বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে চার নতুন মুখ, মহাসচিব ও মন্ত্রিসভায়ও পরিবর্তনের আলোচনা

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা ঘিরে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন রুহুল কবির রিজভীসহ চার নেতা। শূন্য হতে যাওয়া মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে মন্ত্রিসভায় সীমিত রদবদলের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার পর বিএনপির দলীয় নেতৃত্ব ও সরকারের দায়িত্ব বণ্টনে বেশ কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন করে চারজনকে যুক্ত করা হয়েছে।

নতুন সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমানউল্লাহ আমান ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ফরহাদ হালিম (ডোনার)।

শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপি জানিয়েছে, দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই চার নেতাকে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণার এক দিন পরই স্থায়ী কমিটিতে এই পরিবর্তন আনা হলো। ফলে দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাব্য বিন্যাস নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

স্থায়ী কমিটিতে এখন ১৬ সদস্য

চার নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার পর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে।

বর্তমান সদস্যরা হলেন—বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম।

এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিবের পদসহ দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। অসুস্থতার কারণে তাঁকে বহু বছর ধরে দলীয় সভা বা কর্মসূচিতে তেমন দেখা যায় না।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে গণ্য হন। তাঁদেরসহ জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে মোট সদস্য থাকার কথা ১৯ জন। দলের চেয়ারম্যান এই কমিটির প্রধান।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে সদস্যদের মৃত্যু, পদত্যাগ ও অন্যান্য কারণে কয়েকটি পদ শূন্য হয়। পরে দলটি ধাপে ধাপে এসব পদে নতুন সদস্য যুক্ত করে।

এবার একসঙ্গে চারজনকে স্থায়ী কমিটিতে নেওয়া হলো।

কারা এলেন স্থায়ী কমিটিতে

নতুন সদস্যদের মধ্যে রুহুল কবির রিজভী বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দীর্ঘ সময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহও দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।

অন্যদিকে আমানউল্লাহ আমান বিএনপির পুরোনো ও পরিচিত নেতা। ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়েও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

চিকিৎসক ফরহাদ হালিম (ডোনার) বর্তমানে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক।

চারজনকে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের ভেতরে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই তাঁদের মনোনীত করা হয়েছে।

আরও কয়েকজনের নামও আলোচনায় ছিল

স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য হিসেবে আরও কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় ছিল। তাঁদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ও আসাদুজ্জামান রিপনের নাম ছিল।

এ ছাড়া চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামও আলোচনায় আসে।

তবে শেষ পর্যন্ত এই চারজনকেই স্থায়ী কমিটিতে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, দলের প্রধান নিশ্চয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি দলের সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আস্থার কথা জানান।

মির্জা ফখরুলের পর মহাসচিব কে

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব নিলে বিএনপির মহাসচিবের পদটি শূন্য হবে। ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দলটির নতুন মহাসচিব কে হচ্ছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

তবে দলের ভেতরে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে। রুহুল কবির রিজভীকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করার পর তাঁকে আগামী জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার একটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

তবে এটিও এখন পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত নয়। বিএনপির পক্ষ থেকে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

দলের সাংগঠনিক বাস্তবতা ও নেতৃত্বের ভারসাম্য বিবেচনায় নিয়ে মহাসচিব পদে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত।

মন্ত্রিসভাতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হওয়ায় তাঁর দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন আসতে পারে।

একই সময়ে সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ের কাজ পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির শপথের আগে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে কয়েকজন নতুন মুখকে যুক্ত করে সীমিত আকারে রদবদল হতে পারে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ আনার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে।

মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নাম আলোচনা হচ্ছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরীকে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ কারা

মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবেও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে।

তাঁদের মধ্যে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থের নাম রয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন—এমন কয়েকজনকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তবে সম্ভাব্য এই পরিবর্তনগুলোর কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এই প্রতিবেদনের বিষয়ে গত দুই দিনে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলা হলেও তাঁরা মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর হাতে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

একজন মন্ত্রী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেবেন, নাকি দায়িত্ব আলাদা করে দেওয়া হবে—সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।

তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বড় ধরনের পরিবর্তনের চেয়ে সীমিত পরিসরে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের সম্ভাবনাই বেশি।

রাষ্ট্রপতির শপথের সময়সূচি এবং সরকারের সার্বিক কাজের মূল্যায়নের ওপরও সিদ্ধান্তের বিষয়টি নির্ভর করতে পারে।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনেও আসতে পারে পরিবর্তন

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১-ও শূন্য হবে। সে ক্ষেত্রে ওই আসনে উপনির্বাচন করতে হবে।

এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়েও স্থানীয়ভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাঁর বড় মেয়ে মির্জা শামারুহের নামও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।

তবে মির্জা পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তাই উপনির্বাচন হলে বিএনপি কাকে প্রার্থী করবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা বিএনপির রাজনীতিতে একসঙ্গে বেশ কিছু পরিবর্তনের দরজা খুলে দিয়েছে।

একদিকে দলের মহাসচিবের পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। অন্যদিকে স্থায়ী কমিটিতে নতুন সদস্যদের যুক্ত করে দলের নীতিনির্ধারণী কাঠামোও কিছুটা বদলে দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের হাতে থাকা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং সরকারের ছয় মাসের কাজ পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভায় সীমিত রদবদলের সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন হলে সেখানেও নতুন প্রার্থী বাছাই করতে হবে।

সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়ার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও সরকারের ভেতরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তবে মহাসচিব কে হবেন, মন্ত্রিসভায় কারা নতুন করে যুক্ত হবেন, কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আসবে কিংবা ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন—এসব প্রশ্নের কোনোটি নিয়েই এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।

তাই আপাতত নিশ্চিত পরিবর্তন হলো বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে চার নতুন সদস্যের অন্তর্ভুক্তি। সামনে দলীয় নেতৃত্ব ও সরকারের দায়িত্ব বণ্টনে আরও কী পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted