ফেসবুকে নারীদের হেনস্তা, মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশ করছে ‘নো মোর সাইলেন্স’

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘২৪ ঘণ্টার জন্য পৃথিবী থেকে সব পুরুষ উধাও হয়ে গেলে আপনি কী করবেন?’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্নের জবাবে এক তরুণী বলেছিলেন, ‘রাতে একা হাঁটতাম। রাত তিনটা বাজে হেঁটে দেখব কেমন লাগে?’

তরুণীর এই উত্তর নারীর নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তবে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলেও অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়। নারী নির্যাতন বা হত্যার মতো গুরুতর ঘটনার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য, বিদ্রূপ ও কটূক্তি করতে দেখা যায়।

সম্প্রতি কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায়ও এমন চিত্র দেখা গেছে। ওই কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অপরাধীদের বিচার এবং নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ কিশোরীকে নিয়েই অশালীন মন্তব্য করেছেন।

এ ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ। বিভিন্ন সংবাদ ও আলোচিত ঘটনার নিচে নারীদের নিয়ে অশালীন, অপমানজনক কিংবা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা ব্যক্তিদের ছবি, পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করছে গ্রুপটি।

গ্রুপটির দাবি, এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের মন্তব্যের স্ক্রিনশট সংশ্লিষ্ট কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দূতাবাসেও পাঠানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে গ্রুপটি।

তবে এ উদ্যোগের পাশাপাশি ভুল ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকিও সামনে এসেছে। তাই অনলাইনে নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর ক্ষেত্রে যেমন জবাবদিহি জরুরি, তেমনি কারও পরিচয় প্রকাশের আগে সঠিকভাবে তথ্য যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্যের আড়ালে নয়, নিজের কথার দায় নিতে হবে

‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি, পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিংক। তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ। তাঁদের কেউ প্রবাসী, কেউ চিকিৎসক, চাকরিজীবী কিংবা শিক্ষার্থী।

গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াস একজন লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নো মোর সাইলেন্স’ একটি সামাজিক সচেতনতামূলক ফেসবুক গ্রুপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবমাননাকর, অপমানজনক ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার বিষয়গুলো জনসমক্ষে তুলে ধরাই এর উদ্দেশ্য।

আবির আহম্মেদ পিয়াসের ভাষ্য, অনেকে মনে করেন, ফেসবুকে যা ইচ্ছা লেখা যায়, এতে কোনো সমস্যা হবে না। এই ধারণা থেকে মানুষকে বের করে আনতে চান তাঁরা। অনলাইনে করা মন্তব্যও সামাজিক আচরণের অংশ। তাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকতে হবে।

তিনি বলেন, গ্রুপটির মূল লক্ষ্য হলো অন্যায়ের প্রতিবাদে নীরব না থাকা এবং অনলাইনে অপমানজনক মন্তব্যের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা।

গত বছরের ২ নভেম্বর গ্রুপটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে গ্রুপটির কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন দুই মডারেটর। তাঁদের একজন উম্মে সুরাইয়া সুমি। তিনি নতুন উদ্যোক্তা এবং পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। অন্য মডারেটর জাকিয়া হোসেন উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

হবিগঞ্জের কনসার্টের ঘটনা থেকে যাত্রা

নারীদের অনলাইনে হেনস্তার বিরুদ্ধে এই উদ্যোগের শুরু হয়েছিল হবিগঞ্জের একটি কনসার্টে যৌন হয়রানির ঘটনা থেকে।

বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে হবিগঞ্জের জালাল স্টেডিয়ামে ওই কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল। একপর্যায়ে সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কনসার্টে উপস্থিত নারীদের যৌন হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

ঘটনার পর একটি ফেসবুক আইডি থেকে এক নারীর শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার ঘটনা নিয়ে কদর্য ভাষায় মন্তব্য করা হয়। মন্তব্যটির নিচে অনেকে হাসির প্রতিক্রিয়াও দেন।

এ ঘটনা ক্ষুব্ধ করে আবির আহম্মেদ পিয়াস ও তাঁর দুই সহযোগীকে। তাঁদের মনে হয়, নারীদের হেনস্তা করার পর সেই ঘটনা নিয়ে অনলাইনে গর্ব করা কিংবা হাসাহাসি করারও জবাবদিহি থাকা দরকার। এ ভাবনা থেকেই তাঁরা ‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

পরে ওই ফেসবুক আইডির পরিচয় প্রকাশ করা হলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ওই নামে ব্যবহৃত আইডি থেকে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করা হয়, মুঠোফোন হারিয়ে যাওয়ার পর আইডিটি হ্যাক হয়েছিল এবং অন্য কেউ ওই মন্তব্য করেছিলেন। এ জন্য ক্ষমাও চাওয়া হয়।

পাশাপাশি হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও কনসার্টের আয়োজকদের কাছে পৃথক অবহিতপত্র ও অঙ্গীকারনামা দেওয়ার কথাও জানানো হয়।

ঘটনাটি অনলাইনে নারীদের হেনস্তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা যেমন সামনে এনেছে, তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলেছে—কোনো ব্যক্তির নামে ব্যবহৃত অ্যাকাউন্ট থেকে মন্তব্য করা হলেই কি নিশ্চিত হওয়া যায় যে মন্তব্যটি তিনিই করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্বও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

অপরাধের খবরেও নারীদের নিয়ে বিদ্রূপ

নারীর প্রতি সহিংসতা বা অপরাধের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় অপরাধের নিন্দা করার পরিবর্তে ভুক্তভোগীকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা হয়। ‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপের বিভিন্ন পোস্টে এমন কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর একটি টেলিভিশন চ্যানেল কক্সবাজারের একটি হোটেলের শৌচাগার থেকে এক নারীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের খবর প্রকাশ করে। পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন ওই নারী। মামলার শুনানিতে হাজিরা দিতে তিনি কক্সবাজারে গিয়ে একটি হোটেলে উঠেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল আড়াই বছরের শিশুসন্তান ও এক ব্যক্তি।

পরে হোটেলের শৌচাগারে ওই নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। শিশুটি হোটেলের কক্ষে ছিল। সঙ্গে থাকা ব্যক্তি পলাতক ছিলেন বলে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ করা হয়।

এ ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত ফটোকার্ডের নিচে অশালীন মন্তব্য করেন কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে ‘নো মোর সাইলেন্স’।

এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ, অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার দাবি করার পরিবর্তে তাঁকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর প্রতি বিদ্বেষের একটি দিক তুলে ধরে।

আরেকটি ঘটনায় গত ১৫ জানুয়ারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে বলা হয়, সাভারে একটি বাসের ভেতরে এক যাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে চালক, সহকারীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ওই খবরের নিচে ধর্ষণের পক্ষে মন্তব্য করেন কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে গ্রুপটি।

এ ধরনের মন্তব্য শুধু ভুক্তভোগীর প্রতি অসম্মানই নয়, যৌন সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধকে হালকাভাবে দেখার প্রবণতাও প্রকাশ করে। অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি ভুক্তভোগীকে অপমান করা বা যৌন সহিংসতাকে সমর্থন করে মন্তব্য করার বিষয়টিও সামাজিকভাবে উদ্বেগজনক।

প্রতিবাদ করলেই ব্যক্তিগত আক্রমণ

গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইসিবি চত্বরে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানোর সময় এক ব্যক্তিকে বাধা দেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর শারমিন রিয়া। মোটরসাইকেলচালকের বক্তব্য ছিল, যানজটের কারণে তিনি ফুটপাত দিয়ে যাচ্ছেন।

এ নিয়ে দুজনের বাদানুবাদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শারমিন রিয়াকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ ও অশালীন মন্তব্য করা হয়। এসব মন্তব্যের কয়েকটি তুলে ধরে মন্তব্যকারীদের ছবি ও ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করে ‘নো মোর সাইলেন্স’।

শারমিন রিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মানুষ যখন পর্দার আড়ালে থেকে মন্তব্য করার সুযোগ পায়, তখন অনেকেই নিজের কথার দায়বদ্ধতা ভুলে যান। তাঁর প্রতিবাদের সঙ্গে কেউ একমত না-ও হতে পারেন। কিন্তু তাই বলে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ আবার সবকিছুকে ভিউ বা প্রচারের বিষয় হিসেবে দেখেন।

শারমিন রিয়ার প্রত্যাশা, মানুষ যেন প্রতিবাদকারীকে হেয় করার পরিবর্তে যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হচ্ছে, সেদিকে নজর দেন। তা না হলে সমাজে পরিবর্তন আসবে না।

মতভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয়। কোনো বক্তব্য, প্রতিবাদ বা আচরণের সমালোচনা করাও নাগরিকের অধিকার। কিন্তু যুক্তি দিয়ে সমালোচনা করার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালিগালাজ কিংবা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা ভিন্ন বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।

পরিচয় প্রকাশের পর সতর্কবার্তা ও ক্ষমা

‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপের কার্যক্রমে কিছু ঘটনায় মন্তব্যকারীদের পরিচয় প্রকাশের পর তাঁদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করেছেন, কেউ ক্ষমা চেয়েছেন, আবার কারও কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সতর্ক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে গ্রুপটি।

এক বাবা তাঁর মেয়ের কলেজজীবন শুরুর মুহূর্তের একটি ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন। মেয়ের সঙ্গে তোলা ওই ছবিতে অনেকে অভিনন্দন জানালেও এক ব্যক্তি অশালীন মন্তব্য করেন।

‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপে মন্তব্যটি তুলে ধরে পোস্ট দেওয়ার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরে ওই ব্যক্তি তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে দেন।

গ্রুপটির দাবি, ওই ব্যক্তির বাড়ি ফেনীতে। তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাইপ্রাসের যে শহরে তিনি কাজ করেন, সেখানকার একটি রেস্তোরাঁর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর ভারতে অবস্থিত সাইপ্রাস দূতাবাস, সংশ্লিষ্ট রেস্তোরাঁ এবং ওই শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের কাছে ই-মেইলে মন্তব্যটির স্ক্রিনশট পাঠানো হয়।

আরেক ঘটনায় ফরিদপুরের এক তরুণ নিজের বোনের সঙ্গে অরুচিকর আচরণ করে ভিডিও তৈরি করতেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে গ্রুপে পোস্ট দেওয়ার পর পুলিশ ওই তরুণকে আটক করে বলে দাবি করেছে ‘নো মোর সাইলেন্স’। পরে ওই তরুণ ফেসবুকে এসে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ভিডিও তৈরি করবেন না বলে অঙ্গীকার করেন।

প্রথম আলো অনলাইনে একটি স্লিপার বাসে আগুন লাগার পর চালক ও সহকারীর পালিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সেই খবরের নিচে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রকাশ করে গ্রুপটি।

গ্রুপটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিদের একজন একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাঁর মন্তব্যের স্ক্রিনশট প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানোর পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়।

ওই ব্যক্তি প্রথম আলোকে জানান, তাঁর কর্মস্থল থেকে তাঁকে এ ধরনের মন্তব্যের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। নিজের মন্তব্যের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশও করেন।

এসব ঘটনায় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা মন্তব্য কখনো কখনো ব্যক্তির পেশাগত ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অনলাইনে কোনো কিছু লেখার আগে তার ভাষা, উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীর মন্তব্যে কলেজ কর্তৃপক্ষের সতর্কতা

কনটেন্ট ক্রিয়েটর টুম্পা মাকসুদা গত ২১ সেপ্টেম্বর একটি পোস্টে লিখেছিলেন, ‘অপ্রতিম বখাটে হলেও তাকে এভাবে মেরে ফেলাটা জাস্টিফায়েড (ন্যায়সংগত) নয়।’

কুমিল্লায় হত্যার শিকার এক কিশোরকে নিয়ে দেওয়া ওই পোস্টের পর টুম্পা মাকসুদা ও তাঁর মাকে জড়িয়ে যৌন সহিংসতামূলক মন্তব্য করেন যশোর মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী। ওই মন্তব্যের স্ক্রিনশট কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে ‘নো মোর সাইলেন্স’।

ওই শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যে বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেননি। তাঁর শব্দচয়ন খারাপ ছিল বলেও স্বীকার করেন। তিনি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং টুম্পা মাকসুদা তা গ্রহণ করেছেন বলে জানান।

ঘটনাটি নিয়ে তিনি নিজেও মর্মাহত বলে উল্লেখ করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ওই শিক্ষার্থী জানান, মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সতর্ক করে বলেছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটলে তাঁকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হবে।

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, অনলাইনে লেখা মন্তব্য শুধু ভার্চ্যুয়াল পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ভুল শব্দচয়ন বা অনুপযুক্ত মন্তব্যের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন আচরণ থেকে বিরত থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকিও রয়েছে

নারীর প্রতি অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে সামাজিক জবাবদিহি তৈরির উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও কারও পরিচয় প্রকাশের আগে যথাযথ যাচাই করা জরুরি। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অন্য কেউ মন্তব্য করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত না করে পরিচয় প্রকাশ করলে নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার হতে পারেন।

এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে কুমিল্লার কিশোরী হত্যার বিচার চেয়ে তার মায়ের বক্তব্য প্রকাশের পর।

ওই বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদে এক ব্যক্তি অশালীন মন্তব্য করেন। তিনি নিজেকে রাজধানীর সানরাইজ প্লাজার বিশ্বরঙ শোরুমের বিক্রয়কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপে তাঁর পরিচয় প্রকাশের পর বিশ্বরঙ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই।

এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও নাম, ছবি কিংবা পেশাগত পরিচয় দেখা গেলেই সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।

কোনো ব্যক্তির নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে কি না, অ্যাকাউন্টটি প্রকৃতপক্ষে কে পরিচালনা করেন এবং মন্তব্যটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সত্যিই সম্পর্ক আছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন। যাচাই ছাড়া পরিচয় প্রকাশ করলে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং একজন নির্দোষ ব্যক্তি সামাজিক, পেশাগত কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

অন্যদিকে, পরিচয় প্রকাশের মাধ্যমে কাউকে অপমান করা বা তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। অনলাইনে অপরাধমূলক বা হয়রানিমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যেন নতুন করে কারও অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে আইনে কী আছে

নারীর প্রতি অশালীন মন্তব্য, যৌন হয়রানি এবং নারীর ছবি বিকৃত করে যৌন নিপীড়নমূলক উপাদান তৈরি বা প্রচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনে বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে।

দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কোনো নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে শব্দ, অঙ্গভঙ্গি কিংবা কোনো কিছু প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁকে অপমান করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধারায় এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান কিংবা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভীতিপ্রদ উপাদান প্রকাশের বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্য বা অনলাইন আচরণ কোন আইনের আওতায় পড়বে, তা ঘটনার ধরন, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনি বিধানের ওপর নির্ভর করে। তাই ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনে আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ জানাতে এগিয়ে আসার আহ্বান

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (সিএসডব্লিউসি) প্ল্যাটফর্মের ফোকাল পারসন মনীষা বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, অরুচিকর মন্তব্য ও ছবি বিকৃত করার মতো ঘটনায় নারীরা তুলনামূলকভাবে কম আইনি প্রতিকার নেন। এতে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা আরও উৎসাহিত হতে পারেন।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি জায়গা হয়ে উঠেছে, যেখানে অপমানজনক মন্তব্য করেও অনেক সময় লাইক ও মন্তব্য পাওয়া যায়। এ কারণে অনেকে এ ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করেন। অথচ মন্তব্য করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা থাকা জরুরি।

মনীষা বিশ্বাসের মতে, কোন ধরনের অনলাইন আচরণ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এ জন্য আইনে কী শাস্তির বিধান রয়েছে, সে বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নারীদের সাইবার পরিসরে নিজেদের নিরাপদ রাখা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে সচেতন করার পাশাপাশি অন্যদেরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে শালীনতা ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিতে হবে।

একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করে সামাজিক নজরদারির কাজ যাঁরা করছেন, তাঁদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। মনীষা বিশ্বাসের মতে, কারও পরিচয় প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করা জরুরি। ওই ব্যক্তির নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অন্য কেউ মন্তব্য করছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।

নীরবতা নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল প্রতিবাদ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান ও জনমত তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এই সুযোগ ব্যবহার করে কাউকে অপমান করা, যৌন হয়রানি করা কিংবা নারী ও শিশুদের নিয়ে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনক।

‘নো মোর সাইলেন্স’ গ্রুপের কার্যক্রম অনলাইনে নারীর প্রতি অশালীন আচরণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিবাদের একটি উদাহরণ। গ্রুপটি মনে করে, অনলাইনে মন্তব্য করার পরও মানুষকে নিজের কথার দায় নিতে হবে। পর্দার আড়ালে থেকে কাউকে অপমান করে পার পাওয়া যাবে—এমন ধারণা বদলানো প্রয়োজন।

তবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তথ্যের যথার্থতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর মাধ্যমে দায়িত্বশীলভাবে প্রতিকার চাওয়া সম্ভব।

নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা হয়রানির ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে তাঁর প্রতি সহমর্মিতা দেখানো, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করার দাবি তোলা জরুরি।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রত্যেকের মনে রাখা প্রয়োজন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে অন্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার স্বাধীনতা নয়। অনলাইনে লেখা প্রতিটি মন্তব্যের পেছনে বাস্তব একজন মানুষ রয়েছেন। তাঁর সম্মান, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত জীবনের ওপর সেই মন্তব্যের প্রভাব পড়তে পারে।

তাই নারীর প্রতি অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের চর্চা। নীরবতা ভাঙার পাশাপাশি ভুল তথ্য ও অন্যায় হয়রানি এড়িয়ে চলতে পারলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আরও নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিসর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

image_print
Spread the love
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted