
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ, ভারতে কমেছে আমদানি-রপ্তানি—চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ২,২৯৬ কোটি ডলার
ডেস্ক রিপোর্টার :
দীর্ঘ ১৬ বছর পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের অবস্থান বদলে গেছে। এত দিন এই অবস্থানে ছিল প্রতিবেশী ভারত। এখন ভারতকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বড় ব্যবধানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে শীর্ষে রয়েছে চীন।
সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরের হিসাব বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্য হয়েছে ১ হাজার ২৬৭ কোটি ডলার। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য হয়েছে ১ হাজার ৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ ভারতের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ১৯৫ কোটি ডলার বেশি।
এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়া। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতের কাছ থেকে আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিও কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ার পেছনে অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বাণিজ্য আলোচনা ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষির সময় দেশটি থেকে আমদানি বাড়ানোর বিষয়টি সামনে আসে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে দুই দেশই বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর প্রভাব পড়েছে আমদানি ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ল যেভাবে
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত রয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ যত পণ্য রপ্তানি করে, তার তুলনায় দেশটি থেকে কম পণ্য আমদানি করে।
তবে গত অর্থবছরে চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি দ্রুত বাড়ায় দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণও বেড়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৯১১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে ৩৫৬ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৫৫৫ কোটি ডলার।
এর আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪–২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৬২৬ কোটি ডলার। এক বছরে আমদানি বাড়ার কারণে এই উদ্বৃত্ত ৭১ কোটি ডলার কমেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ২৪৯ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫৬ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ১০৭ কোটি ডলার বা ৪৩ শতাংশ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। ফলে দুই দেশের মোট বাণিজ্য প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়লেও এই বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে আমদানি থেকে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার কারণেই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য বেড়েছে। বিশেষ করে সরকারি কেনাকাটায় আমদানি বৃদ্ধির বিষয়টি বেশি দেখা গেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যে বিশেষ শুল্কসুবিধার কথা বলা হয়েছিল, সেটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
পাল্টা শুল্কের আলোচনাও প্রভাব ফেলেছে
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার পেছনে দুই দেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্য আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমানোর নীতির অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। পরে কয়েক দফা আলোচনার মাধ্যমে শুল্কহার কমানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়।
চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একটি পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সই করে। এতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়।
চুক্তির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় পরিমাণে পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতিও দেয় বাংলাদেশ।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য কেনার অঙ্গীকার করেছে। এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করেছে। পরে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়েও দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি নির্দিষ্ট পরিমাণ বস্ত্র ও পোশাকের ওপর পাল্টা শুল্ক শূন্য করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। তবে এই সুবিধা বাস্তবায়নের কাঠামো এখনো কার্যকর হয়নি।
এদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির ১১ দিন পর, ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে। এতে শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তিতে পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি বাতিল বা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি।
কোন পণ্য বেশি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে
বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি বেড়েছে।
সরকারি পর্যায়ে গম ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি বেড়েছে। আর বেসরকারি খাতে সয়াবিনবীজ ও তুলা আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো গম আমদানি করেনি বাংলাদেশ। কিন্তু গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২২ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের গম আমদানি হয়েছে। এর বড় অংশই আমদানি করেছে সরকার।
সয়াবিনবীজ আমদানিও অনেক বেড়েছে। এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিনবীজ আমদানি ৩৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৬২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তুলা আমদানি ২৩ কোটি ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৮ কোটি ডলার।
এ ছাড়া সরকারি খাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৪৮ কোটি ডলারের এলএনজি আমদানি হয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি ২৪৯ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৩৫৬ কোটি ডলারে উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি কিনছেন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার কারণ জানতে দেশটি থেকে নিয়মিত পণ্য আমদানি করে—এমন কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
বেসরকারি খাতে গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক ছিল মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে বাণিজ্যসুবিধা বেড়েছে। একই সঙ্গে পণ্যের মান বিবেচনায় দামও প্রতিযোগিতামূলক ছিল। এসব কারণেই তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হকও একই ধরনের কথা বলেছেন।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের মান তুলনামূলক ভালো। পাশাপাশি সরবরাহের নিশ্চয়তাও বেশি।
তিনি বলেন, বিশ্বের কয়েকটি দেশে সংঘাত চলায় সেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বন্দর ব্যবহারে ঝুঁকি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তাই সব দিক বিবেচনা করেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি পণ্য কেনা হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমল কেন
একদিকে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে কমছে আমদানি ও রপ্তানি—দুই-ই।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের অবস্থান খুব কাছাকাছি। স্থলপথে সহজে পণ্য পরিবহন করা যায়। ফলে তুলা, সুতা, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্য ভারত থেকে দীর্ঘদিন ধরে আমদানি করে আসছে বাংলাদেশ।
ভারত থেকে পণ্য আনতে সময় ও পরিবহন খরচও তুলনামূলক কম। তারপরও গত অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের পতন হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এর পর ৮ এপ্রিল ভারত কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের পণ্য তৃতীয় দেশে রপ্তানির সুবিধা প্রত্যাহার করে।
এরপর ভারত আরও কয়েক দফায় বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে।
১৭ মে ও ২৭ জুন পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা ও সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিক পণ্য এবং কাঠের আসবাবসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে শর্ত আরোপ করা হয়।
পরে ১১ আগস্ট আরও কিছু পাটপণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে ভারত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর প্রতিকারমূলক শুল্ক আরোপের বিষয়েও তদন্ত শুরু করে দেশটি।
দুই দেশের পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপের প্রভাব পড়ে বাণিজ্যে। ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যায়। একই সঙ্গে ভারত থেকে তুলা ও সুতা আমদানিও কমেছে।
পোশাক, তুলা ও সুতায় বড় পতন
২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৬৫ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে তা প্রায় ১২ শতাংশ কমে ৫৭ কোটি ডলারে নেমেছে।
একই সময়ে ভারত থেকে তুলা আমদানিও কমেছে।
ভারত থেকে তুলা আমদানি ৫২ কোটি ডলার থেকে ২৩ শতাংশ কমে হয়েছে ৪০ কোটি ডলার। তুলার সুতা আমদানি ১৭৫ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ১৪৭ কোটি ডলার।
অর্থাৎ শুধু তুলা ও তুলার সুতা—এই দুই কাঁচামালের আমদানিই কমেছে প্রায় ৪০ কোটি ডলার।
এনবিআরের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি হয়েছে ৮৯৬ কোটি ডলারের পণ্য। আগের অর্থবছরের তুলনায় আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ।
ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানিও কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ।
সব মিলিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্য ৭৭ কোটি ডলার বা প্রায় ৭ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭২ কোটি ডলারে নেমেছে।
অশুল্ক বাধার নেতিবাচক প্রভাব
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আরোপ করা বিভিন্ন অশুল্ক বাধার কারণে দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি কমেছে।
তিনি বলেন, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভোক্তা ও উৎপাদক—উভয়ের ওপর।
ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শূন্য শুল্কসুবিধা না থাকলে রপ্তানি আরও কমে যেত বলেও তিনি মনে করেন।
ব্যবসায়ীরাও বলছেন, প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ ও সময় কম লাগে। ফলে দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশ থাকলে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তাঁর মতে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিবেশী দেশ থেকে পণ্য আনলে পরিবহন খরচ ও সময় কম লাগে।
আমদানি বাড়ানোর লাভ কতটা
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লেই সেটিকে সরাসরি লাভ বা ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গম, সয়াবিনবীজ, তুলা বা অন্যান্য পণ্য বাংলাদেশ সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, পণ্যের মান, পরিবহন খরচ ও সরবরাহের নিশ্চয়তা বিবেচনা করে আমদানি করে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যচুক্তির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর বিনিময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশেষ শুল্কসুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধা এখনো কার্যকর হয়নি।
গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭২ শতাংশ।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাংলাদেশ আমদানি বাড়ানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যঘাটতি কমছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর আরও বাড়তি শুল্ক আরোপের আশঙ্কা কমতে পারে।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যে শুল্কছাড়ের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা কার্যকর করার জন্য তাঁরা কাজ করছেন। চলতি সেপ্টেম্বরে এ সুবিধার কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এই সুবিধা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
শীর্ষে চীন, ব্যবধানও বড়
বাংলাদেশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের অবস্থানে পরিবর্তন এলেও শীর্ষে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে চীনই রয়েছে শীর্ষে।
গত অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৯৬ কোটি ডলার। এই পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের চেয়ে প্রায় ৮১ শতাংশ বেশি।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য মূলত আমদানিনির্ভর।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ ২ হাজার ২১৪ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় আমদানি বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে চীনে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৮২ কোটি ডলারের পণ্য। তবে আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।
বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস। শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণ ও মধ্যবর্তী পণ্যের বড় অংশই চীন থেকে আমদানি করা হয়।
তিন দেশের সঙ্গে ৩৯ শতাংশ বাণিজ্য
বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এনবিআরের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য আমদানি ছিল ৭ হাজার ৩১২ কোটি ডলার। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৬২৬ কোটি ডলারের পণ্য।
আমদানি ও রপ্তানি মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলার।
এর মধ্যে চীনের সঙ্গে হয়েছে মোট বাণিজ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১১ শতাংশ এবং ভারতের সঙ্গে ৯ শতাংশ।
অর্থাৎ এই তিন দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
শুধু বাণিজ্যঘাটতি দিয়ে হিসাব করলে হবে না
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ছে বা কমছে—তা বিচার করার সময় শুধু বাণিজ্যঘাটতি কিংবা উদ্বৃত্তের অঙ্ক দেখলে হবে না।
চীন ও ভারত থেকে বাংলাদেশ যে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার বড় অংশই রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্য।
এসব পণ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয়। পরে এসব পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।
তাই এসব আমদানিকে শুধু ভোগের পণ্য হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রকৃত ভূমিকা বোঝা যাবে না।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার বিষয়টিও দীর্ঘমেয়াদে কতটা লাভজনক হবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের জন্য প্রতিশ্রুত শুল্কসুবিধা কত দ্রুত কার্যকর হয়। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি পণ্য আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যয় কতটা বাড়ে। তৃতীয়ত, এসব আমদানির ফলে সরবরাহব্যবস্থা ও স্থানীয় শিল্পে কী ধরনের প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি পরিবহন খরচ, পণ্য সরবরাহে সময়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সহজলভ্যতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। ভারত পিছিয়ে পড়লেও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের ব্যবধান এখনো অনেক বেশি।
তবে দীর্ঘমেয়াদে কোন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাংলাদেশের জন্য বেশি লাভজনক হবে, তা নির্ভর করবে শুধু বাণিজ্যের পরিমাণের ওপর নয়; বরং পণ্যের দাম, মান, সরবরাহের নিশ্চয়তা, শুল্কসুবিধা, পরিবহন খরচ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর।
