নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণে প্রস্তুত বঙ্গভবন

ফখরুলের নাম ঘিরে আলোচনা, চলছে আনুষ্ঠানিকতার মহড়া; ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ

স্টাফ রিপোর্টার :

দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন আলোচনা চলছে, তখন নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণ করতে প্রস্তুতি শুরু করেছে বঙ্গভবন। রাষ্ট্রীয় নিয়ম ও প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়ার সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মহড়া ও প্রস্তুতিমূলক কাজ।

বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণ করা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নানা রীতি, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ জড়িত। ফলে কোথাও যেন কোনো ধরনের ভুল বা ঘাটতি না থাকে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগে থেকেই কাজ শুরু করেছেন।

তাঁদের মতে, নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে বঙ্গভবনের প্রতিটি বিভাগকে প্রস্তুত থাকতে হয়। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল থেকে শুরু করে অভ্যর্থনা, নিরাপত্তা, দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং আনুষ্ঠানিকতার প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হয়। এ কারণে প্রস্তুতির কাজও বেশ আগে থেকেই শুরু করা হয়েছে।

ফখরুলের নামেই বেশি আলোচনা

নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। দলটির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর আগে রাষ্ট্রপতি পদে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

বিএনপির নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দলটি এবার রাষ্ট্রপতি পদে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে দেখতে চায়। সেই ব্যক্তির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘদিনের দলীয় ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এ কারণেই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সামনে আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের নানা কঠিন সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বলে মনে করছেন দলের অনেক নেতা।

সংসদে ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সাধারণত বেশি থাকে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংসদের বিশেষ বৈঠকে এমপিদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিরোধী দল ও জোটের পক্ষ থেকেও প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এলডিপি নেতা অলি আহমদের নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে কে নির্বাচিত হবেন, তা সংসদে ভোটের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হবে।

বঙ্গভবনে প্রস্তুতির ব্যস্ততা

নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণ করার জন্য বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যস্ততা বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী অভ্যর্থনার বিভিন্ন ধাপ নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কোথায় কীভাবে অনুষ্ঠান হবে, কারা উপস্থিত থাকবেন এবং কোন কোন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা জানান, ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বঙ্গভবনের কিছু রেওয়াজ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে জনবল কমানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কিছু আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রেও আগের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন এসেছে।

এখন নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণকে সামনে রেখে এসব বিষয় আবার পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল, প্রটোকল ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ঠিক করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তাঁদের আশা, নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণের সব প্রস্তুতি শেষ করা সম্ভব হবে।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন

এদিকে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি নিয়মিত বঙ্গভবনে অফিস করছেন।

বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সকালে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তিনি অফিসে আসছেন। রাষ্ট্রপতির কাছে আসা বিভিন্ন ফাইল তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। কোনো ফাইলে সিদ্ধান্ত বা অনুমোদন দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা যাচাই করে স্বাক্ষর করছেন। আবার কোনো বিষয়ে আরও পর্যালোচনা প্রয়োজন মনে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরে ফেরত পাঠাচ্ছেন।

ফাইল দেখা ও স্বাক্ষরের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির নিয়মিত দাপ্তরিক কাজও করছেন তিনি। বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম, বৈঠক ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন।

রাজধানীর যানজটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি অনেক সময় সন্ধ্যা পর্যন্ত বঙ্গভবনে অবস্থান করেন। অফিস ছুটির পর রাজধানীর ব্যস্ততা কিছুটা কমলে বঙ্গভবন থেকে বের হন। বর্তমানে তিনি সংসদ সচিবালয়ে অবস্থিত স্পিকারের সরকারি বাসভবনে থাকছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও অংশ নিচ্ছেন

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর হাফিজ উদ্দিন আহমদ ইতোমধ্যে কয়েকটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্যও দিয়েছেন। জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস উপলক্ষে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতির বাণী।

এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকেও অংশ নিচ্ছেন তিনি। বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিষয় সম্পর্কে অবহিত হচ্ছেন।

নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গেও তিনি সময় দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণ করার প্রস্তুতির বিষয়টিও তিনি কিছুটা তদারকি করছেন বলে বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সরওয়ার আলম বলেন, নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা বর্তমানে এসব কাজ নিয়েই ব্যস্ত রয়েছেন। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিয়মিত অফিস করছেন এবং রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক ও রুটিন কাজ সম্পন্ন করছেন।

কীভাবে শূন্য হলো রাষ্ট্রপতির পদ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর সংসদের শপথকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর থেকেই তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ কোনো কারণে শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ, শারীরিক অসামর্থ্য কিংবা অভিশংসনের মতো পরিস্থিতিতেও এই সাংবিধানিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়।

ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে যাবেন স্পিকার।

রাষ্ট্রপতি পদে ফখরুলকে ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম রাষ্ট্রপতি পদে সামনে আসায় বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ রাষ্ট্রপতি পদে গেলে তাঁকে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব ছাড়তে হবে।

এতে দলের পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে। দলের ভেতরে একাধিক নেতার নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় আসতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ। এই পদে এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এবং যিনি রাষ্ট্রীয় নানা সংকটের সময় ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিনের রাজনীতিক এবং বিএনপির অন্যতম পরিচিত মুখ। দলের মহাসচিব হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

নতুন রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা যত বাড়ছে, ততই বঙ্গভবনের প্রস্তুতিও দৃশ্যমান হচ্ছে। নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার সব আয়োজন শেষ করতে চাইছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর অবশ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই পাওয়া যাবে। তবে এরই মধ্যে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতিকে বরণ করতে বঙ্গভবনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আগ্রহ আরও বেড়েছে।

সবকিছু ঠিক থাকলে নির্ধারিত সময়েই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে বঙ্গভবনে বরণ করে নেওয়া হবে। নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বেরও অবসান ঘটবে। বঙ্গভবন তখন ফিরে যাবে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতির নিয়মিত সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted