ডেস্ক রিপোর্ট :
‘কোনটা কে?’—যমজ সন্তানদের দেখলে এই প্রশ্নটি খুবই স্বাভাবিক। একই রকম চেহারা, একই বয়স, একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা—সব মিলিয়ে যমজ শিশুদের আলাদা করে চেনা অনেকের জন্যই কঠিন।
শুধু আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত মানুষই নন, সন্তান জন্মের পর প্রথম দিকে মা-বাবাকেও অনেক সময় বিভ্রান্ত হতে হয়। বিশেষ করে সদ্যোজাত যমজ শিশুর ক্ষেত্রে দুজনের চেহারার মিল এতটাই বেশি থাকে যে কে কোন শিশু, তা বুঝতে সমস্যা হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে এই বিভ্রান্তি কেটে যায়। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মা-বাবা সন্তানদের খুব সহজে আলাদা করে চিনতে শুরু করেন। মুখের গড়ন প্রায় একই থাকলেও কান্নার ধরন, হাসি, চোখের দৃষ্টি, ঘুমের ভঙ্গি, খাওয়ার অভ্যাস কিংবা গলার স্বরের মতো ছোট ছোট পার্থক্য তাঁরা বুঝে ফেলেন।
অনেক মা বলেন, সন্তানদের আলাদা করে চেনার জন্য কোনো বিশেষ চিহ্নেরও প্রয়োজন হয় না। শুধু একবার তাকালেই তাঁরা বুঝতে পারেন, কোনটি তাঁর কোন সন্তান।
যমজ সন্তানের মা হিসেবে এমনই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন একজন মা। তাঁর যমজ দুই ছেলে অভিনব ও অভিরূপকে ঘিরে শুরুতে যেমন বিভ্রান্তি ছিল, সময়ের সঙ্গে তেমনি তৈরি হয়েছে এক বিশেষ বোঝাপড়া।
‘আমার অভিনব আর অভিরূপ’
গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের কাছে গিয়ে প্রথম জানতে পারেন, তাঁর গর্ভে একটি নয়, দুটি সন্তান। খবরটি শুনে আনন্দের সীমা ছিল না।
সেই মুহূর্তে খুব মনে পড়েছিল মায়ের কথা। কয়েক মাস আগেই তাঁর মা মারা গিয়েছিলেন। স্বামী সুদীপ্ত তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, নাতির মুখ দেখতে পারলে মা সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।
অবশেষে সেই অপেক্ষার দিন এল। হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর তিনি জানতে পারলেন, তাঁদের ঘরে এসেছে দুটি ফুটফুটে ছেলে। দুই ভাই—অভিনব ও অভিরূপ।
সন্তান জন্মের আনন্দের সঙ্গে শুরু হলো নতুন এক অভিজ্ঞতা। দুই ভাইয়ের চেহারায় এতটাই মিল ছিল যে প্রথম কয়েক সপ্তাহ তাঁদের আলাদা করে চিনতে মা-বাবারও বেশ কষ্ট হতো।
কখনো অভিনবকে অভিরূপ বলে ডাকা হতো, আবার কখনো অভিরূপকে অভিনব বলে মনে হতো। ডায়াপার বদলানোর সময়ও তৈরি হতো দ্বিধা। মনে হতো, এই শিশুটির ডায়াপার তো একটু আগেই বদলানো হয়েছে। পরে দেখা যেত, আসলে অন্য শিশুটির ডায়াপার বদলানো হয়েছিল।
বাসায় অতিথি এলেই শুরু হতো একই প্রশ্ন—‘কোনটা অভিনব, আর কোনটা অভিরূপ?’
মা-বাবা দুই শিশুকে দেখিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই আবার প্রশ্ন আসত। অনেক সময় অতিথিরা একজনকে কোলে নিয়ে অন্যজনের নামে ডাকতেন।
কেউ কেউ আবার বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতেন, ‘এবার কিন্তু ঠিক চিনেছি।’ কিছুক্ষণ পরই দেখা যেত, তিনিও ভুল করেছেন। তখন সবাই মিলে হাসাহাসি করতেন।
এভাবে দুই ভাইকে চেনা নিয়ে পরিবারে এক ধরনের মজার প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে মায়ের চোখে সব স্পষ্ট
অভিনব ও অভিরূপের বয়স এখন ছয় মাস। চেহারার মিল এখনো আছে। কিন্তু তাঁদের মা এখন খুব সহজেই দুই ছেলেকে আলাদা করতে পারেন।
কীভাবে?
মায়ের কাছে এখন দুজনের গলার স্বর আলাদা। কান্নার ধরনও আলাদা। এমনকি চোখের দৃষ্টিতেও তিনি পার্থক্য বুঝতে পারেন।
একজনের হাসিতে দুষ্টুমির ছাপ, অন্যজনের হাসি শান্ত ও কোমল। দুজনের ঘুমানোর ভঙ্গিও আলাদা। ক্ষুধা পেলে যে ধরনের কান্না করে, সেটিও মায়ের কানে আলাদা হয়ে গেছে।
মায়ের কাছে তাই এখন আর ‘কোনটা কে?’ প্রশ্নের কোনো বিভ্রান্তি নেই।
তিনি মনে করেন, হয়তো মা হওয়ার কারণেই সন্তানদের এসব সূক্ষ্ম পার্থক্য এত সহজে বুঝতে পারেন।
যমজ সন্তানদের ক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর একার নয়। অনেক মা-বাবার সঙ্গেই শুরুতে একই ঘটনা ঘটে। প্রথম দিকে চোখের সামনে দুজনকে এক মনে হলেও ধীরে ধীরে তাঁদের আচরণ, স্বভাব ও অভ্যাসের পার্থক্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হাসপাতালের রিস্টব্যান্ডই ছিল ভরসা
উদ্যোক্তা সোনিয়া শারমিনেরও রয়েছে যমজ সন্তান। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে—ধ্রুব ও তারা।
ছেলে-মেয়ে হওয়ায় তাঁদের চেহারায় কিছু পার্থক্য থাকার কথা থাকলেও ছোটবেলায় দুজনকে আলাদা করা সহজ ছিল না।
সোনিয়া জানান, সন্তান জন্মের পর প্রথম কয়েক দিন তিনিও বিভ্রান্ত হয়ে যেতেন। হাসপাতালে দুই শিশুর হাতে থাকা রিস্টব্যান্ডই ছিল তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করার প্রধান উপায়।
কোন শিশুর নাম কী, তা নিশ্চিত করতে রিস্টব্যান্ড দেখে নিতে হতো। কারণ দুজনকে পাশাপাশি রাখলে চেহারার মিল দেখে সহজে বোঝার উপায় ছিল না।
তবে মায়ের এই বিভ্রান্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
ধীরে ধীরে তিনি দুই সন্তানের হাসি, মুখের অভিব্যক্তি ও আচরণের পার্থক্য বুঝতে শুরু করেন। একসময় শুধু হাসি দেখেই কোনটি ধ্রুব আর কোনটি তারা, তা চিনে ফেলতে পারতেন।
এটাই সম্ভবত যমজ সন্তানদের মা-বাবার সঙ্গে তৈরি হওয়া বিশেষ সম্পর্কের একটি দিক। বাইরের মানুষ যেখানে শুধু চেহারা দেখেন, মা-বাবা সেখানে সন্তানের অসংখ্য ছোট ছোট আচরণও লক্ষ্য করেন।
যমজদের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিও অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়
শুধু মানুষই নয়, প্রযুক্তিও অনেক সময় অভিন্ন যমজদের আলাদা করতে সমস্যায় পড়ে।
আইফোন এক্স বাজারে আসার পর এর ‘ফেস আইডি’ প্রযুক্তি নিয়ে যমজদের মধ্যে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল। দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে এক যমজ অন্য যমজের ফোনের লক খুলতে সক্ষম হয়েছে।
এ কারণে অ্যাপল জানিয়েছিল, অভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে ফেস আইডি ব্যবস্থার নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম হতে পারে।
অর্থাৎ চেহারা এতটাই কাছাকাছি হলে প্রযুক্তির জন্যও দুজনকে আলাদা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তবে বাস্তব জীবনে সমস্যাটি আরও মজার। কারণ যমজ শিশুদের অনেক সময় একই ধরনের বা একই রঙের পোশাক পরানো হয়। ফলে দূর থেকে তো বটেই, পারিবারিক ছবিতেও কে কোন শিশু, তা বোঝা কঠিন হয়ে যায়।
বিশেষ করে কয়েক বছর পর পুরোনো ছবি দেখতে গেলে পরিবারের সদস্যরাও অনেক সময় থমকে যান—ছবিতে থাকা দুই শিশুর মধ্যে কে কে, তা মনে করতে সময় লাগে।
স্কুলের উপস্থিতিতেও তৈরি হয়েছিল সমস্যা
বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলামের দুই মেয়ে আসিফা ও সায়েফার বয়স এখন আট বছর। দুজনই যমজ।
তাঁদের স্কুলে ফেস আইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেওয়া হয়। কিন্তু দুই বোনের চেহারার মিলের কারণে সেই প্রযুক্তিতেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।
ফলে প্রায়ই আরিফুলের মুঠোফোনে স্কুল থেকে কোনো একজন মেয়ের অনুপস্থিতির বার্তা আসত। অথচ বাস্তবে দেখা যেত, দুই বোনের মধ্যে অন্যজন স্কুলে উপস্থিত ছিল।
পরে স্কুল কর্তৃপক্ষকে দুই বোনের উপস্থিতি আলাদাভাবে কাগজ-কলমে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়।
ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, মানুষের চোখের পাশাপাশি প্রযুক্তির জন্যও অভিন্ন যমজদের আলাদা করে শনাক্ত করা কখনো কখনো কঠিন হয়ে পড়ে।
বাবা নিজেও একবার গুলিয়ে ফেলেছিলেন
যমজ সন্তানের বাবা হিসেবে আরিফুল ইসলামেরও শুরুতে একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
হাসপাতাল থেকে দুই মেয়েকে একই রঙের চাদরে মুড়িয়ে বাসায় আনা হয়েছিল। একপর্যায়ে তিনিও দুই শিশুকে গুলিয়ে ফেলেন।
পরে একজনের হাতে থাকা ছোট্ট একটি দাগ দেখে বুঝতে পারেন, কোনটি কোন মেয়ে।
তবে সময়ের সঙ্গে তাঁর কাছে এই বিভ্রান্তি আর থাকেনি। এখন তিনি খুব সহজেই আসিফা ও সায়েফাকে আলাদা করে চিনতে পারেন।
তবু কখনো যদি মুহূর্তের জন্য দ্বিধা তৈরি হয়, তখন তিনি দুই মেয়ের খাবারের দিকে তাকান।
কারণ তাঁদের খাবারের পছন্দ একেবারেই আলাদা।
একজন যে খাবার পছন্দ করে, অন্যজন সেটি হয়তো পছন্দই করে না। কে কোন খাবার নিজের পাতে তুলে নিচ্ছে, সেটি দেখেও বাবা সহজে বুঝতে পারেন কোনটি আসিফা আর কোনটি সায়েফা।
চেহারা এক হলেও স্বভাব আলাদা
যমজ সন্তানদের চেহারায় যতই মিল থাকুক, তাঁদের স্বভাব, পছন্দ ও আচরণ সব সময় এক হয় না।
একজন হয়তো বেশি চঞ্চল, অন্যজন শান্ত। একজন বেশি হাসিখুশি, অন্যজন কিছুটা লাজুক। একজনের ঘুমানোর অভ্যাস একরকম, অন্যজনের আরেকরকম।
খাবারের পছন্দ, খেলাধুলার ধরন, কথা বলার ভঙ্গি কিংবা বাবা-মায়ের কাছে আবদার করার ধরনেও পার্থক্য থাকতে পারে।
মা-বাবা ধীরে ধীরে এসব পার্থক্য চিনে ফেলেন। ফলে বাইরের মানুষের চোখে যমজ সন্তান দুজনকে দেখতে একই রকম মনে হলেও তাঁদের বাবা-মায়ের চোখে দুজনই আলাদা ব্যক্তিত্বের মানুষ।
এই পার্থক্যগুলোই সময়ের সঙ্গে যমজ সন্তানদের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
যমজ সন্তানকে আলাদা করে চেনার সহজ কিছু উপায়
যমজ সন্তানদের ছোটবেলায় আলাদা করে চিনতে মা-বাবাকে কিছু সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করতে দেখা যায়। এতে পরিবারের অন্য সদস্য ও পরিচিত মানুষদের জন্যও শিশু দুটিকে আলাদা করা সহজ হয়।
একজনকে সব সময় একই পাশে রাখুন।
ছবি তোলার সময় একজন শিশুকে সব সময় ডান পাশে এবং অন্যজনকে বাঁ পাশে রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে। এতে পরে পুরোনো ছবিতেও দুজনকে আলাদা করা সহজ হয়।
ভিন্ন ধরনের পোশাক ব্যবহার করুন।
দুই শিশুকে একই ধরনের পোশাক না পরিয়ে আলাদা ডিজাইন বা আলাদা ধরন বেছে নেওয়া যেতে পারে।
আলাদা রং নির্ধারণ করুন।
একজনের পোশাক, বোতল বা অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিস যদি লাল রঙের হয়, অন্যজনের জন্য সবুজ বা অন্য কোনো রং রাখা যেতে পারে। এতে দ্রুত শনাক্ত করা সহজ হয়।
নখে আলাদা রং ব্যবহার করা যায়।
শিশুর বয়স ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে নখে আলাদা রঙের চিহ্ন ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শিশুর জন্য নিরাপদ উপকরণই বেছে নেওয়া জরুরি।
জন্মদাগ বা তিল খেয়াল করুন।
অনেক শিশুর শরীরে ছোট জন্মদাগ, তিল বা অন্য কোনো সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে। এগুলো খেয়াল করলে যমজদের আলাদা করে চেনা সহজ হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মা-বাবার চোখে কোনো বিভ্রান্তি থাকে না
যমজ সন্তান জন্মের পর প্রথম কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ মা-বাবার জন্য বেশ কঠিন হতে পারে। একই চেহারা, একই বয়স এবং একই রকম পোশাকের কারণে দুজনকে আলাদা করতে সমস্যা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের ছোট ছোট পার্থক্য চিনে ফেলেন।
একজনের কান্না শুনেই বোঝা যায় সে ক্ষুধার্ত, অন্যজনের কান্না শুনে বোঝা যায় সে ঘুমাতে চাইছে। একজনের হাসির ধরন অন্যজনের চেয়ে আলাদা। চোখের চাহনি, হাত-পা নাড়ানোর ভঙ্গি, খাবারের পছন্দ কিংবা ঘুমের অভ্যাস—সবই হয়ে ওঠে আলাদা পরিচয়।
তাই বাইরে থেকে যমজ সন্তানকে যতই একই রকম মনে হোক, মা-বাবার কাছে তাঁরা কখনোই পুরোপুরি এক নন।
বরং প্রতিদিনের যত্ন, ভালোবাসা আর একসঙ্গে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে মা-বাবার চোখে তাঁদের আলাদা ব্যক্তিত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘কোনটা কে?’—এই প্রশ্নটি তাই হয়তো আত্মীয়স্বজনের কাছে দীর্ঘদিনের ধাঁধা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু মা-বাবার কাছে সেই ধাঁধার উত্তর খুব দ্রুতই সহজ হয়ে যায়।
একসময় শুধু মুখ দেখেই নয়, কান্না শুনে, হাসি দেখে, চোখের দিকে তাকিয়ে কিংবা হাঁটার শব্দ শুনেই তাঁরা বলে দিতে পারেন—এটা তাঁদের কোন সন্তান।
