ডেস্ক রিপোর্ট
শিশুর জীবনে বয়ঃসন্ধিকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এ সময় তার শরীর, মন, চিন্তা ও আচরণে দ্রুত পরিবর্তন আসে। ছোটবেলার চেনা-জানা শিশুটি ধীরে ধীরে কিশোর বা কিশোরীতে পরিণত হয়। নিজের সম্পর্কে, পরিবার সম্পর্কে এবং চারপাশের মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন দেখা দেয়।
এই সময় সন্তান অনেক বেশি স্বাধীন হতে চায়। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চায়। বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নানা ধরনের বিনোদন এবং চারপাশের পরিবেশ তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে এ সময়ে অভিভাবকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানকে শুধু শাসন করলেই হবে না, তাকে বুঝতে হবে, তার কথা শুনতে হবে এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝাতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতেও বয়ঃসন্ধিকালের সন্তানকে সঠিক শিক্ষা, শালীনতা, ভালো পরিবেশ ও নৈতিকতার মধ্যে বড় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকেরা চাইলে নিচের বিষয়গুলো মেনে সন্তানকে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টি সুন্দরভাবে পার হতে সহযোগিতা করতে পারেন।
১. দ্বিনি ও কোরআনের শিক্ষা দিন
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তান অনেক নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে চায়। তার মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। এ সময় তাকে সঠিক জ্ঞান দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ইসলাম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে সে ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে এবং নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে।
সন্তানকে কোরআন, হাদিস ও ইসলামের প্রয়োজনীয় বিধান শেখাতে হবে। নামাজ, অজু, তাসবিহসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় আমলগুলো শেখানোর পাশাপাশি কোন কাজ ভালো এবং কোন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে, সেটিও বোঝাতে হবে।
শায়খ সালিহ আল ফাউজান বলেন, শিশু যখন ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে শেখে, তখন মা-বাবার দায়িত্ব হলো তাকে উত্তম শিক্ষায় শিক্ষিত করা। তাকে কোরআন, হাদিস ও শরিয়তের প্রয়োজনীয় বিধান শেখাতে হবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে।
(আল মুন্তাকা মিন ফাতাওয়া ফাউজান : ৫/২৯৭)
তবে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ভয় দেখানো নয়, ভালোবাসা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে শেখানো বেশি কার্যকর। সন্তান যেন ধর্মকে বোঝা মনে না করে, বরং জীবনের সুন্দর পথ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে—সেদিকে অভিভাবকের খেয়াল রাখা উচিত।
২. ভালো বন্ধু বেছে নিতে সাহায্য করুন
বয়ঃসন্ধিকালে বন্ধুবান্ধবের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। অনেক সময় সন্তান মা-বাবার চেয়ে বন্ধুদের কথা বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। তাই তার বন্ধুরা কারা, তারা কেমন এবং তাদের আচরণ কেমন—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা দরকার।
তবে বন্ধুত্বের বিষয়ে সন্তানকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া ঠিক নয়। বরং তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে, ভালো বন্ধু মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে এবং খারাপ বন্ধু ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ব্যক্তি তার বন্ধুর দ্বিনের ওপর পরিচালিত হয়। সুতরাং তোমরা কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছ, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে।’
(সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)
পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, ‘বন্ধুরা সেদিন একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে, শুধু মুত্তাকিরা ছাড়া।’
(সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৬৭)
তাই সন্তানকে এমন বন্ধু বেছে নিতে উৎসাহিত করতে হবে, যারা তাকে ভালো কাজে উৎসাহ দেবে, পড়াশোনা ও নৈতিকতার প্রতি আগ্রহী করবে এবং ভুল পথে যেতে বাধা দেবে।
৩. পরিবারে শালীন পরিবেশ নিশ্চিত করুন
বয়ঃসন্ধিকালে শিশুর শরীর ও মনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। নিজের শরীর এবং বিপরীত লিঙ্গ সম্পর্কে তার কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এ সময় পরিবারে শালীন পরিবেশ বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম পরিবারে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শালীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
আলাদা বিছানার ব্যবস্থা
সন্তানের বয়স ১০ বছর হলে ছেলে-মেয়ের বিছানা আলাদা করে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। শুধু সন্তানকে মা-বাবার বিছানা থেকে আলাদা করাই নয়, ভাই-বোনের বিছানাও আলাদা করা উচিত।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫; ফাতাওয়া লাজনাতুদ দায়িমাহ : ১৭/৪০৮)
ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি
পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত সময় ও গোপনীয়তার বিষয়টিও সন্তানকে শেখাতে হবে। কারও ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের সন্তানরা যখন বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছে, তখন তারা যেন অনুমতি নেয়, যেমন তাদের পূর্ববর্তীরা অনুমতি নিত।’
(সুরা : নুর, আয়াত : ৫৯)
শালীন পোশাক
