স্মার্টফোনে ব্যস্ত মানুষ, কমছে মুখোমুখি কথা—গবেষণায় নতুন উদ্বেগ
ডেস্ক রিপোর্ট :
স্মার্টফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নানা কাজে ফোন ব্যবহার করছেন মানুষ। যোগাযোগ, বিনোদন, কাজ, কেনাকাটা, খবর পড়া থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ—প্রায় সবকিছুতেই স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
তবে প্রযুক্তির এই ব্যাপক ব্যবহার মানুষের সামাজিক জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। এবার একটি গবেষণার ফল সেই উদ্বেগকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। গবেষকদের দাবি, গত দুই দশকে মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার পরিমাণ কমেছে। একই সময়ে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বেড়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ এখন আগের তুলনায় প্রতিদিন কম শব্দ ব্যবহার করে কথা বলছেন। ফলে মুখোমুখি যোগাযোগের সময় ও পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দুই দশকে কমেছে দৈনন্দিন কথাবার্তা
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে পরিচালিত ২২টি পৃথক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব গবেষণায় মোট প্রায় ২ হাজার ২০০ মানুষের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৫ সালে একজন মানুষ দিনে গড়ে প্রায় ১৬ হাজার শব্দ বলতেন। ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৭০০ শব্দে।
অর্থাৎ ওই সময়ের মধ্যে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ শব্দ কমে গেছে।
এই পরিবর্তনকে গবেষকেরা মানুষের যোগাযোগের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে শুধু স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণেই এই পরিবর্তন ঘটেছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। মানুষের জীবনযাপন, কর্মপরিবেশ, সামাজিক যোগাযোগের ধরন এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তারপরও গবেষণায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানুষের সরাসরি কথোপকথনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয় সামনে এসেছে।
কথার জায়গা নিচ্ছে স্ক্রিন
একসময় অবসর কাটানোর অন্যতম প্রধান উপায় ছিল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া কিংবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলা। এখন সেই সময়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে।
বাসে, ট্রেনে, রেস্তোরাঁয়, অফিসে এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসেও অনেককে ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ অনলাইনে চ্যাট করছেন, আবার কেউ গেম খেলছেন।
ফলে একই জায়গায় উপস্থিত থেকেও অনেক সময় মানুষ একে অন্যের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল যোগাযোগ নিজেও এক ধরনের যোগাযোগ। কিন্তু সামনাসামনি কথা বলা, মানুষের মুখের অভিব্যক্তি দেখা, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা বোঝা এবং একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা আলাদা।
স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার যদি এই সরাসরি যোগাযোগের জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে সামাজিক সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
পরিবারের মধ্যেও বাড়ছে দূরত্ব
স্মার্টফোনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি চোখে পড়তে পারে পরিবারে। একই ঘরে বসে পরিবারের কয়েকজন সদস্য আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকেন—এমন দৃশ্য এখন খুবই সাধারণ।
খাবারের টেবিলে বসেও অনেকে ফোন হাতে রাখেন। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী ঘটছে, সেটি দেখতেই বেশি সময় ব্যয় করেন।
শিশুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা যদি সবসময় ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সময় কমে যেতে পারে। আবার শিশুরাও দীর্ঘ সময় ফোনে ব্যস্ত থাকলে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মেলামেশার সুযোগ কমে যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার কথা বলছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্কের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি সত্যিই সামাজিকতা বাড়ায়?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নামের মধ্যেই রয়েছে ‘সামাজিক’ শব্দটি। কিন্তু অনলাইনে মানুষের যোগাযোগ বেড়ে গেলেই যে বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্কও একইভাবে শক্তিশালী হবে, তা সবসময় নয়।
অনলাইনে শত শত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্ভব। নিয়মিত বার্তা পাঠানো, ছবি দেখা, মন্তব্য করা কিংবা ভিডিও কলে কথা বলা যায়। কিন্তু এসব যোগাযোগের পাশাপাশি যদি পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়, তাহলে সামাজিক জীবনে ভারসাম্যের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অনলাইনে যোগাযোগের সুবিধা অবশ্যই রয়েছে। দূরে থাকা মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করা যায়। বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা যায়। কাজের প্রয়োজনে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ডিজিটাল যোগাযোগ বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক যোগাযোগকে প্রায় পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে।
শুধু কথাবার্তা নয়, বদলাচ্ছে জীবনযাপনও
স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার আরও কিছু পরিবর্তন জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকলে শারীরিক নড়াচড়া কমে যেতে পারে।
আগে অবসর সময়ে হাঁটাহাঁটি, খেলাধুলা কিংবা বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বেশি থাকলেও এখন অনেকের অবসর কাটে মোবাইল স্ক্রিনে।
শারীরিকভাবে কম সক্রিয় জীবনযাপন দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অতিরিক্ত বসে থাকা এবং কম শারীরিক পরিশ্রমের কারণে ওজন বাড়া, শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং জীবনযাপনজনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই শুধু ফোন ব্যবহারের সময় কমানো নয়, প্রতিদিনের জীবনে হাঁটা, ব্যায়াম ও অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডের জন্য সময় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের ওপরও পড়তে পারে প্রভাব
রাতে বিছানায় যাওয়ার পরও অনেকের হাতে থাকে স্মার্টফোন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা অনলাইনে কথা বলতে বলতে রাত অনেকটা গড়িয়ে যায়।
ফলে ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যেতে পারে। আবার ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুমের স্বাভাবিক প্রস্তুতিতেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা তাই ঘুমের আগে কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। নিয়মিত ঘুমের সময় ঠিক রাখা এবং শোবার ঘরে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস কমানো অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।
বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ঘুমের পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ভালো ঘুম প্রয়োজন।
মনোযোগ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
স্মার্টফোনে একসঙ্গে অনেক ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি ভিডিও থেকে অন্য ভিডিওতে যাওয়া, বারবার নোটিফিকেশন দেখা কিংবা বিভিন্ন অ্যাপের মধ্যে দ্রুত পরিবর্তন করার অভ্যাস মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কাজ বা পড়াশোনার সময় ফোনে বারবার নোটিফিকেশন এলে মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায়। একটি কাজ শেষ করার আগেই অন্য একটি বার্তা বা ভিডিও ব্যবহারকারীকে আকৃষ্ট করতে পারে।
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট কাজে মনোযোগ দেওয়া অনেকের কাছে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে পড়াশোনা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, প্রয়োজন না হলে ফোন দূরে রাখা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি নেওয়ার মতো অভ্যাস কাজে আসতে পারে।
একাকীত্বের অনুভূতিও বাড়তে পারে
প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ একে অপরের সঙ্গে আগের চেয়ে সহজে যোগাযোগ করতে পারলেও বাস্তব জীবনের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেলে একাকীত্বের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও কেউ কেউ বাস্তব জীবনে নিজেকে একা মনে করতে পারেন। অন্যের ছবি, সাফল্য বা আনন্দের মুহূর্ত নিয়মিত দেখার কারণে নিজের জীবন নিয়ে তুলনা করার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলেই যে একাকীত্ব বা মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হবে, এমনটা বলা যায় না। বিষয়টি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। ব্যবহার কতটা, কী উদ্দেশ্যে এবং কী ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দায়ী করার বদলে এর ব্যবহার কীভাবে করা হচ্ছে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশু ও কিশোরদের নিয়ে উদ্বেগ তুলনামূলক বেশি। কারণ ছোট বয়সে তাদের সামাজিক দক্ষতা, ভাষা ও যোগাযোগের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
শিশু যদি দীর্ঘ সময় একা স্ক্রিনের সামনে থাকে এবং পরিবার বা সমবয়সীদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় না কাটায়, তাহলে তার স্বাভাবিক সামাজিক অভিজ্ঞতার সুযোগ কমে যেতে পারে।
শিশুদের সঙ্গে বাবা-মায়ের সরাসরি কথা বলা, গল্প করা, খেলাধুলা করা এবং বাইরে সময় কাটানো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে।
অভিভাবকদের নিজেদের আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বড়রা যদি সবসময় ফোন হাতে রাখেন, তাহলে শিশুদের কাছেও একই অভ্যাস স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে।
প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন ভারসাম্য
স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযুক্তি। এটি ব্যবহার করে মানুষ দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, অনলাইনে শিক্ষা নিচ্ছে, ব্যবসা পরিচালনা করছে, জরুরি তথ্য পাচ্ছে এবং নানা ধরনের সেবা গ্রহণ করছে।
তাই স্মার্টফোনকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রয়োজন হলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সুস্থ ভারসাম্য তৈরি করা।
কাজের প্রয়োজনের বাইরে অযথা ফোন ব্যবহার কমানো যেতে পারে। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় স্ক্রিন বন্ধ রাখা এবং প্রতিদিন কিছু সময় ফোনমুক্ত রাখার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।
দিনে কিছু সময় ‘ফোনমুক্ত’ থাকা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করা যেতে পারে। এই সময়টুকু পরিবার, বন্ধু, বই পড়া, হাঁটাহাঁটি বা অন্য কোনো পছন্দের কাজে ব্যবহার করা যায়।
একসঙ্গে বসে পরিবারের সবাই ফোন ব্যবহার না করে গল্প করার অভ্যাসও ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।
বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে শুধু ফোনে ছবি তোলা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার বদলে সরাসরি কথাবার্তায় মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
ছোট ছোট এসব পরিবর্তন বাস্তব জীবনের যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
কথোপকথনের গুরুত্ব ভুলে গেলে চলবে না
মানুষ শুধু তথ্য আদান-প্রদানের জন্য কথা বলে না। কথোপকথনের মাধ্যমে মানুষ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে, অন্যের কথা শোনে, সম্পর্ক তৈরি করে এবং একে অপরকে বুঝতে শেখে।
পরিবারের সঙ্গে কয়েক মিনিটের আন্তরিক কথোপকথন অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটানোর চেয়েও বেশি অর্থবহ হতে পারে।
একজন মানুষের দিন কেমন গেল, সে কোনো সমস্যায় আছে কি না, তার কোনো আনন্দের খবর আছে কি না—এসব জানতে সরাসরি কথা বলার বিকল্প নেই।
তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সম্পর্কও ধরে রাখা জরুরি।
কীভাবে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা যায়
স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় কমাতে চাইলে কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
প্রথমত, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা যায়। এতে বারবার ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
দ্বিতীয়ত, খাবারের টেবিলে ফোন না রাখার নিয়ম করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট সময় ফোন ব্যবহার বন্ধ করা যেতে পারে।
চতুর্থত, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় শুধু কথাবার্তার জন্য রাখা যেতে পারে।
পঞ্চমত, অবসর সময়ে ফোনের পরিবর্তে হাঁটা, বই পড়া, খেলাধুলা বা শখের কাজে সময় দেওয়া যেতে পারে।
ষষ্ঠত, কাজ বা পড়াশোনার সময় ফোন প্রয়োজন না হলে দূরে রাখা যেতে পারে।
গবেষণার বার্তা কী?
গবেষণার ফলাফল মূলত মানুষের যোগাযোগের ধরনে পরিবর্তনের একটি চিত্র তুলে ধরেছে। সময়ের সঙ্গে মানুষের কথা বলার পরিমাণ কমেছে এবং একই সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
তবে এই তথ্য থেকে সরাসরি বলা যায় না যে মানুষের কম কথা বলার একমাত্র কারণ স্মার্টফোন। মানুষের জীবনযাত্রা, কাজের ধরন, সামাজিক পরিবেশ এবং যোগাযোগের নতুন মাধ্যম—সবকিছু মিলেই এই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই গবেষণার ফলকে প্রযুক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখার বদলে সতর্ক হওয়ার একটি সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
শেষ কথা
স্মার্টফোন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সুবিধার পাশাপাশি এর অতিরিক্ত ব্যবহার ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, শারীরিক সক্রিয়তা এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
মানুষের হাতে প্রযুক্তি থাকবে, তবে প্রযুক্তি যেন মানুষের সময় ও সম্পর্ককে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না করে—সেদিকেই নজর দেওয়া জরুরি।
পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা এবং পর্যাপ্ত ঘুম—এসব সাধারণ অভ্যাস মানুষের জীবনকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারে।
স্মার্টফোন তাই শত্রু নয়; বরং এর ব্যবহার কতটা প্রয়োজনীয় এবং কতটা অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে, সেটিই মূল প্রশ্ন। স্ক্রিনের দিকে তাকানোর পাশাপাশি চারপাশের মানুষের দিকেও তাকানো দরকার। কারণ প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের আন্তরিক কথোপকথনের প্রয়োজন কখনোই শেষ হবে না।
