
বিশেষ প্রতিনিধি
দেশে সাধারণ জ্বর, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের একটি বড় অংশ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। দীর্ঘ ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এ ধরনের অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের প্রায় ১৩ শতাংশের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস পাওয়া গেছে। এ সময়ে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা শুধু মৌসুমি অসুস্থতা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
একই সঙ্গে দেশে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর উপস্থিতিও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে ইনফ্লুয়েঞ্জার নিয়মিত নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে ২০০৭ সাল থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে আসছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)।
গতকাল মঙ্গলবার আইইডিসিআরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে দীর্ঘদিনের এই পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা। সেখানে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ, আক্রান্ত হওয়ার বয়স, মৌসুম, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, টিকাদান এবং রোগ প্রতিরোধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সেমিনারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালের কর্মকর্তা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
২০ বছরে প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার রোগী পর্যবেক্ষণ
দীর্ঘ সময়ের এই নজরদারি ব্যবস্থায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১৫টি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুস্থতা এবং মারাত্মক তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে আসা রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
গত ২০ বছরে এসব হাসপাতালে এমন ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯২ জন রোগীকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়। তাঁদের প্রত্যেকের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে।
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, এ রোগীদের মধ্যে ২২ হাজার ২৮৪ জনের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকা রোগীদের প্রায় ১৩ শতাংশই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত ছিলেন।
এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, দেশে জ্বর-কাশি ও তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের পেছনে ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।
যেসব হাসপাতালে নজরদারি
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে দীর্ঘদিন ধরে এই নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, জয়পুরহাট ও পটুয়াখালী জেলা হাসপাতাল।
এ ছাড়া যশোর ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও এই নজরদারির আওতায় রয়েছে।
সিলেটের বেসরকারি জালালাবাদ রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও এই কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের এসব হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করার ফলে ইনফ্লুয়েঞ্জার বিস্তার ও মৌসুমি প্রবণতা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময়ের একটি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা কী
ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বের হওয়া ক্ষুদ্র কণা বা শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণ থেকে অন্য ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন। আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থাকা বা সংস্পর্শেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
ইনফ্লুয়েঞ্জায় সাধারণত জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে দুর্বলতা ও অস্বস্তিও থাকতে পারে।
সাধারণ সর্দি-কাশির সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জার কিছু উপসর্গের মিল থাকায় অনেক সময় মানুষ বিষয়টি আলাদা করে বুঝতে পারেন না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা গুরুতর আকার নিতে পারে এবং বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
তরুণদের আক্রান্ত বেশি, মৃত্যু বেশি বয়স্কদের
২০ বছরের পর্যবেক্ষণে বয়সভেদে ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ শিশু, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
তবে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি হওয়ার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বেশি হওয়ার বিষয়টি এক নয়। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে।
এ কারণে বয়স্কদের ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।
ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম শীত নয়
দেশে সাধারণ ধারণা রয়েছে, শীতকালেই ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বেশি হয়। তবে দীর্ঘ ২০ বছরের তথ্য সেই ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করছে না।
আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী সেমিনারে জানান, দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে জুন ও জুলাই মাসে ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
অর্থাৎ দেশের মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে গরম ও বর্ষার সময়েই ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ বেশি হতে পারে।
এই তথ্য জনসচেতনতা ও রোগ প্রতিরোধের পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেকেই শীতকালকে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম মনে করে ওই সময়েই শুধু সতর্ক থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পাঁচ শ্রেণির মানুষের ঝুঁকি বেশি
ইনফ্লুয়েঞ্জায় সবাই আক্রান্ত হতে পারেন। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি বা জটিলতার আশঙ্কা বেশি।
গবেষকদের মতে, প্রধানত পাঁচ ধরনের মানুষকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁরা হলেন—স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, একই সঙ্গে একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগা মানুষ এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি।
স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিন বিভিন্ন রোগীর সংস্পর্শে থাকেন। ফলে তাঁদের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
গর্ভবতী নারীদের শরীরে গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন শারীরিক ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ফলে ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ কিছু সংক্রমণের ক্ষেত্রে তাঁদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় সংক্রমণ হলে তাদের বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন হতে পারে।
আবার যাঁরা একই সঙ্গে একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন, তাঁদের শরীরেও ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি।
সবশেষে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ক্ষেত্রেও ইনফ্লুয়েঞ্জা গুরুতর হয়ে ওঠার ঝুঁকি বেশি। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে মৃত্যুর ঘটনাও এই বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে।
টিকা নিয়ে আলোচনা
সেমিনারে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। গবেষক ও আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা পাঁচ শ্রেণির মানুষকে টিকার আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেন।
তবে দেশের সব মানুষকে প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়ে মতভিন্নতা রয়েছে।
কেউ মনে করেন, ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ ও ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিবছর টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আবার দেশের সব মানুষকে প্রতি বছর টিকা দিতে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে—এ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
আরেকটি মত হলো, ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকাকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির নিয়মিত টিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সব ক্ষেত্রে যৌক্তিক নাও হতে পারে।
ফলে কারা টিকা পাবেন, কোন সময়ে দেওয়া হবে এবং কীভাবে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে—এসব বিষয়ে আরও তথ্য ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
মার্চে টিকা দেওয়ার পরামর্শ
বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর হওয়ায় টিকা দেওয়ার সময় নিয়েও গবেষকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মত দিয়েছেন।
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস আগে টিকা দেওয়া যুক্তিযুক্ত। সেই হিসাবে মার্চ মাসকে টিকা দেওয়ার উপযুক্ত সময় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এর ফলে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই শরীরে টিকার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা তৈরির সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।
তবে কার জন্য টিকা প্রয়োজন, কোন টিকা প্রযোজ্য এবং কখন তা নিতে হবে—এসব বিষয়ে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু টিকা নয়, স্বাস্থ্যবিধিও জরুরি
ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে শুধু টিকাকেই একমাত্র উপায় হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও সংক্রমণ কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, টিকা ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধের একটি উপায়। তবে এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক ব্যবহার এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, রোগের ঝুঁকি, প্রতিরোধের উপায় এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে—এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম সম্পর্কে মানুষকে সঠিক তথ্য জানানো দরকার। বাংলাদেশে শীতের বদলে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ বেশি হওয়ার তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ে সতর্কতা
ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ভাইরাসজনিত রোগ। তাই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণভাবে কাজ করে না। অথচ হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গেছে বলে সেমিনারে সতর্ক করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন হাবিব বলেন, হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে। এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর সমস্যা বাড়তে পারে। তাই রোগের ধরন বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত।
জ্বর বা কাশি হলেই নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়। একইভাবে ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে কি না, সেটিও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যেতে পারে।
দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি ব্যবস্থা
বিশ বছর ধরে আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির এই যৌথ নজরদারি কার্যক্রম শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে সেমিনারে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইইডিসিআরের সহযোগী অধ্যাপক মোনালিসা বলেন, দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা পর্যবেক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, ২০১৯ সালে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। আবার ২০১১-১২ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জায় ১৬ হাজার ৮০৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।
তাঁর মতে, ইনফ্লুয়েঞ্জা শুধু মানুষের অসুস্থতার কারণ নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি করে। মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, কর্মদিবস নষ্ট হয় এবং পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
বিশ্বের ১৩৮টি দেশে ১৫৭টি ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশেও আইইডিসিআর একটি ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টার হিসেবে কাজ করছে।
বার্ড ফ্লু নিয়েও উদ্বেগ
সেমিনারে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দেশে এ ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
পাখির মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ইনফ্লুয়েঞ্জার বিভিন্ন ধরন পরিস্থিতিভেদে প্রাণী ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে মানুষের পাশাপাশি প্রাণীর মধ্যেও রোগের নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো নতুন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ বা পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করতে হলে নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী রাখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে হাসপাতাল, পরীক্ষাগার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি
ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। হাঁচি-কাশির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া, অসুস্থ অবস্থায় অন্যের খুব কাছাকাছি না যাওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার সংক্রমণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুমে জ্বর, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ দেখা দিলে নিজের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি—বিশেষ করে বয়স্ক, ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপসর্গ গুরুতর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সামনে করণীয়
দীর্ঘ ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। সাধারণ জ্বর-কাশি ও তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের ১৩ শতাংশের ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত হওয়া বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
একই সঙ্গে কোন বয়সে সংক্রমণ বেশি, কোন বয়সে মৃত্যুঝুঁকি বেশি এবং বছরের কোন সময়ে সংক্রমণ বাড়ে—এসব তথ্যও এখন অনেকটাই পরিষ্কার।
৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বেশি হলেও ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। আবার এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কে ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, বিশেষ করে জুন ও জুলাইয়ে সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
তাই ইনফ্লুয়েঞ্জা মোকাবিলায় শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না। নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী টিকাদান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার—সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য দেওয়া গেলে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ ও এর জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘ দুই দশকের তথ্য-উপাত্ত তাই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ইনফ্লুয়েঞ্জাকে শুধু মৌসুমি জ্বর-কাশি হিসেবে দেখার সময় শেষ। দেশের জনস্বাস্থ্যের পরিকল্পনায় এখন এই ভাইরাসের নিয়মিত নজরদারি ও প্রতিরোধকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি রেসপন্স বিভাগের মহাপরিচালক সৈয়দা জেসমিন সুলতানা, যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির ঢাকার কর্মকর্তা মনোয়ার মোর্শেদ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার আইরিন ইসিবুর।
