রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে নিজস্ব অর্থায়ননির্ভর অর্থনীতিতে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ জন্য করের আওতা বাড়ানো, কর অব্যাহতি কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, কর ফাঁকি ও কর পরিহার বন্ধ করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই তুলনায় রাজস্ব আদায় বাড়েনি। ফলে সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু বর্তমান করদাতাদের ওপর বাড়তি করের চাপ দেওয়া যাবে না। বরং নতুন করদাতা তৈরি করতে হবে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাজস্ব সম্মেলন শুধু হিসাবের বিষয় নয়
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব সম্মেলন শুধু কত টাকা কর আদায় হলো বা কত টাকা আদায় করা হবে—সেই হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরির ক্ষেত্র হিসেবেও এই সম্মেলনের গুরুত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই নির্ভরতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
আমির খসরুর মতে, দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে সরকারের আয় বাড়ানোর টেকসই ব্যবস্থা করতে হবে। আর সেই আয় বাড়ানোর প্রধান পথ হলো একটি কার্যকর ও আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, কীভাবে নিজস্ব অর্থায়নের ভিত্তিতে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়, সেই পথ নির্ধারণে রাজস্ব সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার, ব্যবসায়ী, করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি।
কর-জিডিপি অনুপাত বড় দুর্বলতা
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো কম কর-জিডিপি অনুপাত। অর্থাৎ দেশের মোট অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকার যে পরিমাণ কর আদায় করছে, তা খুবই কম।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই হার অনেক কম। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গেও বাংলাদেশের ব্যবধান বড়।
তিনি জানান, ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেক পিছিয়ে।
অর্থনীতির আকার বাড়ার পরও কেন রাজস্ব আয় একই হারে বাড়ছে না—এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতাও বাড়তে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই জায়গায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
শুধু পুরোনো করদাতাদের ওপর চাপ নয়
রাজস্ব আয় বাড়াতে গিয়ে শুধু যারা বর্তমানে নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর করের বোঝা বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশে কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে—এমন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনো কর ব্যবস্থার আওতার বাইরে রয়েছে। তাদের করের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যারা কর দিচ্ছেন, তাদের জন্য কর দেওয়ার প্রক্রিয়াও আরও সহজ করতে হবে।
কর ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি কর অব্যাহতির বিষয়টিও নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানে যেসব কর অব্যাহতি দেওয়া হয়, সেগুলো অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কর অব্যাহতি যদি যৌক্তিক না হয়, তাহলে তা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোথায় কর অব্যাহতি প্রয়োজন এবং কোথায় তা কমানো বা বন্ধ করা দরকার—সেটি বাস্তবতার আলোকে নির্ধারণ করতে হবে।
কর ফাঁকি ও পরিহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা
রাজস্ব আয় বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর ফাঁকি বন্ধ করা। দেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ লেনদেন হলেও তার একটি অংশ যথাযথভাবে কর ব্যবস্থার আওতায় আসে না। ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
কর ফাঁকি ও কর পরিহারের সুযোগ বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। করদাতা যাতে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করে কর ফাঁকি দিতে না পারেন, সে জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে কর কর্মকর্তাদের কাজের ক্ষেত্রেও আধুনিক পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ যত কমানো যাবে, ততই স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনে জোর
রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের ওপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে করদাতাদের জন্য কর দেওয়া যেমন সহজ হবে, তেমনি রাজস্ব প্রশাসনের কাজেও গতি আসবে।
অটোমেশনের মাধ্যমে করদাতার তথ্য সংরক্ষণ, কর নির্ধারণ, রিটার্ন দাখিল, অর্থ পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের কাজ আরও সহজে করা সম্ভব হবে। এতে করদাতাদের সময় ও খরচ কমবে। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে।
করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর দেওয়ার প্রবণতা বাড়ানোর জন্যও একটি সহজ ও নাগরিকবান্ধব ব্যবস্থা প্রয়োজন। কর দেওয়া যদি জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়, তাহলে অনেকেই কর ব্যবস্থার বাইরে থাকার চেষ্টা করতে পারেন। তাই পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ করার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
এনবিআর ভেঙে দুটি প্রতিষ্ঠান
রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, পুরোনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরকে ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় একটি প্রতিষ্ঠান রাজস্ব নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবে। এর নাম হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ। অন্য প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে, যার নাম হবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নীতি নির্ধারণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আলাদা হলে দুই ক্ষেত্রেই আরও বেশি স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের কাজে জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থার এই কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো দেশের কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করা। পাশাপাশি করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উন্নয়নের জন্য নিজস্ব অর্থের জোগান বাড়াতে হবে
বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্যান্য সরকারি কার্যক্রমে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এই অর্থের বড় অংশ আসে সরকারের রাজস্ব থেকে।
রাজস্ব আয় পর্যাপ্ত না হলে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণ নিতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও বাড়ে। ফলে সরকারের অন্যান্য খাতে ব্যয় করার সুযোগ কমে যেতে পারে।
এ কারণে নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়িয়ে সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই বিষয়টিই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তবে রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির যেসব অংশ এখনো করের আওতার বাইরে রয়েছে, সেগুলোকে ধীরে ধীরে ব্যবস্থার মধ্যে আনা, কর ফাঁকি বন্ধ করা এবং কর ব্যবস্থাকে সহজ করাই হবে মূল লক্ষ্য।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশকে ঋণনির্ভরতা থেকে নিজস্ব অর্থায়নের দিকে নিতে হলে রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। শুধু করের হার বাড়িয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। বরং করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, করদাতাদের সেবা উন্নত করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। করব্যবস্থা এমন হতে হবে, যেখানে নিয়মিত কর দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো হয়রানির শিকার হবে না এবং কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও থাকবে না।
অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। এতে দেশের আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যে তাই মূল বার্তা হলো—দেশের অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। নতুন করদাতা তৈরি, কর ফাঁকি বন্ধ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এবং রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে এগোতে চায় সরকার।
রাজস্ব সম্মেলনের আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই সংস্কারের একটি রূপরেখা সামনে এসেছে। এখন এর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এবং ঋণনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে।

