক থেকে এগুলোর অবদান অনেক কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে থাকা ৯৬৬ কোটি ৫৪ লাখের বেশি কাগুজে নোটের মধ্যে প্রায় ৩২৩ কোটি নোট হলো ১০, ২০ ও ৫০ টাকার। কিন্তু এই তিন মূল্যমানের নোটের সম্মিলিত আর্থিক মূল্য মাত্র ৭ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ১০ টাকার নোট রয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি। ২০ টাকার নোট রয়েছে প্রায় ৯৪ কোটি এবং ৫০ টাকার নোটের সংখ্যা ৭৯ কোটির বেশি।

ছোট লেনদেনে ১০ টাকার নোটের ব্যবহার বেশি

দেশের ছোটখাটো দৈনন্দিন লেনদেনে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটের ব্যবহার বেশি। রিকশাভাড়া, চা-নাশতা, বাসভাড়া কিংবা অল্প পরিমাণের কেনাকাটায় এসব নোট নিয়মিত হাতবদল হয়।

বিশেষ করে ১০ টাকার নোটের ব্যবহার অনেক বেশি। এ কারণে একটি নোট অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক মানুষের হাতে যায়। বেশি হাতবদলের ফলে নোট দ্রুত পুরোনো, ময়লা ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে ১, ২ ও ৫ টাকার কাগুজে নোট এখন বাজারে প্রায় দেখা যায় না। এসব মূল্যমানের ধাতব মুদ্রা বা কয়েন থাকলেও সাধারণ মানুষ সেগুলো পকেটে বহন করতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। ফলে কার্যত ১০ টাকার নোট থেকেই ছোট মূল্যমানের কাগুজে নোটের ব্যবহার শুরু হচ্ছে।

বড় নোটের সংখ্যা বাড়ার কারণ কী

অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাজারে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বেশি থাকার পেছনে অন্যতম কারণ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় একই ধরনের পণ্য কিনতে এখন বেশি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। এতে বড় মূল্যমানের নোটের চাহিদা বেড়েছে।

একসময় যে পরিমাণ পণ্য কিনতে ১০০ বা ২০০ টাকা যথেষ্ট ছিল, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তার জন্য ৫০০ টাকা বা তার বেশি প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন কেনাকাটাতেও বড় নোটের ব্যবহার বাড়ছে।

উদাহরণ হিসেবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে এক কেজির বেশি ওজনের একটি ব্রয়লার মুরগি কিনতেই ২০০ টাকার বেশি খরচ হয়। ফলে বাজারে ৫০০ বা ১০০০ টাকার নোটের প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় বেড়েছে।

এ ছাড়া ব্যাংকের এটিএম বুথেও সাধারণত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বেশি রাখা হয়। বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলন বা ব্যাংকে নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রেও এই দুই মূল্যমানের নোট বেশি ব্যবহৃত হয়।

ফলে মানুষের হাতে যেমন বড় নোট বেশি থাকছে, তেমনি ব্যাংকিং ব্যবস্থাতেও এসব নোটের চাহিদা বেশি।

চাহিদা অনুযায়ী সব নোট ছাপানো যাচ্ছে না

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে কোন মূল্যমানের কত নোট প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত হিসাব ও জরিপ করে। জনগণের চাহিদা, নোটের ব্যবহার, কত দ্রুত একটি নোট হাতবদল হচ্ছে, নোটের স্থায়িত্ব এবং আগের মজুত—এসব বিষয় বিবেচনা করেই নতুন নোট ছাপানোর পরিকল্পনা করা হয়।

তবে বর্তমানে ছোট মূল্যমানের কিছু নোটের ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের তুলনায় ছোট মূল্যমানের নোট এখন সংখ্যায় কম। বিশেষ করে ২০ ও ১০০ টাকার নোট প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ে সময়ে ছাপানো সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, এসব নোট ছাপানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজের সংকট থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সময়ে নোট বাজারে ছাড়া যায়নি। আবার ১০ টাকার নোটের ব্যবহার বেশি হওয়ায় সেগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

