হরমুজের পাল্টা ক্যালিফোর্নিয়া: ট্রাম্পের দাবির জবাবে ইরানের কড়া বার্তা

ডেস্ক রিপোর্ট

বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন এলাকা’ হিসেবে দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মানচিত্র প্রকাশ করার পর এর পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান।

ইরানের একটি সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্র প্রকাশ করে ক্যালিফোর্নিয়াকে ইরানের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখিয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে।

সম্প্রতি ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ট্রুথ সোশ্যালে হরমুজ প্রণালির একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। মানচিত্রে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি নীল বৃত্ত দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। এর নিচে লেখা ছিল—‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এলাকা’।

এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত করার বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন। তাঁর এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ, হরমুজ প্রণালি কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয় এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে এটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ট্রাম্পের ওই পোস্টের পর হোয়াইট হাউসও সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পুনঃপ্রকাশ করে। ফলে বিষয়টি শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়।

ইরান অবশ্য ট্রাম্পের বক্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পের হরমুজ-সংক্রান্ত ধারণাকে ‘ভ্রান্ত’ বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের ভুল ধারণা শিগগিরই সংশোধন হবে। প্রয়োজন হলে ইরানই সেই ধারণা সংশোধন করবে—এমন ইঙ্গিতও দেন তিনি।

এরপরই ইরানের পক্ষ থেকে আসে ব্যঙ্গাত্মক পাল্টা জবাব। ইরানের সরকারি ‘ইরান ইন হায়দ্রাবাদ’ অ্যাকাউন্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মানচিত্র প্রকাশ করা হয়। ওই মানচিত্রে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যকে নীল রঙে চিহ্নিত করা হয়। এর ওপর লেখা হয়—‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের নতুন ভূখণ্ড।’

এই পোস্টের মাধ্যমে ইরান মূলত ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি নিয়ে করা দাবিকে ব্যঙ্গ করেছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের নতুন এলাকা হিসেবে দাবি করতে পারে, তাহলে ইরানও একই ধরনের যুক্তিতে ক্যালিফোর্নিয়াকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দেখাতে পারে—এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়াকে বেছে নেওয়ার পেছনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইরানি বংশোদ্ভূত মানুষের বড় একটি অংশ এই অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বড় একটি ইরানি-আমেরিকান সম্প্রদায় রয়েছে।

ইউসিএলএর সেন্টার ফর নিয়ার ইস্টার্ন স্টাডিজের ইরানিয়ান ডায়াসপোরা ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টিতে আনুমানিক ১ লাখ ৪১ হাজার ইরানি-আমেরিকান বসবাস করেন। ফলে ক্যালিফোর্নিয়া ইরানি প্রবাসীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর একটি।

১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ইরানি অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে। বিপ্লবের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা কারণে বহু ইরানি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তাদের একটি বড় অংশ ক্যালিফোর্নিয়ায় বসতি গড়ে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়েস্টউড এলাকা সময়ের সঙ্গে ইরানি প্রবাসীদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে ইরানি খাবার, ব্যবসা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। ইরানি সম্প্রদায়ের ঘনবসতির কারণে এলাকাটি অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘তেহরাঞ্জেলেস’ নামেও পরিচিত হয়ে উঠেছে।

তাই ক্যালিফোর্নিয়াকে ইরানের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখানোর পোস্টটি শুধু রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নয়, এর মধ্যে ইরানি-আমেরিকান সম্প্রদায়ের উপস্থিতির বিষয়টিও ইঙ্গিতপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি রপ্তানির একটি বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

ফলে হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে। ইরান এই জলপথের উত্তর তীরের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এই জলপথের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন দেশের অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে।

ইরান অতীতেও বিভিন্ন সময় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌযান চলাচল নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

উত্তেজনার নতুন মাত্রা

হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ। কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের পর দুই দেশের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু হলেও বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে।

যুদ্ধের অবসান এবং একটি বৃহত্তর সমঝোতার পথ তৈরি করতে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই উদ্যোগকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

তবে সমঝোতার বাস্তবায়ন নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং জলপথটির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এক নয়।

এই মতবিরোধের কারণে পরবর্তী আলোচনা থমকে যায়। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে দুই দেশের সম্পর্ক এখনও অস্থির অবস্থায় রয়েছে।

ট্রাম্পের হরমুজ-সংক্রান্ত পোস্ট সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন এলাকা’ হিসেবে দেখানোকে ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্বার্থের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।

ইরানের পাল্টা ক্যালিফোর্নিয়া দাবি অবশ্য বাস্তব কোনো ভূখণ্ড দখলের ঘোষণা নয়। বরং এটি ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে দেওয়া রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক বার্তা। তবে এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের গভীরতাই তুলে ধরছে।

জাহাজ চলাচল নিয়েও আলোচনা

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়, সে বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলছে।

ওমান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বিভিন্ন সংকটেও দেশটি অতীতে আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতেও ওমানের সঙ্গে ইরানের আলোচনা তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত নৌযান চলাচল ও জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি কোনো পক্ষ।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোও পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

সামনে কী হতে পারে

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরানের ক্যালিফোর্নিয়া-সংক্রান্ত পাল্টা পোস্ট আপাতত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার একটি নতুন দিক প্রকাশ পেয়েছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল নিয়ে নিজেদের স্বার্থের কথা বলছে। অন্যদিকে ইরান তাদের আঞ্চলিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সামনে রাখছে।

দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা থাকলেও হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে মতপার্থক্য দূর করা সহজ নয়। কারণ, এই জলপথ শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে হরমুজ নিয়ে নতুন কোনো উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব কেবল দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ‘নতুন এলাকা’ মন্তব্যের জবাবে ইরানের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়াকে দেখানো পোস্ট আপাতদৃষ্টিতে একটি ব্যঙ্গাত্মক পাল্টা জবাব হলেও এর পেছনে রয়েছে দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব।

হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ওমানের সঙ্গে ইরানের চলমান আলোচনা কোনো সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।