সন্তানের পোশাক-পরিচ্ছদেও শালীনতার শিক্ষা দিতে হবে। ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিমিত ও শালীন পোশাকের অভ্যাস তৈরি করা জরুরি।
(সুরা : নুর, আয়াত : ৩০-৩১)
৪. শাসন ও ভালোবাসায় ভারসাম্য রাখুন
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তান নিজেকে বড় মনে করতে শুরু করে। সে নিজের মতামতকে গুরুত্ব দিতে চায়। এ সময় অভিভাবক যদি প্রতিটি বিষয়ে রাগ দেখান বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাহলে সন্তান ধীরে ধীরে তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
অন্যদিকে একেবারে কোনো নিয়ম না থাকলেও সন্তান নিজের ইচ্ছামতো চলতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে।
তাই ভালোবাসা ও শাসনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
সন্তান ভুল করলে তাকে অপমান না করে ভুলটি বোঝাতে হবে। কেন কাজটি ভুল হয়েছে, সেটি বুঝিয়ে বলা জরুরি। একই সঙ্গে ভালো কাজ করলে প্রশংসা করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোমলতা যে জিনিসের মধ্যে থাকে, তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে; আর যে জিনিস থেকে কোমলতা তুলে নেওয়া হয়, তাকে ত্রুটিপূর্ণ করে।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৪)
অর্থাৎ সন্তানকে সংশোধন করার ক্ষেত্রেও কোমলতা ও সুন্দর আচরণ গুরুত্বপূর্ণ।
৫. সন্তান কোথায় যাচ্ছে, খেয়াল রাখুন
কিশোর-কিশোরীরা দিনের একটি বড় অংশ স্কুল, কোচিং, খেলাধুলা বা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে কাটাতে পারে। তাই সন্তান কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং কখন বাড়ি ফিরছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তবে বিষয়টি যেন গোয়েন্দাগিরির মতো না হয়। সন্তানকে এমনভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে, যাতে সে মনে না করে মা-বাবা তাকে বিশ্বাস করেন না।
ঘরের বাইরে থাকার জন্য একটি যুক্তিসংগত সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। কোথাও যাওয়ার আগে জানানো এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাড়ি ফেরার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
সন্তানের বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং প্রয়োজনে তাদের পরিবার সম্পর্কেও ধারণা রাখা ভালো। এতে সন্তান কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে জড়িয়ে পড়ছে কি না, তা বোঝা সহজ হবে।
৬. খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ দিন
শুধু পড়াশোনা আর পড়াশোনা করলে শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বয়ঃসন্ধিকালে শরীরের সুস্থ বিকাশের জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সন্তানকে মাঠে খেলতে, হাঁটতে, দৌড়াতে বা অন্যান্য উপকারী শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে উৎসাহিত করা উচিত।
খেলাধুলার সুযোগ না থাকলে অনেক শিশু মোবাইল ফোন, কম্পিউটার বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও নানা ধরনের মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই সন্তানকে বাস্তব জীবনের আনন্দ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখা দরকার।
৭. পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করুন
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তান মনে করতে শুরু করে, সে আর ছোট নেই। এই অনুভূতিকে নেতিবাচকভাবে না দেখে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো উচিত।
তাকে পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তার মতামত জানতে হবে এবং সম্ভব হলে পারিবারিক কিছু বিষয়ে তার পরামর্শ নিতে হবে।
এতে সন্তান বুঝতে পারবে, পরিবারে তার গুরুত্ব রয়েছে।
তাকে এটাও বোঝাতে হবে যে পরিবারের প্রতি তার কিছু দায়িত্ব আছে। পরিবারের সম্মান রক্ষা করা, মা-বাবার সঙ্গে ভালো আচরণ করা, ছোটদের স্নেহ করা এবং পরিবারের প্রয়োজনে সহযোগিতা করা—এসব দায়িত্বের অংশ।
সন্তানকে দায়িত্ব দিলে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। সে নিজেকে পরিবারের বোঝা নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে ভাবতে শেখে।
৮. ভালো কাজের প্রশংসা করুন
সন্তান ভালো কোনো কাজ করলে অনেক অভিভাবক সেটিকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে নেন। কিন্তু ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে বকাঝকা করেন। এতে সন্তানের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
তাই ভালো কাজের প্রশংসা করা জরুরি।
সন্তান ভালো ফল করলে, কাউকে সাহায্য করলে, দায়িত্বশীল আচরণ করলে কিংবা পরিবারের জন্য ভালো কিছু করলে তাকে প্রশংসা করা উচিত।
প্রশংসা মানেই সব সময় দামি উপহার দেওয়া নয়। একটি সুন্দর কথা, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে তার ভালো কাজের কথা বলা—এসবও বড় উৎসাহের কারণ হতে পারে।
এতে সন্তানের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং সে ভালো কাজ করার জন্য আরও উৎসাহ পায়।
৯. সন্তানের মনে বড় স্বপ্ন তৈরি করুন
বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই শিশুর মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন তৈরি হয়। কেউ বড় ডাক্তার হতে চায়, কেউ শিক্ষক, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ ব্যবসায়ী বা সমাজসেবক হতে চায়।
অভিভাবকদের উচিত এই স্বপ্নগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। সন্তানের আগ্রহ বুঝে তাকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া।
শুধু অর্থ বা খ্যাতি নয়, মানুষের জন্য ভালো কিছু করার স্বপ্নও তার মধ্যে তৈরি করতে হবে।
ইসলামের মহান ব্যক্তিত্বদের জীবন, তাঁদের ত্যাগ, ধৈর্য, সততা ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার উদাহরণ সন্তানের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে।
