তিনি বলেন, ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার ভয়টা চলে গেলে তখন সরকার কেমন দানবে পরিণত হয় সেটা আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট আমল থেকে আমরা বুঝতে পারি। যেটার কারণে আমাদের ১ হাজারেরও বেশি ছাত্র-জনতাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে চিরস্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে হয়েছে। কত কঠিন ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়েছে আমাদের তা উপলব্ধি করে সার্বিকভাবে চিন্তা-চেতনার প্রয়োজন আছে। আমরা আশাবাদী থাকব। কিন্তু আমরা যেন ইউটোপিয়ান হয়ে না যাই।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, বিগত সময়ে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছিলেন, পার্বত্য অঞ্চলের জন্য কাজ করছিলেন এজন্যই মাইকেল চাকমাকে তুলে নেওয়া হলো। আইনগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও তুলে নেওয়া হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানেও নাগরিক তার অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামার কারণে অনেককেই জীবন দিতে হয়েছে। কাউকে চোখ হারাতে হয়েছে, কাউকে পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, এক বছর পরও এক বিশাল জনগোষ্ঠী এ ঘটনাকে অস্বীকার করছে। অনেকে বলছে- এ ঘটনাটি নিজেরাই ঘটিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার জন্য। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় ১৩০০-এর বেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতায় ১১৮০ জন নিহত হয়েছেন। এক বছরে প্রায় ২৫০০ জনকে প্রাণ হারাতে হয়েছে জুলাই ও জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে। যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া একটা লম্বা পথ। এ সময়টুকু পাশে থাকতে হবে।
গুমের শিকার মাইকেল চাকমা বলেন, আমি কখনো ভাবতে পারিনি যে পৃথিবীর আলো দেখতে পাব। ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল ছিল আমার জীবনের ভয়াবহ দিন, যেদিন আমার জীবনের আলো নিভে গিয়েছিল। পরিবারের কাউকে না জানিয়ে গুম করা মানে মৃত্যুর সমান। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর অন্ধকারে কেটে গেল। প্রতিটি দিন ছিল একেকটা বছরের মতো লম্বা। আমাকে তুলে নেওয়ার পর আমার পরিবার, মানবাধিকার কর্মীসহ অনেকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছে। একপর্যায়ে আমার পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। একসময় তারা আমার শেষকৃত্য করে নেয়। সেই অবস্থা থেকে মুক্ত হয়েছি। কিন্তু এখনো প্রশ্ন রয়ে যায় ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে? এই বাংলাদেশে নানা জাতির বর্ণের মানুষ বাস করি আমরা যেন এক হয়ে বাস করতে পারি। আমি আশাবাদী এবং আমার ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াই এখনো চালু রেখেছি।
শহীদ নূরের বোন আফরিন আমান বলেন, নূরের বয়স ১৩ বছর। সে কী রাজনীতি বুঝত? সে শুধু বুকভরা সাহস আর হাতে পতাকা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। সে বলত অনেক বড় হবে, তাকে মানুষ এমনভাবে চিনবে যেন আমরা তার পরিচয় সবার সামনে দিতে পারি। তাকে এখন সবাই চেনে, তবে একজন শহীদ হিসেবে। তার রক্ত, আত্মত্যাগ এখন আর কারও চোখে পড়ে না। মা এখনো নূরের কাপড়চোপড় ধরে কান্না করে। বাবা এখনো নূরের কবরের কাছে গিয়ে কান্না করে। এক বছর হয়ে গেলেও কোনো বিচার পাচ্ছি না। ভাইয়ের রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা পেয়েছি এই স্বাধীন দেশে এখন আমরা ক্ষমতার লড়াই আর নির্বাচনের নাটক দেখতে চাই না। আমার ভাইসহ সব শহীদের হত্যার বিচার চাই। সেই সঙ্গে জুলাই সনদ ঘোষণা চাই।
আরও ছিলেন জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয় কার্যালয়ের (ইউএনআরসিও) জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রধান উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান, দৈনিক আমাদের সময়ের সম্পাদক আবু সাঈদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ একরামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়াও জুলাই গণ অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন সময় গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।