সরকারি খরচে প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মামলায় আইনি সহায়তা

অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের পাশে লিগ্যাল এইড, সেবা মিলছে ১৬৬৯৯ হেল্পলাইনেও

স্টাফ রিপোর্টার :

অর্থের অভাবে যেন কোনো মানুষ আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন—এই লক্ষ্যেই সরকারি খরচে অসচ্ছল ও অসহায় বিচারপ্রার্থীদের আইনগত সহায়তা দিয়ে আসছে জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা (লিগ্যাল এইড)। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৭২টি মামলায় সরকারি খরচে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে গত ১৭ বছরের বেশি সময়ে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে দেওয়া আইনি সেবার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেলের মাধ্যমে এসব মামলায় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কারাবন্দি ও অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদেরও সরকারি ব্যবস্থাপনায় আইনি সেবা দেওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি সহায়তা ৬৪ জেলা অফিসের মাধ্যমে

জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৯০৭টি মামলায় আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

জেলা পর্যায়ে সাধারণ মানুষের আইনি সহায়তার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে এসব অফিস। অর্থের অভাবে যাঁরা আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না, তাঁদের জন্য সরকারি ব্যবস্থায় আইনজীবী নিয়োগ, মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়।

এতে নিম্নআয়ের মানুষ, দরিদ্র পরিবার, অসহায় নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণির বিচারপ্রার্থী উপকৃত হচ্ছেন।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ৩ হাজার ৪৫৭টি মামলায় আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য এই সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেলের মাধ্যমে ৪ হাজার ৭০৮টি মামলায় আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের বিভিন্ন আইনগত বিরোধ ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে এই সেল থেকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস এবং শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেলের মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৭২টি মামলায় সরকারি খরচে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।


দ্বিতীয় পৃষ্ঠা

অর্থের অভাবে বিচার থেকে বঞ্চিত নয়

দেশে অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে অথবা তাঁরা নিজের অধিকার রক্ষায় আদালতের দ্বারস্থ হতে চান। কিন্তু আইনজীবীর ফি, মামলার খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় বহন করার সামর্থ্য তাঁদের নেই। ফলে অনেক সময় অর্থের অভাবে ন্যায়বিচারের সুযোগ থেকেও তাঁরা পিছিয়ে পড়েন।

এই সমস্যা দূর করতেই সরকারি উদ্যোগে আইনগত সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার মাধ্যমে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, অসহায় ও বিচারপ্রার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়। এর ফলে একজন দরিদ্র মানুষও প্রয়োজন হলে আদালতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছেন।

আইনি সহায়তার আওতায় মামলার ধরন অনুযায়ী আইনজীবী নিয়োগ, আইনি পরামর্শ এবং মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়। ফলে অর্থের অভাবে কোনো ব্যক্তি যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই এই কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

১৬৬৯ নম্বরে মিলছে আইনি পরামর্শ

শুধু লিগ্যাল এইড অফিসে গিয়ে নয়, সরকারি আইনি সহায়তার বিষয়ে জানতে জাতীয় হেল্পলাইন কলসেন্টার ১৬৬৯৯-এও যোগাযোগ করা যায়। এটি একটি টোল-ফ্রি সেবা।

আইনি সমস্যায় পড়া বা সরকারি আইনগত সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তি এই নম্বরে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ নিতে পারেন। বিশেষ করে যাঁরা জানেন না কোথায় গেলে সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে, তাঁদের জন্য এই হেল্পলাইন গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে আইনি সহায়তার আওতায় আনতে এ ধরনের সেবা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কারাবন্দিদেরও দেওয়া হচ্ছে আইনি সহায়তা

জাতীয় আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় কারাবন্দিদেরও আইনি সেবা দেওয়া হচ্ছে। কোনো বন্দি অর্থের অভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে না পারলে সরকারি ব্যবস্থায় তাঁর জন্য আইনি সহায়তার সুযোগ রয়েছে।

কারাগারে থাকা অসচ্ছল ব্যক্তিদের ন্যায়বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অর্থের অভাবে কোনো বন্দি যেন নিজের মামলা পরিচালনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই সরকারি আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা ও উচ্চ আদালত পর্যায়ে লিগ্যাল এইড অফিসগুলো বিচারপ্রার্থীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শও দিয়ে থাকে।

শ্রমিকদের জন্য আলাদা সেবা

শ্রমজীবী মানুষের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতেও সরকারি আইনগত সহায়তার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেলের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিভিন্ন মামলায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

কর্মক্ষেত্রে অধিকার, পাওনা, চাকরি সংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে শ্রমিকরা আইনি সমস্যার মুখোমুখি হন। অনেক শ্রমিকের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে আইনজীবী নিয়োগ করা কঠিন। এ কারণে সরকারি খরচে আইনি সহায়তার ব্যবস্থা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এসব শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেলের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৭০৮টি মামলায় আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।


তৃতীয় পৃষ্ঠা

১৭ বছরে বড় পরিসরে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম

২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার প্রতিবেদনে। দীর্ঘ এই সময়ে সরকারি আইনি সহায়তার পরিধি ধীরে ধীরে বেড়েছে।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকার অসচ্ছল মানুষও যাতে আইনি সহায়তা পেতে পারেন, সে জন্য জেলা পর্যায়ে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাজধানী বা বড় শহরে না গিয়েও অনেক বিচারপ্রার্থী স্থানীয় পর্যায় থেকে সরকারি সহায়তা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারব্যবস্থায় সবার সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ধনী ব্যক্তি যেমন নিজের পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন, তেমনি দরিদ্র মানুষেরও আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। সরকারি লিগ্যাল এইড ব্যবস্থা সেই সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

ন্যায়বিচারের সুযোগ সবার জন্য

আইনগত সহায়তার মূল উদ্দেশ্য হলো—অর্থের অভাবে কেউ যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন। কারণ, আদালতে যাওয়ার অধিকার থাকলেও মামলা পরিচালনার ব্যয় অনেক অসচ্ছল মানুষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাধা দূর করতে সরকারি খরচে আইনজীবী ও প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে একজন দরিদ্র মানুষও নিজের অধিকার রক্ষায় আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন।

বিশেষ করে নারী, শিশু, শ্রমিক, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার কার্যক্রমের ফলে শুধু মামলা পরিচালনাই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির সুযোগও তৈরি হয়েছে।

কোন কোন জায়গায় পাওয়া যাবে সেবা

সরকারি আইনগত সহায়তা পাওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • দেশের ৬৪টি জেলা লিগ্যাল এইড অফিস;
  • সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস;
  • ঢাকা ও চট্টগ্রাম শ্রমিক আইনগত সহায়তা সেল;
  • সরকারি আইনি সহায়তা জাতীয় হেল্পলাইন ১৬৬৯৯;
  • কারাবন্দিদের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনি সহায়তা ব্যবস্থা।

এসব মাধ্যমে যোগ্য ও অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীরা সরকারি সহায়তা নিতে পারেন।

মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত কার্যক্রম

জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার কার্যক্রম আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে পরিচালিত হয়।

সরকারি এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো দেশের আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও অসমর্থ মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের পথ সহজ করা। অর্থের অভাবে যাতে কোনো ব্যক্তি তাঁর আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ হারিয়ে না ফেলেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতেই লিগ্যাল এইড কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মামলা সরকারি খরচে আইনি সহায়তার আওতায় আসা এই কার্যক্রমের বড় পরিসরকে তুলে ধরে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনি সহায়তার এই সুযোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামের মানুষ, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো যেন সহজেই জানতে পারেন কোথায় এবং কীভাবে সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়া যায়, সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

কারণ, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কেবল অর্থবান মানুষের জন্য নয়—সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য সমান। সরকারি লিগ্যাল এইড সেই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted