ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবি; সড়ক অবরোধে স্থবির যান চলাচল, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
ডেস্ক রিপোর্ট
ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। তাঁদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে মিরপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মেট্রোরেলের পাঁচটি স্টেশন বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
রোববার দুপুর ১২টার দিকে মিরপুর-১০ এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর নিরাপত্তার স্বার্থে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন বন্ধ করা হয়। পরে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া স্টেশনও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে পাঁচটি স্টেশনে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।
সকাল থেকেই মিরপুর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকরা দলে দলে এসে সড়কে অবস্থান নিতে শুরু করেন। তাঁদের বিক্ষোভের কারণে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪, পল্লবীসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে বিপাকে পড়েন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, যাত্রী ও পথচারীরা। অনেককে দীর্ঘ সময় রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়। কেউ কেউ গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকল্প পথ ব্যবহার করেন। তবে আশপাশের সড়কেও যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সড়কে শ্রমিকরা
রোববার সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা তাঁদের দাবি আদায়ের জন্য সড়কে জড়ো হতে থাকেন। তাঁদের প্রধান দাবি, পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে।
শ্রমিকদের এই দাবিকে কেন্দ্র করে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তাঁরা সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। মিরপুর-১০ এলাকাকে কেন্দ্র করে আশপাশের সড়কেও শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। মিরপুর-১১, মিরপুর-১২, পল্লবী ও মিরপুর-১৪ এলাকায় এর প্রভাব পড়ে।
রাজধানীর এই অংশে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। বিশেষ করে মিরপুর-১০ একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। এখান থেকে বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার জন্য বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। ফলে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো এলাকার স্বাভাবিক চলাচল ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, উত্তপ্ত মিরপুর-১০
শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়। রোববার দুপুর ১২টার দিকে মিরপুর-১০ এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে দুপুর ১২টার পর পুলিশ মিরপুর-১০ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁদের কেউ মিরপুর-২, কেউ মিরপুর-১১ এবং কেউ মিরপুর-১৪ এলাকার সড়কে বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান নেন।
এতে মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে পারেনি। কোথাও কোথাও যানবাহন চলাচল শুরু হলেও অধিকাংশ সড়ক প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়ে।
পুলিশের উপস্থিতি বাড়ার পর সড়কে সাধারণ মানুষের চলাচলও সীমিত হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাউকে সড়কে দাঁড়াতে দিচ্ছিল না।
পাঁচটি মেট্রোস্টেশন বন্ধ
শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রভাব পড়ে মেট্রোরেল চলাচলেও। পরিস্থিতি বিবেচনায় মেট্রোরেলের পাঁচটি স্টেশন বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
প্রথমে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন বন্ধ করা হয়। পরে নিরাপত্তার কারণে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া স্টেশনও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মেট্রোরেল রাজধানীর উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই পরিবহন ব্যবহার করে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন।
বিশেষ করে মিরপুর এলাকার যাত্রীদের একটি বড় অংশ মেট্রোরেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পাঁচটি স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের যাতায়াতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকার পাশাপাশি মেট্রোরেলের স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক যাত্রী বিকল্প পরিবহন খুঁজতে বাধ্য হন। এতে ওই এলাকার সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
যান চলাচল বন্ধ, দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ
মিরপুরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে সকাল থেকেই যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছিল। সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪ এবং পল্লবী এলাকার বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যেসব মানুষ সকালে কর্মস্থল বা জরুরি কাজে বের হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি।
বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়েন। অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওনা হন। আবার কেউ বিকল্প যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করেন।
সড়ক অবরোধের কারণে রিকশা, বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। কিছু সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গে কিছু যানবাহন সীমিতভাবে চলাচল শুরু করে।
তবে মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল ফিরতে পারেনি। রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা থাকলেও পুলিশ কাউকে সেখানে অবস্থান করতে দিচ্ছিল না।
পুলিশের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর-১০
সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মিরপুর-১০ এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুলিশের হাতে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তাঁরা সড়কে মানুষের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করছেন।
মিরপুর থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা এসআই হাফিজুল ইসলাম বলেন, এই মুহূর্তে এলাকাটি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত আছেন এবং পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে থেকে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন।
পুলিশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর মিরপুর-১০ এলাকায় কিছু যানবাহন সীমিতভাবে চলাচল শুরু করলেও স্বাভাবিক পরিবেশ পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
শ্রমিকদের দাবি ও জনদুর্ভোগের প্রশ্ন
পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি নতুন নয়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে শ্রমিকদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে তাঁদের বিক্ষোভের ঘটনা সামনে এসেছে।
অন্যদিকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ এবং সংঘর্ষের কারণে সাধারণ মানুষও চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে মেট্রোরেলের পাঁচটি স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মিরপুর ও আশপাশের এলাকার যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
শ্রমিকদের দাবি ও জনদুর্ভোগ—দুই বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে রোববারের শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপে মিরপুর-১০ এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং মেট্রোরেলের পাঁচটি স্টেশন বন্ধ থাকার কারণে দিনভর ভোগান্তিতে পড়েন ওই এলাকার বাসিন্দা ও যাত্রীরা।

