মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

দেশের মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। নারীদের স্বাবলম্বী করতে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তাই নারীদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

রোববার বিকেলে কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড, পুরস্কার, ভাতা ও অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে দেশের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরিবারের প্রধান নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীরা পরিবারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন।

তিনি বলেন, ‘দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। সেই কারণে আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, ফ্যামিলি কার্ড দেব। পরিবারের প্রধান নারীর হাতে আমরা ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিচ্ছি। আমরা নারীদের অনার্স পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা করব। মেধাবীদের বৃত্তি প্রদান করব।’

প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণায় দেশের মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের মেয়েরা আর্থিক সমস্যার কারণে যাতে উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে না পড়ে, সে জন্য এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কৃষকদের ঋণ মওকুফ

অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের পর ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।

কৃষকদের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষক দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষকের স্বার্থ রক্ষা ও তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের আর্থিকভাবে শক্তিশালী করা গেলে দেশের খাদ্য উৎপাদনও আরও বাড়বে।

মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ

এর আগে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উদ্বোধন উপলক্ষে কিশোরগঞ্জ সফরে যান প্রধানমন্ত্রী। সকালে ঢাকা থেকে সড়কপথে তিনি প্রথমে পাকুন্দিয়া উপজেলায় পৌঁছান।

পাকুন্দিয়ার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়িঘাট এলাকায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে স্থানীয় মৎস্য চাষিদের মধ্যে মাছের পোনা বিতরণ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সফল ১৪ জন মৎস্য চাষিকে পদক দেওয়া হয়। মৎস্য চাষে তাদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ পদক দেওয়া হয়।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণের আশ্বাস দেন। সেতুটি নির্মাণ হলে ওই এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরে কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা এলাকার জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে আয়োজিত সুধী সমাবেশে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন তিনি।

সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করতে মাছের উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে। দেশের নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে মাছ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, যেসব বিল ও নদী বর্তমানে পরিত্যক্ত বা ব্যবহারের অনুপযোগী, সেগুলো সংস্কার করে সরকারি উদ্যোগে মাছ চাষ করা হবে। এতে একদিকে দেশের মানুষের মাছের চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।

মাছের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। মাছ ও মাছজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া সাড়ে ৭ হাজার একর জমিতে চিংড়ি উৎপাদনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো গেলে দেশের জন্য বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ফ্যামিলি কার্ড পেল পরিবার

দিনের কর্মসূচির সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে বিকেল ৫টার দিকে কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ফ্যামিলি কার্ড, ভাতা, পুরস্কার ও অনুদান বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে ১৪টি পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ১৫ জনকে সম্মানি ভাতা দেওয়া হয়।

জটিল রোগে আক্রান্ত ১০ জন, ১৭ জন প্রতিবন্ধী এবং পাঁচজন দুস্থ ব্যক্তির মধ্যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ১০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে সহযোগিতা করা সরকারের দায়িত্ব। দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, অসুস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে সরকার বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিবাবাদ ইউনিয়নের ৪৫৭ নারী উপকারভোগীর কাছেও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ পাঠানো হয়।

এর ফলে এসব নারী সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পেলেন। পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে এ অর্থ কাজে লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

অনুষ্ঠানে একটি বিশেষ মুহূর্তেরও সৃষ্টি হয়। মাস্টার্স পাস করা প্রতিবন্ধী আনিছুর রহমানের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও প্রতিবন্ধকতার কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়া আনিছুর রহমানের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়াকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে স্বাগত জানান।

শোলাকিয়া ঈদগাহে উন্নয়নকাজের ফলক উন্মোচন

কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রধানমন্ত্রী ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে যান। সেখানে সরকারি অর্থায়নে নেওয়া উন্নয়নকাজের ফলক উন্মোচন করেন তিনি।

শোলাকিয়া ঈদগাহের উন্নয়নে মোট ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এসব উন্নয়নকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী ঐতিহাসিক এ ঈদগাহের গুরুত্ব তুলে ধরে এর উন্নয়ন ও সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।

পরে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সেখানে দুটি নিমগাছের চারা রোপণ করা হয়। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার বার্তাও দেওয়া হয়।

শোলাকিয়া ঈদগাহের কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করেন।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সহায়তা

দিনব্যাপী কিশোরগঞ্জ সফরে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে কৃষক, মৎস্য চাষি, নারী, শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী, অসুস্থ ব্যক্তি, দুস্থ মানুষ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন সহায়তার বিষয় উঠে আসে।

মৎস্য চাষিদের পোনা বিতরণ ও সফল চাষিদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর কার্যক্রমও করা হয়।

মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতে মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনার ব্যবস্থা করার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত মানুষের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ প্রয়োজন। নারীরা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হলে পরিবার ও সমাজ—দুই ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি বলেন, নারীদের শুধু সহায়তা দেওয়াই নয়, তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে নারীদের আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।

স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য

কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন কর্মসূচিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, জেলা বিএনপির সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এমপি, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এমপি এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দীনসহ স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।

তারা কিশোরগঞ্জের মানুষের বিভিন্ন সমস্যা, কৃষি ও মৎস্য খাতের সম্ভাবনা এবং এলাকার উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। দিনের শুরু থেকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে স্থানীয় মানুষ অংশ নেন।

কিশোরগঞ্জ সফরের মধ্য দিয়ে একদিকে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধন হয়েছে, অন্যদিকে সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সুবিধা মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফরে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানো, কৃষকদের সহায়তা, নারীদের আর্থিক ও শিক্ষাগত ক্ষমতায়ন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশেষ করে মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার ঘোষণা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted