হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্য আহত শিক্ষার্থীদের হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বুধবার দিবাগত রাতের দিকে হবিগঞ্জ শহরের অনন্তপুর আবাসিক এলাকায় অবস্থিত মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর থেকে হোস্টেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখছে।
কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষ
হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার গভীর রাতে তাফসির ও শরীফ উদ্দিন নামের দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক ও বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাফসির ও শরীফ উদ্দিনের মধ্যে আগে থেকেই কিছু বিষয়ে বিরোধ চলছিল। বুধবার রাতে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরে বিষয়টি দুই পক্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
সংঘর্ষের সময় লোহার রড, স্টাম্পসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
আহত ১৫ শিক্ষার্থী
সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে।
আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের তাসরিফ আহমেদ, শরীফ উদ্দিন, রায়হান রাজ, রজব সানি, ফারদিন ইফতি, সামি, রিয়াদ, আব্দুল্লাহ চৌধুরী, সামিউল আল আরিফ ও হুজাফ সৌমিসহ আরও কয়েকজন।
আহতদের প্রথমে হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তিনজন শিক্ষার্থীর অবস্থা বিবেচনা করে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতালে নেওয়ার পর আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অন্যদের মধ্যে কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
হোস্টেলে উত্তেজনা
রাতের সংঘর্ষের পর মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। হোস্টেলের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
তবে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
এক পক্ষের দাবি, বিষয়টি রাজনৈতিক
আহত এক পক্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীর দাবি, ঘটনাটি শুধু সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের কারণে ঘটেনি। তাঁদের অভিযোগ, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন শিক্ষার্থী হামলা চালিয়ে ছাত্রদল-সমর্থিত শিক্ষার্থীদের আহত করেছেন।
তবে এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে হোস্টেলের অন্য শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যক্তিগত ও সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক নিয়ে কথা-কাটাকাটি থেকেই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়। পরে তা দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ ও প্রত্যক্ষ তথ্য যাচাই করে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ বের করা হবে।
আগে থেকেই বিরোধ ছিল
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে জড়ানো দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ ছিল। হোস্টেলের পরিবেশ ও সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক নিয়েও কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে অসন্তোষ ছিল বলে জানা গেছে।
তবে এসব বিরোধ কতদিন ধরে চলছিল বা এর সঙ্গে আর কোনো ঘটনা জড়িত ছিল কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
পুলিশ ও কলেজ কর্তৃপক্ষের তদন্তের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পুলিশ ঘটনাস্থলে
সংঘর্ষের খবর পেয়ে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে।
হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে।
তিনি জানান, এ ঘটনায় অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ বলছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ বের করার চেষ্টা চলছে।
কলেজ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় কলেজ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
হোস্টেলে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা, ব্যক্তিগত বিরোধ দ্রুত সমাধান করা এবং কোনো বিরোধ যাতে বড় সংঘর্ষে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলে তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে যাতে প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।
তদন্তের পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে
ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ এটিকে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব বলছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক বিরোধের কারণে হামলার অভিযোগ করছেন।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের অভিযোগই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবি
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছেন, হোস্টেলে এ ধরনের সংঘর্ষ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভবিষ্যতে যাতে কোনো শিক্ষার্থী হামলা বা সংঘর্ষের শিকার না হন, সে জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে বিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। হোস্টেলে সহিংসতার পরিবেশ তৈরি হলে পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হয়।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা
সংঘর্ষের পর হোস্টেলে যাতে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। পুলিশও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা চলছে। গুরুতর আহত তিনজনকে সিলেটে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সব মিলিয়ে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তেজনা তৈরি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাটি তদন্ত করছে। সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নাকি রাজনৈতিক বিরোধ—কোন বিষয়টি সংঘর্ষের মূল কারণ, তদন্ত শেষ হলেই তা স্পষ্ট হবে।