একটি নোট বেশি হাতবদল হলে সেটি দ্রুত ছেঁড়া, ময়লা বা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পুরোনো নোট তুলে নিয়ে তার জায়গায় নতুন নোট বাজারে ছাড়তে কিছুটা সময় লাগে। ফলে কোনো কোনো সময় বাজারে ছোট নোটের সংকট তৈরি হয়।

পুরোনো ও জীর্ণ নোট নিয়ে ভোগান্তি

দেশে প্রচলিত কাগুজে নোটের একটি বড় অংশ বেশ পুরোনো। সময়মতো পর্যাপ্ত পুরোনো নোট বাজার থেকে তুলে নিয়ে নতুন নোট প্রতিস্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় মানুষের হাতে থাকা অনেক নোট এখন ছেঁড়া, ফাটা ও জীর্ণ।

বিশেষ করে ছোট মূল্যমানের নোট বেশি হাতবদল হওয়ায় এগুলো দ্রুত নষ্ট হয়। বাজারে এসব নোটের চাহিদা থাকলেও নতুন নোট সরবরাহে কিছুটা সময় লাগায় পুরোনো নোটই অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ছেঁড়া বা অতিরিক্ত জীর্ণ নোট নিয়ে সাধারণ মানুষকে দোকানপাট ও বিভিন্ন লেনদেনে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অনেক দোকানি বা ব্যবসায়ী এমন নোট নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে একটি নোট বৈধ মুদ্রা হওয়া সত্ত্বেও সেটি ব্যবহার করতে গিয়ে মানুষ সমস্যায় পড়েন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিতভাবে পুরোনো ও ব্যবহার অনুপযোগী নোট তুলে নেওয়া এবং তার পরিবর্তে নতুন নোট বাজারে সরবরাহ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। তবে কাগজের সরবরাহ, নোট ছাপানোর খরচ ও অন্যান্য বাস্তব সমস্যার কারণে সব সময় চাহিদা অনুযায়ী নোট সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।

নোট ছাপানোর খরচ বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন নোট ছাপানোর ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও ডলারের দামও বেড়েছে। এসব কারণে ব্যাংক নোট তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে। এর ফলে নোট ছাপানোর খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

একদিকে নোটের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে বাজারে নগদ টাকার চাহিদাও রয়েছে। এ অবস্থায় পুরোনো নোট দ্রুত তুলে নিয়ে নতুন নোট সরবরাহ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য একটি বড় ব্যয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মানুষ যেন নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনে বেশি অভ্যস্ত হয়, সে লক্ষ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বাংলা কিউআর কোডও চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে মানুষের হাতে নগদ টাকার প্রয়োজন কমবে। এতে নতুন নোট ছাপানোর প্রয়োজনীয়তাও কমে আসবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।

বাজারে যত কাগুজে টাকা, তার বিপরীতে সম্পদ

কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলেই ইচ্ছামতো টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়তে পারে না। কাগুজে নোট বাজারে ছাড়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২-এর ৩০ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে যে পরিমাণ ব্যাংক নোট ছাড়বে, তার সমপরিমাণ আর্থিক মূল্যের ভৌত ও আর্থিক সম্পদ জামানত হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়।

অর্থাৎ বাজারে যত টাকার কাগুজে নোট প্রচলিত রয়েছে, তার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সমপরিমাণ মূল্যমানের সম্পদ থাকতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে প্রচলিত কাগুজে নোটের মোট মূল্য ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এই নোটের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সমপরিমাণ মূল্যমানের বিভিন্ন সম্পদ সংরক্ষিত রয়েছে।

এই সম্পদের মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা, সরকারি সিকিউরিটিজ, সোনা, রুপা এবং ধাতব মুদ্রা। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া কিছু স্বল্পমেয়াদি ঋণ ও অগ্রিমও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এই জামানত সম্পদের অংশ হিসেবে গণ্য হয়।

জামানতের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রা

ব্যাংক নোটের বিপরীতে সংরক্ষিত জামানত সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশ হলো অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, নোটের বিপরীতে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষিত রয়েছে। এটি মোট জামানত সম্পদের প্রায় ৮১ শতাংশ।

অর্থাৎ বাজারে থাকা কাগুজে টাকার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংরক্ষিত সম্পদের বড় অংশই বৈদেশিক মুদ্রা।

বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রেও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে কাজ করে। দেশের বৈদেশিক লেনদেন, আমদানি ব্যয় এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ কাঠামোরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দ্বিতীয় অবস্থানে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড

ব্যাংক নোটের বিপরীতে জামানত হিসেবে দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্পদ হলো বাংলাদেশ সরকারের ইস্যু করা ট্রেজারি বিল ও বন্ড।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব সরকারি সিকিউরিটিজের মূল্য প্রায় ৪৫ হাজার ৯৯৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে যে ঋণ দেয়, তার বিপরীতে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড গ্রহণ করা হয়। এসব সিকিউরিটিজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ব্যাকআপ বা গ্যারান্টি সম্পদ হিসেবে থাকে।

ফলে বাজারে প্রচলিত নোটের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার পর সরকারি সিকিউরিটিজও গুরুত্বপূর্ণ জামানত হিসেবে কাজ করছে।

নোটের বিপরীতে সোনার মজুতও রয়েছে

কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে সোনা রাখার প্রথা অনেক পুরোনো। আন্তর্জাতিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সোনাকে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও প্রচলিত ব্যাংক নোটের বিপরীতে সোনা ও রুপা সংরক্ষিত রয়েছে।

বর্তমানে নোটের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রায় ২১ হাজার ৭৩৪ কোটি ১১ লাখ টাকা মূল্যমানের সোনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যমানের রুপাও রয়েছে।

সোনা ও রুপা মিলিয়ে এই সম্পদের মূল্য নোটের বিপরীতে মোট জামানতের প্রায় ৬ শতাংশ।

ঋণ ও কয়েনও জামানতের অংশ

বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক ও সরকারি সংস্থাকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং অগ্রিম সুবিধা দিয়ে থাকে। এসব ঋণের একটি অংশও নোটের বিপরীতে সংরক্ষিত জামানত সম্পদের ব্যাকআপ হিসেবে গণ্য করা হয়।

এ ধরনের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বাজারে প্রচলিত ১, ২ ও ৫ টাকার ধাতব মুদ্রা বা কয়েনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সঞ্চিত থাকলে তা ব্যাংক নোটের বিপরীতে জামানত হিসেবে হিসাব করা হয়। এ ধরনের ধাতব মুদ্রার মূল্য প্রায় ৪৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

নগদ অর্থের ব্যবহার কমানোর তাগিদ

বাংলাদেশে এখনো দৈনন্দিন লেনদেনের বড় অংশ নগদ টাকার মাধ্যমে হয়। বিশেষ করে ছোট ব্যবসা, বাজার, পরিবহন ও ব্যক্তিগত লেনদেনে কাগুজে নোটের ব্যবহার বেশি।

তবে নোট ছাপানো ও বাজারে সরবরাহের ব্যয় বাড়তে থাকায় নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলা কিউআর কোডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর উদ্দেশ্যও হলো মানুষকে ধীরে ধীরে নগদ অর্থের বিকল্প ব্যবহারে অভ্যস্ত করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে শুধু নোট ছাপানোর খরচই কমবে না, বরং নগদ টাকা বহন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার খরচও কমবে।

সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশের কাগুজে টাকার বাজারে বড় নোটের আধিপত্য স্পষ্ট। সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ৫০০ টাকার নোট এবং আর্থিক মূল্যে শীর্ষে ১০০০ টাকার নোট। অন্যদিকে ছোট মূল্যমানের নোটের ব্যবহার দৈনন্দিন জীবনে বেশি হলেও বাজারে তাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

মূল্যস্ফীতি, পণ্যের দাম বৃদ্ধি, ব্যাংকিং লেনদেনে বড় নোটের ব্যবহার এবং এটিএমে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের সরবরাহ—সব মিলিয়েই বড় নোটের চাহিদা বাড়ছে। বিপরীতে ছোট নোটের ক্ষেত্রে কাগজের সংকট, দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং নতুন নোট বাজারে আসতে সময় লাগার কারণে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

এ অবস্থায় একদিকে পুরোনো ও জীর্ণ নোট দ্রুত প্রতিস্থাপন, অন্যদিকে ছোট মূল্যমানের নোটের সরবরাহ বাড়ানো এবং ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted