উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান; সরকারের সহযোগিতার আশ্বাস
ডেস্ক রিপোর্ট :
সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মানুষের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশপ্রেমিক নাগরিক, ব্যবসায়ী, তরুণ উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও গবেষকসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, একটি কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য সমাজের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
শনিবার সকালে রাজধানী ঢাকায় ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ পরিচালনায় সরকারের পাশাপাশি দেশের মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব, যা হবে মানুষের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ।
কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গড়তে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। কিন্তু সরকারের একার পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, গবেষক এবং তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘দেশ পরিচালনায় সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই আসুন আমরা সকলে মিলে এরকম একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে কাজ করি, যাতে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সক্ষম হই।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে নতুন চিন্তা, নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে কাজে লাগাতে হবে। শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে উন্নয়ন ধরে রাখা সম্ভব নয়। পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে উদ্ভাবনের বিকল্প নেই।
উদ্ভাবনেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ
‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশকেও তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
দেশের তরুণদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা ও নতুন কিছু করার আগ্রহ রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন ব্যবসা ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষকদের নতুন গবেষণায় উৎসাহিত করতে হবে।
সরকার এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
উদ্যোক্তা ও গবেষকদের পাশে থাকবে সরকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বর্তমান প্রয়োজন মেটাতে উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও গবেষকেরা নতুন পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবা তৈরি করতে পারেন। তাঁদের এসব উদ্যোগ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
এ জন্য সরকার উদ্যোক্তা ও গবেষকদের পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ও সরকারের বর্তমান প্রয়োজনে উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার উদ্যোক্তা ও গবেষকদের সর্বাত্মক সহায়তায় সব সময় পাশে থাকবে।’
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উদ্যোগও বাড়াতে হবে। উদ্যোক্তাদের নতুন চিন্তা বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে পারলে দেশে কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
বক্তাদের বক্তব্যে ভবিষ্যতের কর্মপন্থা
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বক্তার দেওয়া বক্তব্য ও দিকনির্দেশনার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের আগের বক্তারা ইনোভেশন বা উদ্ভাবন নিয়ে যেসব বিষয় তুলে ধরেছেন, সেগুলোর মধ্যেই বাংলাদেশের আগামী দিনের কর্মপন্থার অনেকটা দিকনির্দেশনা পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে ডক্টর আনিসুজ্জামানের উপস্থাপনা ও বক্তব্যের প্রশংসা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পূর্ববর্তী বক্তাগণ এবং বিশেষ করে ডক্টর আনিসুজ্জামান ইনোভেশন নিয়ে তার উপস্থাপন ও বক্তব্যে যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, সেগুলোর মধ্য দিয়েই আমাদের আগামী দিনের কর্মপন্থা মোটামুটিভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, এসব কর্মপন্থা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ তার নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব
শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাও জরুরি বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে—দেশের উন্নয়নের জন্য অনেক ভালো চিন্তা ও পরিকল্পনা থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়ন না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
এ কারণে উদ্ভাবন ও গবেষণার ক্ষেত্রে যেসব সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোকে বাস্তব কাজে রূপ দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বক্তাদের দেওয়া দিকনির্দেশনাগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে পারলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এসব কর্মপন্থা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবেই আমরা আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হব।’
তরুণদের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে দেশের বড় শক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অনুষ্ঠানে।
তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। তাঁদের অনেকেই দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরছেন।
তরুণদের এই সৃজনশীল শক্তিকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগাতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগকে সহযোগিতা করা গেলে দেশের কর্মসংস্থান বাড়বে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের এগিয়ে আসার আহ্বান ছিল।
গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন
দেশের উন্নয়নে গবেষণার গুরুত্বও তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতে কর্মরত গবেষকেরা নতুন নতুন বিষয়ে কাজ করছেন। এসব গবেষণাকে বাস্তব প্রয়োজনে কাজে লাগানো গেলে কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে উন্নতি করা সম্ভব।
গবেষণার ফল যাতে শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে উৎপাদন ও সেবার কাজে ব্যবহার করতে হবে।
এ জন্য গবেষক ও শিল্প খাতের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে উদ্ভাবকদের নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সরকার এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ব্যবসায়ীদেরও এগিয়ে আসতে হবে
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
ব্যবসায়ীদের শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে না তাকিয়ে নতুন পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবা তৈরির দিকেও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
দেশীয় উদ্যোক্তারা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।
এ ছাড়া নতুন নতুন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সরকারের সহযোগিতার আশ্বাস
উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের সহযোগিতা করার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার তাঁদের পাশে থাকবে।
নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ভাবনকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, দেশি-বিদেশি উদ্ভাবক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, বুয়েটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান তালুকদার এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
বক্তারা দেশের উন্নয়নে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
উদ্ভাবনমুখী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন ধারণা ও প্রযুক্তিকে সামনে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন খাতের উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও গবেষকদের জন্য এ ধরনের আয়োজন নতুন যোগাযোগ ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে উদ্ভাবন, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি মনে করেন, একটি সমৃদ্ধ ও কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে সরকার, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, গবেষক, উদ্ভাবক ও সাধারণ নাগরিক—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
দেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপরই জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর আহ্বান—দেশের প্রয়োজনকে সামনে রেখে নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে সবাই এগিয়ে আসুক। সরকারও এই উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে পাশে থাকবে।

