ডেস্ক রিপোর্ট :
বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার পথেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
এডিবির দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়িংমিং ইয়াং বলেছেন, বাংলাদেশকে আরও উৎপাদনশীল, বিনিয়োগনির্ভর ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে এডিবি কাজ করে যাবে। দেশের সব অঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি এবং জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকালে তিনি এসব কথা বলেন। ৯ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সফরে এসে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন ইয়িংমিং ইয়াং।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আগামী কয়েক বছরে আরও বড় ও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়া এবং একই সময়ে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে সরকারের।
এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, বাংলাদেশের এই লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করাই এডিবির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
তাঁর মতে, শুধু অর্থনীতির আকার বাড়ালেই হবে না। প্রবৃদ্ধির সুফল যেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করতে হবে।
এডিবি মনে করে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে নানা অর্থনৈতিক চাপ সামলে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এখন সেই সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কোথায়
ইয়িংমিং ইয়াং বলেন, শক্তিশালী প্রবাসী আয়, সেবাখাতের ধারাবাহিক কার্যক্রম এবং সক্রিয় বেসরকারি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশ পুরোপুরি থেমে যায়নি। বরং অর্থনীতির বিভিন্ন খাত নিজেদের মতো করে কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।
এখন দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এই সহনশীলতাকে কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ শুধু সংকট মোকাবিলা করাই নয়, ভবিষ্যতে যাতে অর্থনীতি আরও দ্রুত বাড়তে পারে, সেই পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
এ জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং বেসরকারি খাতকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এডিবির এই কর্মকর্তা।
প্রবৃদ্ধি বাড়ার আশা
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে উঠতে পারে।
ইয়িংমিং ইয়াং মনে করেন, সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হওয়া, মূল্যস্ফীতি কমে আসা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়লে প্রবৃদ্ধির গতি আরও বাড়তে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে সংস্কারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস থাকলেই হবে না; সেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য অর্থনীতির বিভিন্ন দুর্বল জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সংস্কার জরুরি
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ব্যাংক খাত। এ কারণে ব্যাংক খাতে সুশাসন বাড়ানো, খেলাপি ঋণ কমানো এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট।
তাঁর মতে, ব্যাংক খাত শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।
একই সঙ্গে কর প্রশাসন আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এডিবি।
এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা ও আস্থা বাড়বে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী হতে পারেন।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে নিতে হলে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতকে আরও বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে।
এডিবির মতে, বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে ব্যবসা শুরু করতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
বিনিয়োগের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ও কম খরচের জ্বালানি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচের বড় অংশের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের সম্পর্ক রয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। তাই অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এডিবি।
রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য দরকার
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে এডিবি।
অর্থাৎ শুধু একটি বা কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভর না করে নতুন নতুন শিল্প ও পণ্য তৈরি করতে হবে।
নতুন রপ্তানি খাত গড়ে উঠলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে কোনো একটি খাতে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাবও তুলনামূলকভাবে কম পড়বে।
এ জন্য শিল্পে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের বড় সম্পদ হলো বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত করতে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
এডিবির মতে, তরুণদের জন্য আরও বেশি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি হলে দেশের শিল্প ও সেবাখাত আরও দ্রুত বাড়তে পারবে। একই সঙ্গে বিদেশে দক্ষ কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে প্রবাসী আয়ও বাড়তে পারে।
ইয়িংমিং ইয়াং মনে করেন, নারী ও তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা হলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
দেশের সব অঞ্চলে উন্নয়নের সুযোগ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বড় শহর ও শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
এডিবির প্রস্তাবিত সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন বা আইজিএনডি উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইয়িংমিং ইয়াং বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বড় শহরের বাইরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের খরচ কমানো গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসা বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত হতে পারবে।
এতে নতুন শিল্প গড়ে ওঠার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করতে হবে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর ও সীমান্ত যোগাযোগ আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এডিবির এই কর্মকর্তা।
তবে শুধু রাস্তা বা সেতু তৈরি করলেই হবে না। এসব অবকাঠামোর সঙ্গে ভালো শুল্কব্যবস্থা, দ্রুত পণ্য খালাস, অভিন্ন মানদণ্ড এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থাও থাকতে হবে।
একটি পণ্য যদি কারখানা থেকে বন্দরে দ্রুত পৌঁছাতে না পারে বা বন্দরে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে, তাহলে উন্নত সড়ক থাকলেও ব্যবসায়ীরা পুরো সুবিধা পাবেন না।
তাই ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি নীতিগত ও প্রশাসনিক সংস্কারও একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া দরকার বলে মনে করে এডিবি।
আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় সুযোগ
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় বড় বাজারের মাঝামাঝি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছে।
এ কারণে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন ইয়িংমিং ইয়াং।
বাংলাদেশ চাইলে এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গত মে মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দাও বাংলাদেশকে পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও ডিজিটাল যোগাযোগের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।
এডিবির মতে, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ শুধু নিজের বাজারের জন্য নয়, আশপাশের দেশগুলোর বাজারের জন্যও উৎপাদন ও সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগে নতুন সম্ভাবনা
আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতাকেও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে এডিবি। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হতে পারে।
একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে যাওয়ার পথও সহজ হতে পারে।
ডিজিটাল খাতেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এডিবির সম্প্রতি চালু করা ২০ বিলিয়ন ডলারের এশিয়া-প্যাসিফিক ডিজিটাল হাইওয়ে উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে ইয়িংমিং ইয়াং বলেন, বাংলাদেশ এই উদ্যোগ থেকে উপকৃত হতে পারে।
এর মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল যোগাযোগ আরও উন্নত করা, নির্ভরযোগ্য ব্রডব্যান্ড সেবা বাড়ানো এবং ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কৃষক থেকে উদ্যোক্তা—সবাই উপকৃত হতে পারে
ডিজিটাল যোগাযোগ বাড়লে শুধু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ মানুষও উপকৃত হতে পারেন।
কৃষকেরা অনলাইনে বাজার ও পণ্যের দাম সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন। উদ্যোক্তারা নতুন ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন। রপ্তানিকারকেরা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও সহজে যোগাযোগ করতে পারেন।
তরুণদের জন্য অনলাইনভিত্তিক কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। নারী উদ্যোক্তারাও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ঘরে বসে ব্যবসা পরিচালনা ও পণ্য বিক্রির সুযোগ পেতে পারেন।
এডিবির মতে, প্রযুক্তির সুবিধা যদি দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি
বাংলাদেশের জন্য নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি বা সিপিএস তৈরির কাজও চলছে। এই কৌশলের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে এডিবির সহযোগিতার অগ্রাধিকার ঠিক করা হবে।
ইয়িংমিং ইয়াং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের লক্ষ্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এডিবির সহযোগিতার ধরনও বদলেছে।
নতুন কৌশলের লক্ষ্য হবে বাংলাদেশকে আরও বহুমুখী, প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সংকট মোকাবিলায় সক্ষম অর্থনীতিতে পরিণত করতে সহায়তা করা।
এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সংস্কারের বিকল্প নয় আঞ্চলিক সংযোগ
বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সুযোগ বড় হলেও শুধু যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন ইয়িংমিং ইয়াং।
তাঁর মতে, আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারও চালিয়ে যেতে হবে।
দেশের ব্যবসা যদি নিজস্ব বাজারেই প্রতিযোগিতামূলক না হয়, তাহলে আঞ্চলিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই ব্যবসার খরচ কমানো, নিয়মকানুন সহজ করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নতুন ব্যবসার সুযোগও বাড়তে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের জন্যও নতুন প্রেরণা তৈরি হবে।
বেসরকারি খাত হবে মূল চালিকাশক্তি
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার পথে বেসরকারি খাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখছে এডিবি।
সরকার অবকাঠামো, নীতি ও প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কিন্তু বড় আকারের বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। বাড়বে কর্মসংস্থান। উৎপাদন বাড়বে এবং নতুন বাজার তৈরি হবে।
তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে বড় লক্ষ্য, প্রয়োজন ধারাবাহিক সংস্কার
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়া বাংলাদেশের জন্য বড় একটি লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে অর্থনীতির আকার বাড়ানোর পাশাপাশি এর ভিত্তিও শক্তিশালী করতে হবে।
ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আয় বাড়ানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি যুক্ত করার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
এর সঙ্গে সড়ক, রেল, বন্দর ও ডিজিটাল যোগাযোগ উন্নত করা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সুযোগ কাজে লাগানোও জরুরি।
এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়িংমিং ইয়াংয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জও। তবে সংস্কার অব্যাহত রাখা গেলে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন শুধু বড় একটি সংখ্যা অর্জনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নতুন শিল্প, ভালো কর্মসংস্থান, দক্ষ জনশক্তি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, শক্তিশালী বেসরকারি খাত এবং দেশের সব অঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্য।
এডিবির সহযোগিতায় এসব সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু বড়ই হবে না, আরও প্রতিযোগিতামূলক, বৈচিত্র্যময় ও সহনশীল হয়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা এডিবির।

