
ডেস্ক রিপোর্ট :
ড্রোন মানেই সাধারণত মোটর, ব্যাটারি, পাখা কিংবা নানা ধরনের যান্ত্রিক যন্ত্রাংশ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবার এমন এক ক্ষুদ্র ড্রোন তৈরির পথ দেখিয়েছেন, যেটি চলতে কোনো মোটর বা গিয়ার প্রয়োজন হবে না। শুধু শব্দের শক্তি ব্যবহার করেই এটি বাতাসে চলতে এবং পানিতে ভেসে এগিয়ে যেতে পারবে।
সুইজারল্যান্ডের গবেষকেরা এই নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক সফলতা দেখিয়েছেন। সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ইপিএফএল)-এর একদল বিজ্ঞানী এমন ক্ষুদ্র যন্ত্র তৈরি করেছেন, যার ভেতরে থাকা বিশেষ ফাঁপা প্রকোষ্ঠ শব্দতরঙ্গকে গতিশক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।
গবেষকদের তৈরি এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের ক্ষুদ্র রোবট ও ড্রোনের নকশায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ এতে ভারী মোটর, গিয়ার বা জটিল চৌম্বকীয় যন্ত্রাংশের প্রয়োজন নেই। ফলে খুব ছোট, হালকা এবং নমনীয় রোবট তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
শব্দেই তৈরি হবে চলার শক্তি
এই প্রযুক্তির মূল বিষয় হলো শব্দতরঙ্গ। সাধারণভাবে আমরা শব্দকে শুধু শোনার বিষয় হিসেবে দেখি। কিন্তু শব্দ আসলে এক ধরনের শক্তিও বহন করে। গবেষকেরা সেই শক্তিকেই কাজে লাগিয়েছেন।
তাদের তৈরি ক্ষুদ্র যন্ত্রের ভেতরে রয়েছে বিশেষ ধরনের ফাঁপা প্রকোষ্ঠ। বাইরে থেকে শব্দতরঙ্গ এলে প্রকোষ্ঠের ভেতরের বাতাস কাঁপতে শুরু করে। এরপর সেই বাতাস সরু পথ দিয়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসে।
বাতাসের এই দ্রুত প্রবাহ বিপরীত দিকে একটি ধাক্কা তৈরি করে। সেই ধাক্কাই ক্ষুদ্র ড্রোন বা নৌকাটিকে সামনে এগিয়ে দেয়।
বিষয়টি অনেকটা খালি বোতলের মুখে ফুঁ দেওয়ার মতো। বোতলের ভেতরের বাতাস কম্পিত হলে একটি নির্দিষ্ট ধরনের শব্দ তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা একই ধরনের প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহের নিয়মকে কাজে লাগিয়ে শব্দ থেকে চলার শক্তি তৈরি করেছেন।
অর্থাৎ এখানে মোটর ঘুরিয়ে পাখা চালানোর প্রয়োজন নেই। শব্দের কম্পন থেকেই বাতাসের প্রবাহ তৈরি হচ্ছে এবং সেই প্রবাহ ড্রোনকে এগিয়ে দিচ্ছে।
মাত্র এক সেন্টিমিটারের নৌকা
প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে গবেষকেরা মাত্র এক সেন্টিমিটার আকারের ক্ষুদ্র নৌকা তৈরি করেন। পানিতে ভাসিয়ে সেই নৌকায় বিভিন্ন মাত্রার শব্দ প্রয়োগ করা হয়।
শব্দের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয় লাউডস্পিকার। স্পিকার থেকে নির্দিষ্ট মাত্রা ও কম্পাঙ্কের শব্দ পাঠালে ক্ষুদ্র নৌকাটি পানির ওপর চলতে শুরু করে।
শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়াই নয়, শব্দের ধরন ও দিক পরিবর্তন করে নৌকাটিকে নিয়ন্ত্রণও করা সম্ভব হয়েছে। একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ড্রোনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষাও চালানো হয়।
গবেষকেরা জানান, এই পদ্ধতিতে ড্রোন ও নৌকাগুলো নির্দিষ্ট পথে চলতে পেরেছে। এমনকি সামনে থাকা বাধা এড়িয়ে পূর্বনির্ধারিত পথ অনুসরণ করতেও সক্ষম হয়েছে।
এটি প্রযুক্তিটির সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ ভবিষ্যতে যদি শব্দের মাধ্যমে ক্ষুদ্র রোবটের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে অনেক জটিল যান্ত্রিক অংশ ছাড়াই ছোট আকারের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
ভারী মোটরের প্রয়োজন নেই
বর্তমানের অনেক ছোট ড্রোনেও মোটর, পাখা, গিয়ার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়। এগুলো ড্রোনের ওজন বাড়ায় এবং জায়গাও বেশি নেয়।
অতি ছোট কোনো রোবট বা ড্রোন তৈরি করতে গেলে এই বিষয়গুলো বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ যন্ত্র যত ছোট হয়, তার ভেতরে প্রয়োজনীয় সব উপাদান বসানো তত কঠিন হয়ে যায়।
নতুন প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো, এখানে প্রচলিত ভারী মোটর বা গিয়ারের প্রয়োজন নেই। ফলে যন্ত্রের আকার ও ওজন অনেক কম রাখা সম্ভব।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরও ছোট ও হালকা রোবট তৈরি করা যেতে পারে। এমন রোবট তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যেগুলো মানুষের নাগালের কঠিন জায়গায় গিয়ে কাজ করতে পারবে।
শব্দের নির্দেশে বদলাতে পারে রোবটের আকার
এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা শুধু ড্রোন বা ক্ষুদ্র নৌকা চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
গবেষণাগারের পরিচালক সেলমান সাকার জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই কৌশল ব্যবহার করে এমন নমনীয় রোবট তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা শব্দের নির্দেশ অনুযায়ী নিজের আকার ও গঠন পরিবর্তন করতে পারবে।
এ ধরনের রোবট সাধারণ শক্ত কাঠামোর রোবটের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় হতে পারে। সংকীর্ণ জায়গায় প্রবেশের সময় এটি নিজের আকার ছোট করতে পারে। আবার কোনো কাজ করার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী শরীরের আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে।
শব্দের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নতুন ধরনের রোবট প্রযুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাতাসে ভাসিয়ে রাখার পরীক্ষাও সফল
গবেষকেরা একই কৌশলের আরেকটি ব্যবহার নিয়েও পরীক্ষা চালিয়েছেন। শব্দের শক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন বস্তুকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখার পরীক্ষায়ও তারা সফল হয়েছেন।
শব্দতরঙ্গ দিয়ে কোনো বস্তুকে নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখার বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। তবে নতুন গবেষণায় ব্যবহৃত ক্ষুদ্র যন্ত্রের নকশা ভবিষ্যতে আরও ছোট ও হালকা বস্তুর নিয়ন্ত্রণে কাজে লাগতে পারে।
এর ফলে শব্দের মাধ্যমে শুধু কোনো যন্ত্রকে সামনে এগিয়ে নেওয়া নয়, বরং তাকে নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির রাখা বা অবস্থান পরিবর্তন করার প্রযুক্তিও তৈরি হতে পারে।
ভবিষ্যতে কোথায় কাজে লাগতে পারে?
এই প্রযুক্তি এখনো গবেষণাগার পর্যায়ে রয়েছে। তবে সফলভাবে উন্নত করা গেলে এর ব্যবহার হতে পারে নানা ক্ষেত্রে।
ক্ষুদ্র ড্রোন ব্যবহার করে এমন জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে, যেখানে বড় ড্রোন বা রোবট ঢুকতে পারে না। সংকীর্ণ পাইপ, ছোট যন্ত্রের ভেতর, গবেষণাগারের ক্ষুদ্র কাঠামো কিংবা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছোট জায়গায় এসব রোবট ব্যবহার করা যেতে পারে।
পানিতে চলতে পারে এমন ক্ষুদ্র যন্ত্রও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, পানির মান পরীক্ষা বা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।
তবে বাস্তবে এসব ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত করতে হবে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা, বেশি দূরত্বে চলা এবং শব্দের উৎস ছাড়াই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
প্রচলিত ড্রোন প্রযুক্তিতে নতুন ভাবনা
নতুন এই উদ্ভাবন দেখাচ্ছে, কোনো যন্ত্রকে চালানোর জন্য সবসময় প্রচলিত মোটর ও গিয়ার ব্যবহার করতে হবে—এমন নয়।
প্রকৃতির সাধারণ কিছু নিয়মকে কাজে লাগিয়েও নতুন ধরনের চলন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। শব্দের কম্পন এবং বাতাসের প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে গবেষকেরা তারই একটি উদাহরণ দেখিয়েছেন।
অবশ্য এই প্রযুক্তি এখনই সাধারণ ড্রোনের বিকল্প হয়ে যাচ্ছে না। বড় ড্রোনকে দীর্ঘ সময় উড়ানো বা ভারী জিনিস বহনের জন্য যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন, তা শব্দের মাধ্যমে তৈরি করা এখনো অনেক কঠিন।
তবে অতি ক্ষুদ্র রোবট ও ড্রোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। সেখানে কম শক্তিতে ছোট যন্ত্র চালানোই বড় সুবিধা। তাই ভবিষ্যতের মাইক্রোরোবট প্রযুক্তিতে এই উদ্ভাবনের গুরুত্ব অনেক বেশি হতে পারে।
আরও উন্নয়নের অপেক্ষা
গবেষকদের এই সাফল্য এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। প্রযুক্তিটিকে বাস্তব জীবনে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
কত দূর থেকে শব্দ পাঠালে ড্রোন চলবে, কী পরিমাণ শব্দশক্তি প্রয়োজন হবে, বাতাস বা পানির বিভিন্ন পরিবেশে এটি কতটা কার্যকর থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
এ ছাড়া শব্দের মাধ্যমে একাধিক ক্ষুদ্র ড্রোন একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না, সেটিও ভবিষ্যৎ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মোটর ও গিয়ার ছাড়াই শব্দের শক্তিতে চলতে পারা এই ক্ষুদ্র ড্রোন প্রযুক্তি ভবিষ্যতের রোবট তৈরিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, গবেষণাগারের এই ছোট্ট উদ্ভাবন কত দ্রুত বাস্তব জীবনের কাজে পৌঁছাতে পারে।
