কোটি কোটি টাকা খরচ, তবু নিয়ন্ত্রণে আসছে না মশা

ডেস্ক রিপোর্ট :

মশা নিয়ন্ত্রণে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। নানা কর্মসূচি, ওষুধ ছিটানো ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর পরও কমছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ। বরং বর্ষা মৌসুমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। প্রশ্ন উঠছে—এত উদ্যোগ ও অর্থ ব্যয়ের পরও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না মশা?

চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ হাজার ২৭২ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৭৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই পালিত হচ্ছে বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতেই দিবসটি পালন করা হয়।

পাঁচ বছরে খরচ ৭৩৮ কোটি টাকা

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের গত পাঁচ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ প্রতিবছরই বেড়েছে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৫৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বরাদ্দ দিয়েছে প্রায় ১৯৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

অর্থাৎ পাঁচ বছরে দুই সিটি করপোরেশন মিলে মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ দিয়েছে প্রায় ৭৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। এরপরও ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় মশা নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কর্নারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর চাপ আরও বাড়লে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রূপ দেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। সেখানে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ায় কোথাও কোথাও শয্যার পাশাপাশি মেঝেতেও রোগী রাখতে হচ্ছে।

হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, চলতি মাসের শুরু থেকে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বাড়ছে। সব বয়সের মানুষই আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকই মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা বলে জানান তিনি।

রোগীর বাড়ির আশপাশেও নজর দেবে ডিএনসিসি

ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার পর শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার রোগীর বাড়ির আশপাশেও মশার প্রজননস্থল খুঁজে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি।

রাজধানীর ১০টি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যাবে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। সেখানে এডিস মশার প্রজননস্থল ও সম্ভাব্য আবাসস্থল শনাক্ত করে তা ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানান, রোগীদের ঠিকানায় পৌঁছে মশার আবাসস্থল ধ্বংস করা গেলে একই এলাকায় নতুন করে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

তবে রোগীদের সঠিক ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য না পাওয়ায় অনেক সময় শতভাগ রোগীর বাড়িতে পৌঁছানো সম্ভব হয় না বলেও জানান তিনি।

শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশার ওষুধ ছিটালেই হবে না। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাসের কারণে শিশুদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আবার কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় চলাচল করায় তরুণদেরও সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে।

তাঁর মতে, বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণের পাশাপাশি নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর শুরু হলেই দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও বর্ষায় ডেঙ্গু রোগী বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রাখা হচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে অতিরিক্ত শয্যা ও পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, মশা নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কার্যকর ফল পেতে হলে শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর না করে সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে না পারলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো কঠিন হবে।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted