বিদেশে বসেই চাঁদাবাজির ‘রিমোট’ নিয়ন্ত্রণ

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফোন, মাঠে সেকেন্ড ইন কমান্ড; চাঁদা না দিলে হামলার অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট

‘আমার লোকজন গিয়ে তোর ফ্যাক্টরির একজনকে মেরেছে। টাকা না দিলে এবার তোকে পঙ্গু করে দেওয়া হবে। মালিককে বল, একবারে ৫ লাখ টাকা দিতে হবে। প্রতি মাসে দিতে হবে আরও ৫০ হাজার টাকা। সময় দেওয়া হলো মাত্র ২০ মিনিট।’

রাজধানীর মিরপুরের এক ব্যবসায়ীর কাছে সম্প্রতি বিদেশি নম্বর থেকে এমন হুমকির ফোন আসে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দেন। টাকা না দিলে কারখানায় হামলা ও ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

শুধু একটি ঘটনা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে ফোন করে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে থাকা এসব সন্ত্রাসী সরাসরি মাঠে না নেমে ফোনে নির্দেশ দিচ্ছেন। আর দেশে থাকা তাঁদের সহযোগীরা সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করছে।

কখনো নির্মাণাধীন ভবনের কাজ বন্ধ করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। কখনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্ত্র দেখিয়ে বা গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। চাঁদা না দেওয়া পর্যন্ত ব্যবসা কিংবা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, চাঁদার একটি বড় অংশ বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এভাবে দেশের বাইরে বসেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অপরাধজগতের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন কয়েকজন পলাতক সন্ত্রাসী।

বিদেশ থেকে ফোন, মাঠে অন্যরা

চাঁদাবাজির নতুন এই কৌশলে বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অনেকটা দূর থেকেই নির্দেশ দিচ্ছেন। তাঁদের হয়ে মাঠে কাজ করছে স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা।

ব্যবসায়ী বা ভবন মালিকের কাছে প্রথমে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি গিয়ে নিজেদের পরিচয় দেন। এরপর তাঁরা বিদেশি নম্বরে ফোন করে অপর প্রান্তে থাকা ‘বড় ভাইয়ের’ সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। এতে ভুক্তভোগীর মধ্যে ভয় আরও বেড়ে যায়।

কখনো আবার বিদেশি নম্বর থেকে সরাসরি ফোন আসে। ফোনে বলা হয়, অমুক সন্ত্রাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এবং তাঁর নির্দেশেই চাঁদা দিতে হবে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সব বিদেশি নম্বরের ফোন যে সত্যিই বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা করছেন, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে পলাতক সন্ত্রাসীদের পরিচয় ব্যবহার করে অন্যরাও বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা দাবি করছে।

তবে যেসব ঘটনায় বিদেশে থাকা সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

৫ কোটি টাকা চাঁদা, পরে হামলা

পল্লবীর আলব্দির টেক এলাকায় কয়েক মাস আগে এ কে বিল্ডার্স নামে একটি আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ ওঠে।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, জামিল নামে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর পক্ষ থেকে এই চাঁদা দাবি করা হয়। জামিল বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

চাঁদা না দেওয়ায় একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলার সময় কয়েকটি গুলি ছোড়া হয়। এতে শরিফুল ইসলাম নামে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা আহত হন।

ঘটনাটি নিয়ে তদন্তের পর বিদেশে অবস্থানরত ওই সন্ত্রাসীর নির্দেশনার বিষয়টি সামনে এসেছে বলে সূত্র দাবি করেছে।

এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় সহযোগীদের পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ মাঠে যারা হামলা বা চাঁদা তুলতে যায়, তারা গ্রেপ্তার হলেও মূল নির্দেশদাতা দেশের বাইরে থাকেন।

নির্মাণকাজ বন্ধ করে চাঁদা

মিরপুরের বাউনিয়া কালীবাড়ি এলাকায় মনোয়ারা হাউজিংয়ের একটি ভবনের পাইলিংয়ের কাজ চলছিল। গত ২৫ আগস্ট সেখানে একদল সন্ত্রাসী গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ।

তারা নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর ভাইয়ের লোক এবং কায়েস ভাই তাঁদের পাঠিয়েছেন বলে পরিচয় দেয়।

পরে ভবনের মালিককে বিদেশি একটি নম্বরে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তি নিজেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভবনের কাজ চালিয়ে যেতে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রাণনাশের আশঙ্কায় ভবন মালিক টাকা দিতে বাধ্য হন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ধরনের ঘটনা নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিলে প্রতিদিনই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। ফলে অনেকেই পুলিশের কাছে না গিয়ে চাঁদা দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে চান।

মোহাম্মদপুরেও একই কৌশল

মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকায় এক মোবাইল ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিছু সময় পর তাঁর দোকানে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। এই চাঁদা দাবির ঘটনায় মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত কিলার বাদলের নাম এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাদল বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।

এ ঘটনায়ও বিদেশে থাকা ব্যক্তি ফোনে নির্দেশ দেওয়ার পর স্থানীয় সহযোগীরা মাঠে গিয়ে হামলা চালিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্টরা।

চাঁদার ধরন বদলেছে

আগে চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন বা বাজারকে কেন্দ্র করে মাসিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ বেশি শোনা যেত। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্মাণ খাতের নানা ধরনের নতুন চাঁদা।

ভবনের প্রতি ফ্লোরের জন্য আলাদা টাকা, নির্মাণসামগ্রী আনা-নেওয়ার জন্য চাঁদা, ইট-বালু-রডের ব্যবসার জন্য টাকা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য মাসিক চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাঁদার পরিমাণ লাখ থেকে কোটি টাকায় পৌঁছাচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, বড় প্রকল্প বা নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের টার্গেট করা হচ্ছে বেশি। কারণ তাঁদের কাছ থেকে একবারে বড় অঙ্কের টাকা আদায়ের সুযোগ থাকে।

অভিযোগ করলেই বাড়ে ভয়

চাঁদাবাজির শিকার ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না। তাঁদের আশঙ্কা, অভিযোগ করলে হামলা বা হত্যার হুমকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

আবার চাঁদা তুলতে যাওয়া স্থানীয় সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার হলেও বিদেশে থাকা মূল নির্দেশদাতা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। এ কারণেও অনেকে মনে করেন, পুলিশের কাছে অভিযোগ করে তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধান হবে না।

ফলে অনেক ব্যবসায়ী গোপনে সমঝোতা করে টাকা দিয়ে দেন। এতে চাঁদাবাজদের সাহস আরও বাড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশি নম্বর থেকে ফোন এলেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণও এটি।

ফোন না ধরলেও বিপদ

কিছু ক্ষেত্রে চাঁদাবাজদের ফোন না ধরলেও বিপদ থেকে রেহাই মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

চাঁদাবাজদের ফোন উপেক্ষা করার পর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা নির্মাণস্থলে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। কোথাও কোথাও চাঁদা না পাওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ফলে ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের অনেকেই বাধ্য হয়ে ফোন ধরছেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করছেন।

এভাবে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের একটি চক্র গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

২০২৪ সালের পর নতুন করে সক্রিয়

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাজধানীর অপরাধজগতের বিভিন্ন গ্রুপ নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, মতিঝিল, খিলগাঁও, হাজারীবাগ ও রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।

এর মধ্যে মিরপুর এলাকায় ফোর স্টার গ্রুপের তৎপরতার কথা বলছে গোয়েন্দা সূত্র।

সূত্রের দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুন, ইব্রাহীম খলিল ওরফে কিলার ইব্রাহীম, শাহাদাত হোসেন ও মোক্তার হোসেন এই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন। মামুনের দুই ভাই মশিউর রহমান মশু ও জামিলও এই গ্রুপের সঙ্গে সক্রিয় বলে সূত্রের দাবি।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

নতুন গ্রুপ নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ফোর স্টার গ্রুপের বাইরে কিলার আশিক নামে পরিচিত এক ব্যক্তিও নতুন একটি গ্রুপ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

রাজনৈতিক একটি মহলের ইন্ধনে তিনি নতুন গ্রুপ তৈরি করে চাঁদাবাজিতে সক্রিয় হয়েছেন বলে সূত্রের অভিযোগ। এ নিয়ে পুরোনো গ্রুপের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মিরপুর এলাকায় বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে।

অপরাধী গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হলে সাধারণ মানুষও এর শিকার হতে পারেন। অতীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

বিদেশে কারা, দেশে কারা

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তিনি সরাসরি ভবন মালিক বা ব্যবসায়ীদের ফোন না করে তাঁর সহযোগীদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

মামুনের ভাই মশিউর রহমান মশুও মালয়েশিয়ায় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার একটি ঘটনায় পরবর্তী তদন্তে মামুনের নাম উঠে আসে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

শীর্ষ সন্ত্রাসী মোক্তার হোসেন ভারতে, শাহাদাত হোসেন ও কিলার ইব্রাহীম দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।

একসময়ের ফাইভ স্টার গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচিত আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাসও সক্রিয় রয়েছেন বলে সূত্রের দাবি।

কিলার আশিক বিদেশে অবস্থান করে ফোনের মাধ্যমে চাঁদা দাবি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রেও সরাসরি টার্গেট ব্যক্তিকে ফোন না করে সহযোগীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করার কৌশল ব্যবহারের কথা জানিয়েছে সূত্র।

এ ছাড়া কাফরুল এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী হাবিবুর রহমান তাজের তৎপরতার কথাও গোয়েন্দা সূত্রে উঠে এসেছে।

মোহাম্মদপুর, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ীতেও তৎপরতা

মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজির সঙ্গে মালয়েশিয়ায় থাকা কিলার বাদলের নাম এসেছে। একই এলাকায় দেশে অবস্থানরত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর তৎপরতার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

যাত্রাবাড়ীর শুটার লিটন বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তাঁর স্ত্রীকে ঘিরে পরিচালিত একটি গ্রুপ মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিতে সক্রিয় রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।

বাড্ডা এলাকায় দুবাইয়ে পলাতক মাহবুব এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মেহেদীর গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকায় দুবাইয়ে থাকা জিসান আহমেদের গ্রুপের তৎপরতার কথাও উঠে এসেছে।

মাঠে সেকেন্ড ইন কমান্ড

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সরাসরি মাঠে না থাকলেও তাঁদের হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করার জন্য রয়েছে সেকেন্ড ইন কমান্ড।

ডিবি সূত্রের দাবি, কিলার আব্বাসের হয়ে তাঁর ভাগ্নে সোহেল মাঠে সক্রিয়। মামুন গ্রুপের চাঁদা সংগ্রহের কাজ পরিচালনা করছে কায়েস।

সম্প্রতি মামুন গ্রুপের আলোচিত সন্ত্রাসী ল্যাংড়া রুবেল, শাহাদাতের শুটার কাইল্লা শামীম এবং মোক্তারের শুটার জাকির গ্রেপ্তার হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, এসব গ্রেপ্তারের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

অস্ত্র মজুতের অভিযোগ

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের গ্রুপ অস্ত্রের মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তাঁর গ্রুপে টিপু সুমন, প্রচার সাইফুল ও শামীমসহ কয়েকজন সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে কিলার আশিকের নতুন গ্রুপের উত্থান ঠেকাতে পুরোনো গ্রুপের সদস্যরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।

এ নিয়ে মিরপুর এলাকায় নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, আধিপত্যের লড়াইয়ে ইতিমধ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কয়েকজন আলোচিত সন্ত্রাসী টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন, তারিক সাইফ মামুন ও কাইল্লা পলাশের নাম রয়েছে।

২০০১ সালের তালিকার সন্ত্রাসীদের কেউ বিদেশে

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অনেকে মারা গেছেন। কয়েকজন এখন কারাগারে রয়েছেন।

তবে তালিকাভুক্তদের একটি অংশ দেশের বাইরে পালিয়ে গেলেও অপরাধজগতের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি।

বিদেশে বসে দেশের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগের কারণে পলাতক এসব সন্ত্রাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

পুলিশ কী বলছে

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে অবস্থানরত পলাতক সন্ত্রাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় চেষ্টা চলছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অনেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসীর পরিচয় দিয়ে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা দাবি করে। এসব ঘটনায় আতঙ্কিত না হয়ে থানায় অভিযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

তাঁর মতে, অভিযোগ পাওয়া গেলে দেশের ভেতরে থাকা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।

বিদেশে থাকা অপরাধীদের বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁদের গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলে আবেদনসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

বিদেশে থাকা আসামিদের ফেরানোর প্রক্রিয়া

ডিবির প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পেলে দেশের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের নাম মামলার অভিযোগপত্রেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ইন্টারপোলসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চাঁদাবাজি ঠেকাতে অভিযোগ জরুরি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি নম্বর থেকে ফোন এলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে ফোনটি সত্যিই কোনো পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী করেছেন। আবার এমন ফোনকে হালকাভাবেও নেওয়া উচিত নয়।

চাঁদার দাবি, হুমকি বা হামলার ঘটনা ঘটলে দ্রুত পুলিশকে জানানো প্রয়োজন। এতে স্থানীয় পর্যায়ে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সহজ হয়। পাশাপাশি বিদেশে থাকা নির্দেশদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা সম্পৃক্ততার তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা সম্ভব হয়।

অভিযোগ না করে গোপনে চাঁদা দিয়ে দিলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়। এতে একই ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আরও বেশি অর্থ দাবি করার সুযোগ তৈরি হয়।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ

বিদেশি নম্বর থেকে হুমকির ফোন, নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ রাজধানীর ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে নির্মাণ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, একটি প্রকল্পে কাজ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য খরচও বাড়তে থাকে। ফলে চাঁদাবাজদের চাপের মুখে অনেকে দ্রুত সমঝোতা করতে বাধ্য হন।

অপরাধীদের এই কৌশল বন্ধ করতে মাঠপর্যায়ে থাকা সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি বিদেশে থাকা মূল নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘রিমোট’ বন্ধ করাই বড় চ্যালেঞ্জ

রাজধানীর অপরাধজগতের বর্তমান চিত্রে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—অপরাধের নির্দেশ সব সময় দেশের ভেতর থেকেই আসছে না। বিদেশে থাকা ব্যক্তিরা প্রযুক্তি ও স্থানীয় সহযোগীদের ব্যবহার করে দেশের ভেতরে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফলে শুধু মাঠে থাকা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হচ্ছে না। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বিদেশে থাকা মূল নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, এ বিষয়ে তারা কাজ করছে। তবে বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা এবং পর্যাপ্ত প্রমাণের প্রয়োজন হয়।

চাঁদাবাজির এই চক্র বন্ধ করতে তাই একদিকে যেমন রাজধানীর মাঠপর্যায়ে অভিযান জোরদার করতে হবে, অন্যদিকে বিদেশে থাকা কথিত নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধেও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ মাঠের সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হলেও যদি বিদেশে থাকা ‘রিমোট’ চালু থাকে, তাহলে নতুন লোক দিয়ে আবারও একই চক্র সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted