সাহসী ফটোশুটে আলোচনায় ম্যাডোনার মেয়ে লর্দেস

নতুন গান ‘ট্র্যাম্প স্ট্যাম্প’ প্রকাশ, সংগীত ও ফ্যাশনে নিজের পরিচয় গড়ছেন পপসম্রাজ্ঞীর কন্যা

বিনোদন ডেস্ক

বিশ্বখ্যাত পপতারকা ম্যাডোনার মেয়ে হিসেবে জন্ম থেকেই পরিচিত লর্দেস লিওন। তবে মায়ের পরিচয়ের বাইরে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করতে চান তিনি। সংগীত, নাচ ও ফ্যাশন—তিন ক্ষেত্রেই নিজের প্রতিভা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এই শিল্পী। এবার নতুন গান প্রকাশ করে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি। ‘ট্র্যাম্প স্ট্যাম্প’ নামের গানটির প্রচারণায় সাহসী ফটোশুটেও অংশ নিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী লর্দেস। খোলামেলা পোশাকে তোলা তাঁর কয়েকটি ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদন অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা।

লর্দেস সংগীতজগতে ‘লোলা লিওন’ নামেও পরিচিত। গত ৪ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নতুন একক গান ‘ট্র্যাম্প স্ট্যাম্প’। গানটির প্রচারের জন্য আলোকচিত্রী এলিজাভেতা পোরোদিনার ক্যামেরায় ভিন্নধর্মী সাজে ধরা দিয়েছেন তিনি।

ফটোশুটের কয়েকটি ছবিতে কালো স্বচ্ছ লেসের পোশাক ও উঁচু প্ল্যাটফর্ম হিল পরতে দেখা গেছে তাঁকে। অন্য কয়েকটি ছবিতে আরও খোলামেলা পোশাকে ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছেন এই শিল্পী। তাঁর পোশাক, শারীরিক অভিব্যক্তি ও ছবির উপস্থাপনায় ফুটে উঠেছে নিজস্ব ফ্যাশন ভাবনা।

তবে নতুন গানটির প্রচারে শুধু সাহসী ফটোশুটই নয়, এর পেছনে রয়েছে বিশেষ বক্তব্যও। নারী ও নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপন করা মানুষদের নিয়ে সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার বিরুদ্ধে কথা বলেছে গানটি।

গানেই তুলে ধরেছেন নারীর স্বাধীনতার কথা

লর্দেসের ভাষায়, ‘ট্র্যাম্প স্ট্যাম্প’ এমন একটি গান, যেখানে নারী এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে চাওয়া মানুষদের ঘিরে তৈরি সামাজিক নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

গানটিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা মানসিক ক্ষত, জাদুবিদ্যা এবং নারীত্বের নানা দিকও উঠে এসেছে। নিজের পারিবারিক ইতিহাসে যাঁরা নানা কষ্ট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁদের স্মরণ করার পাশাপাশি সম্মান জানানোর ইচ্ছা থেকেও গানটি তৈরি করেছেন তিনি।

গানটি লিখেছেন লর্দেস ও সংগীত প্রযোজক অস্কার শেলার। প্রযোজনার দায়িত্বেও ছিলেন শেলার। পিংকপ্যান্থারেস, লিলি অ্যালেন ও কেলেলার মতো শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। গানটি প্রকাশিত হয়েছে আটলান্টিক রেকর্ডস থেকে।

স্বাধীনভাবে সংগীতচর্চা শুরু করা লর্দেসের জন্য এই গান প্রকাশ ক্যারিয়ারের নতুন একটি ধাপ। নিজের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও শিল্পীসত্তাকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে এর মাধ্যমে।

নাম বদলে নতুন সংগীতযাত্রা

লর্দেসের সংগীতজীবনের শুরু ২০২২ সালে। তখন ‘লোলাহল’ নামে প্রকাশ করেন নিজের প্রথম একক গান ‘লক অ্যান্ড কি’। গানটি প্রকাশিত হয়েছিল শিল্পী আর্থ-আটারের স্বাধীন সংগীত প্রতিষ্ঠান ক্যামিক্যাল এক থেকে।

গানটির ভিডিও পরিচালনা করেছিলেন আর্থ-আটার। আর এর কোরিওগ্রাফি তৈরি করেছিলেন লর্দেস নিজেই। একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ইপি ‘গো’।

সংগীতের পাশাপাশি শুরু থেকেই নাচ ও মডেলিংয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। ২০২৪ সালে জিকিউ সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের সংগীতচর্চার নানা অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন লর্দেস। নিউ অরলিন্সে কয়েক দিনের একটি শিল্পী আবাসন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে স্থানীয় জ্যাজ সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে গান পরিবেশনও করেছিলেন তিনি।

২০২৬ সালে নিজের নামের পরিচয়েই সংগীত প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন লর্দেস। সে বছরের মে মাসে প্রকাশ করেন ‘টি-শার্ট’ নামের একটি গান। ডব্লিউ সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, গানটি মূলত একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কের অভিজ্ঞতা এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার গল্প নিয়ে তৈরি।

গানটির ভিডিওতে পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরও রেখেছিলেন তিনি। লর্দেসের কাছে বন্ধুত্ব ও পারিবারিক সম্পর্ক মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় শক্তি। জীবনের কঠিন সময়ে কাছের মানুষদের সহযোগিতা তাঁকে নতুন করে পথ চলার সাহস দিয়েছে।

তিনি জানান, জীবনের নানা প্রতিকূলতায় বন্ধুদের পাশে পাওয়া তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নিজের শিকড়, পরিবার ও কাছের মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করাও এখন তাঁর সংগীতচর্চার অন্যতম অনুপ্রেরণা।

ফ্যাশনজগতেও নিজের অবস্থান

সংগীতের পাশাপাশি ফ্যাশনজগতেও ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠেছেন লর্দেস। আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি নামকরা ফ্যাশন ব্র্যান্ডের প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে মিউ মিউ, ইভ সাঁ লরাঁ, মার্ক জ্যাকবস, বারবেরি, ক্যালভিন ক্লেইন ও মুগলার।

শুধু বিজ্ঞাপন বা ফটোশুট নয়, ফ্যাশন শোতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। ভার্সাচে ও বটেগা ভেনেতার মতো প্রতিষ্ঠিত ফ্যাশন হাউসের হয়ে র‍্যাম্পে হেঁটেছেন। নিজের পোশাক নির্বাচন ও ফ্যাশন ভাবনার মাধ্যমেও আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন।

নাচের প্রশিক্ষণও তাঁর শিল্পীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিউইয়র্কের লা গার্ডিয়া হাইস্কুলে পড়াশোনা শেষ করার পর ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান ও পারচেজ কলেজে পড়েছেন। নাচের প্রতি আগ্রহ থেকেই মঞ্চ পরিবেশনা ও কোরিওগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত হন।

নিজের গানের ভিডিও নির্মাণ ও পরিবেশনায়ও নাচের এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগান তিনি। ফলে সংগীত, ফ্যাশন ও নাচ—তিনটি মাধ্যমকে একসঙ্গে ব্যবহার করে নিজের শিল্পীসত্তা প্রকাশের চেষ্টা করছেন লর্দেস।

মায়ের সঙ্গে দূরত্ব কমল যেভাবে

লর্দেসের ব্যক্তিগত জীবন ও ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনায় বারবার উঠে আসে তাঁর মা ম্যাডোনার প্রসঙ্গ। বিশ্বখ্যাত এই পপতারকার মেয়ে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই সংবাদমাধ্যমের নজরে ছিলেন তিনি। তবে মায়ের পরিচয়ের বাইরে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছেন সব সময়।

২০২১ সালে ইন্টারভিউ সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাকে ‘কন্ট্রোল ফ্রিক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন লর্দেস। তিনি জানিয়েছিলেন, উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর যত দ্রুত সম্ভব মায়ের কাছ থেকে আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন।

এমনকি কলেজের বেতন ও নিজের প্রথম অ্যাপার্টমেন্টের খরচও নিজেই বহন করেছিলেন। তাঁর মতে, মা-বাবা সন্তানের সব খরচ বহন করলে অনেক সময় তা সন্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে বিখ্যাত পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠার কারণে যে নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন, তা অস্বীকার করেননি লর্দেস। তাঁর মতে, পরিচিত ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে কিছু সুবিধা পাওয়া যেমন সত্য, তেমনি নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়াও বাস্তবতা।

ম্যাডোনাও বিভিন্ন সময়ে মেয়ের স্বাধীনভাবে নিজের পথ বেছে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। চলতি বছরের জুনে গ্রাহাম নর্টনের অনুষ্ঠানে তিনি জানান, লর্দেস দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন না। কারণ, মায়ের পরিচয়ের কারণে সংগীতজগতে বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন—এমন ধারণা তৈরি হোক, তা চাননি মেয়ে।

তবে সময়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। মা-মেয়ের সম্পর্কের এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ‘দ্য টেস্ট’ গানটি।

প্রথমবার একসঙ্গে গান ম্যাডোনা ও লর্দেসের

ম্যাডোনার ‘কনফেশনস টু’ অ্যালবামে থাকা ‘দ্য টেস্ট’ গানটিতে প্রথমবারের মতো মা ও মেয়ে একসঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন। গানটি লিখেছেন ম্যাডোনা, লর্দেস এবং অ্যালবামের প্রযোজক স্টুয়ার্ট প্রাইস।

গানটিতে ম্যাডোনা মেয়ের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি অতীতে কিছু বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি ও নিজের আচরণ নিয়ে অনুশোচনার কথাও প্রকাশ করেছেন।

মেয়েকে সব সময় আদর্শ অবস্থানে দেখতে চাওয়ার কারণে তাঁর ওপর যে বাড়তি প্রত্যাশা ও চাপ তৈরি হয়েছিল, সেটি আগে পুরোপুরি বুঝতে পারেননি বলে আক্ষেপ করেছেন ম্যাডোনা।

অন্যদিকে লর্দেস তুলে ধরেছেন বিশ্বখ্যাত একজন মায়ের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা। নিজের চেহারা, পোশাক, পছন্দ এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের ওপর মায়ের তারকাখ্যাতির প্রভাব কীভাবে পড়েছে, তা উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।

গ্রাহাম নর্টনের অনুষ্ঠানে ম্যাডোনা জানান, একদিন লর্দেস নিজেই তাঁর কাছে এসে একসঙ্গে গান লেখার প্রস্তাব দেন। মেয়ের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অভিমান ও অভিজ্ঞতাগুলো প্রকাশের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

মা ও মেয়ে দুজনেই সিদ্ধান্ত নেন, গানে প্রত্যেকে নিজের মনের কথা স্বাধীনভাবে তুলে ধরবেন। কারও বক্তব্যে অন্যজন হস্তক্ষেপ করবেন না। ম্যাডোনার ভাষায়, এই অভিজ্ঞতা তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাময়কারী ভূমিকা রেখেছে।

মায়ের পরিচয়ের বাইরে নিজের পথচলা

১৯৯৬ সালে ম্যাডোনা ও তাঁর তৎকালীন সঙ্গী কার্লোস লিওনের ঘরে জন্ম লর্দেসের। জন্মের পর থেকেই বিশ্বখ্যাত মায়ের কারণে তাঁকে ঘিরে ছিল সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ। কিন্তু সেই পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে সহজ পথে এগোনোর পরিবর্তে নিজের মতো করে চলার চেষ্টা করেছেন তিনি।

২০২২ সালে প্রথম গান প্রকাশের সময় সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার বিষয়ে খুব বেশি নিশ্চিত ছিলেন না লর্দেস। একসময় তিনি বলেছিলেন, সংগীত তাঁর কাছে খুব পরিচিত একটি জগৎ। কারণ, তাঁর মা এই জগতেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী।

তাই সংগীতজগতে নিজের পরিচয় তৈরি করার আগে অন্যদের তৈরি করে দেওয়া পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকতে চাননি তিনি।

এখন সংগীত, ফ্যাশন ও নাচ—তিন ক্ষেত্রেই নিজের অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা কাজে লাগাচ্ছেন লর্দেস। নতুন গান ‘ট্র্যাম্প স্ট্যাম্প’ এবং সাহসী ফটোশুটের মাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি।

ম্যাডোনার কন্যা হিসেবে পরিচিতি থাকলেও লর্দেসের লক্ষ্য এখন নিজের কাজের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় তৈরি করা। মায়ের খ্যাতির বাইরে গিয়ে নিজের শিল্পীসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করার এই চেষ্টাই তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।