বিশেষ করে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও চরিত্র সম্পর্কে সন্তানকে জানানো অত্যন্ত উপকারী। তাঁর সততা, আমানতদারি, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা কিশোর-কিশোরীদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে।
একজন কিশোরের সামনে যদি মহৎ লক্ষ্য থাকে, তাহলে সে অনেক সময় ক্ষতিকর ও অনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে।
১০. সন্তানের জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন
সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকের চেষ্টা যেমন প্রয়োজন, তেমনি আল্লাহর কাছে দোয়াও করতে হবে।
কারণ সন্তানকে সৎ ও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অভিভাবকের চেষ্টা ও দোয়া—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কোরআনে সন্তানদের জন্য বিভিন্ন দোয়া শেখানো হয়েছে।
সৎ সন্তান চেয়ে দোয়া
‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন।’
(সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১০০)
পরিবারের শান্তির জন্য দোয়া
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন, যারা হবে আমাদের চোখের শীতলতা এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ্য।’
(সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৭৪)
সন্তানদের নামাজি হওয়ার জন্য দোয়া
‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী করুন এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও।’
(সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪০)
শুধু শাসন নয়, বন্ধুত্বও জরুরি
বয়ঃসন্ধিকালের সন্তানকে বড় করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা।
সন্তান যেন কোনো সমস্যা হলে সবার আগে মা-বাবার কাছে বলতে পারে—এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সে কোনো ভুল করলে প্রথমেই অপমান বা শাস্তির ভয় পেলে অনেক সময় সমস্যাটি গোপন করতে পারে। কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে যদি তার বিশ্বাসের সম্পর্ক থাকে, তাহলে সে নিজের সমস্যার কথা সহজে বলতে পারবে।
তাই সন্তানের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। তার অনুভূতিকে উপহাস করা যাবে না।
বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে শরীর, সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, পড়াশোনা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মনে যেসব প্রশ্ন আসে, সেগুলোর উত্তর শান্তভাবে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
ডিজিটাল দুনিয়াতেও নজর জরুরি
বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরীদের জীবনে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের প্রভাব অনেক বেশি। তাই সন্তানের ডিজিটাল ব্যবহার নিয়েও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।
কোন ধরনের কনটেন্ট সে দেখছে, কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে এবং অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে বয়স উপযোগী নিয়ম থাকা দরকার।
তবে শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কেন অতিরিক্ত ব্যবহার ক্ষতিকর হতে পারে, সেটি বুঝিয়ে বলা বেশি কার্যকর।
পাশাপাশি ঘরে বই পড়া, খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে।
সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না
‘অমুকের ছেলে এত ভালো, তুমি কেন পারো না’—এ ধরনের কথা সন্তানের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে।
প্রতিটি শিশুর প্রতিভা ও আগ্রহ আলাদা। তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে সন্তানের নিজের উন্নতির দিকে নজর দেওয়া উচিত।
সে গতবারের চেয়ে এবার ভালো করেছে কি না, নিজের ভুল থেকে শিখছে কি না—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দিন
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তান ভুল করতেই পারে। একটি ভুলের জন্য তাকে চিরদিনের জন্য ‘খারাপ ছেলে’ বা ‘খারাপ মেয়ে’ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
ভুলের পর তাকে বুঝতে সাহায্য করতে হবে কেন ভুল হয়েছে এবং কীভাবে সেটি ঠিক করা যায়।
শাস্তির চেয়ে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, সন্তানকে একদিনে গড়ে তোলা যায় না। এটি দীর্ঘ সময়ের একটি প্রক্রিয়া।
শেষ কথা
বয়ঃসন্ধিকাল সন্তান ও অভিভাবক—উভয়ের জন্যই চ্যালেঞ্জের সময়। এই সময়ে সন্তান যেমন নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করে, তেমনি মা-বাবাকেও নতুনভাবে তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়।
শুধু কঠোর শাসন, ভয় দেখানো বা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সন্তানকে সঠিক পথে রাখা যায় না। প্রয়োজন ভালোবাসা, ধৈর্য, নৈতিক শিক্ষা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
সন্তানের বন্ধু কে, সে কোথায় যায়, কী দেখে, কীভাবে সময় কাটায়—এসব বিষয়ে সচেতন থাকার পাশাপাশি তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত করে তুলতে হবে।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, সন্তানকে কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান দেওয়া, ভালো মানুষের সঙ্গে চলতে উৎসাহিত করা, পারিবারিক শালীনতা বজায় রাখা, ভালো কাজের প্রশংসা করা এবং তার জন্য নিয়মিত দোয়া করা অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সঠিক সময়ে সঠিক শিক্ষা ও ভালোবাসা পেলে বয়ঃসন্ধিকালের নানা পরিবর্তন সামলে সন্তান আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের সৎ, আদর্শ ও নেককার হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

