সরকারের ছয় মাস: অর্থনীতিতে স্বস্তির চেয়ে চাপই বেশি

প্রবাসী আয় ও মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও বিনিয়োগ, ব্যাংক, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতে বড় চ্যালেঞ্জ

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস হতে চলেছে। এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক বলা যাচ্ছে না। প্রবাসী আয় ভালো আছে, মূল্যস্ফীতি আগের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা কমেছে এবং সরকার সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষকদের সহায়তায় নতুন কিছু কর্মসূচি নিয়েছে।

তবে এসব ইতিবাচক দিকের বিপরীতে অর্থনীতিতে বেশ কিছু বড় সমস্যা রয়ে গেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, ব্যাংক খাতের সংকট গভীর, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বড় এবং জ্বালানি সরবরাহ এখনো অনিশ্চিত। একই সঙ্গে সরকারের ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।

তাই সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—অর্থনীতির সমস্যাগুলো কতটা দ্রুত ও সঠিকভাবে চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

শুধু কিছু সূচকের উন্নতি দিয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করলে চলবে না। মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়—এসব ক্ষেত্রেও উন্নতি আনতে হবে।

মূল্যস্ফীতি এখনো বড় সমস্যা

অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখনো মূল্যস্ফীতি। জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। তবে তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এসেছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না।

মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। অর্থাৎ বাজারে পণ্যের দাম এখনো বাড়ছে, শুধু আগের চেয়ে ধীরগতিতে।

দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। একই আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে না। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের সঞ্চয়ও কমছে।

এ কারণে মূল্যস্ফীতি আরও কমানো সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া দরকার।

তবে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ঋণের খরচ বাড়ে। ব্যবসা ও শিল্পে নতুন বিনিয়োগ কমতে পারে। কর্মসংস্থান তৈরির গতিও ধীর হতে পারে।

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে শুধু মানুষের চাহিদা নয়, খাদ্য সরবরাহ, আমদানি খরচ, ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানির দাম এবং বাজার ব্যবস্থাপনাও জড়িত। তাই মূল্যস্ফীতি কমাতে এসব জায়গাতেও একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

প্রবাসী আয় স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু ঝুঁকিও আছে

অর্থনীতির জন্য বর্তমানে একটি বড় স্বস্তির জায়গা হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা স্থিতি আনছে এবং দেশের বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কমাতে সহায়তা করছে।

তবে দীর্ঘ মেয়াদে শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।

রপ্তানি আয় দুর্বল হলে এবং আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হবে। তখন রেমিট্যান্স ভালো থাকলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন সেবা খাতে রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে।

কারণ শক্তিশালী রেমিট্যান্স স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু উৎপাদন বাড়ানো, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের বিকল্প হতে পারে না।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বেসরকারি বিনিয়োগে

অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা।

দেশে বিনিয়োগ সম্মেলন হয়েছে, অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হয়েছে, কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়মিত পাওয়া যাবে কি না, ব্যাংকঋণের সুদ কত, প্রয়োজনের সময় বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যাবে কি না, কর ও শুল্কের নিয়ম কতটা স্থির, ব্যবসা শুরু করতে কত সময় লাগবে এবং সরকারি অনুমোদন পেতে কতটা জটিলতা হবে।

এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন করে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।

দেশীয় উদ্যোক্তারাই যখন নতুন বিনিয়োগে সতর্ক থাকেন, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার প্রচারও খুব বেশি কাজে আসবে না।

তাই বিনিয়োগের মূল সমস্যা আসলে আস্থার সমস্যা। আর এই আস্থা তৈরি হয় নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত সেবা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের আচরণ থেকে।

জ্বালানি সংকট বাড়াচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ

জ্বালানি খাতের সমস্যাও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে আছে। গ্যাসের ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহে সমস্যা এবং সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনা দেখিয়েছে, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এখনো পর্যাপ্ত স্থিতিশীলতা নেই।

জ্বালানি সরবরাহে সামান্য সমস্যা হলেই তার প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন ও বাজারদরের ওপর।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বা সরবরাহে বড় পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর দ্রুত চাপ পড়ে। সরকার জরুরি আমদানি, ঋণ বা ভর্তুকি দিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। কিন্তু এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।

দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি আমদানির উৎস বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে দক্ষতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে দ্রুত এগোতে হবে।

বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।

জ্বালানির দামে দরকার স্থির নীতি

জ্বালানির দাম নিয়েও সরকারের একটি পরিষ্কার ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি থাকা দরকার।

দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে কম দাম ধরে রাখা সরকারের জন্য আর্থিকভাবে ব্যয়বহুল। আবার জ্বালানি সরবরাহ ঠিক না করে বারবার দাম বাড়ানো হলে শিল্প ও সাধারণ মানুষ—দুই পক্ষের ওপরই চাপ বাড়ে।

তাই জ্বালানির দাম পরিবর্তন করতে হলে তা ধাপে ধাপে এবং আগেই জানিয়ে করা উচিত। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতিও নিশ্চিত করতে হবে।

শিল্প উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি দামও অনেক সময় মেনে নিতে পারেন, যদি তাঁরা নিশ্চিত থাকেন যে প্রয়োজনের সময় গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

কিন্তু দামও অনিশ্চিত, সরবরাহও অনিশ্চিত—এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি

সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আদায়। প্রতিবছরই বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য অর্জিত হয় না।

নতুন বাজেটেও রাজস্ব আদায়ে বড় প্রবৃদ্ধির আশা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসন ডিজিটাল করা এবং বিভিন্ন করছাড় কমাতে সময় লাগবে।

অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার ওপর ভিত্তি করে সরকারের ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হলে পরে সমস্যা তৈরি হয়। রাজস্ব কম উঠলে সরকারকে ঋণ নিতে হয় অথবা উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হয়।

তাই শুধু বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঘোষণা করলেই হবে না। কর ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার করতে হবে।

কর দেওয়ার আওতা বাড়াতে হবে। তবে শুধু সহজে শনাক্ত করা ছোট ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ দেওয়া ঠিক হবে না।

বড় ধরনের কর ফাঁকি, অঘোষিত সম্পদ, উচ্চ আয়ের পেশাজীবী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একইভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

ব্যাংক খাতে কঠোর সংস্কার জরুরি

অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি হলো ব্যাংক খাত।

দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঋণ সুবিধা এবং বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে ব্যাংক খাতের সমস্যা গভীর হয়েছে।

কিছু ব্যাংককে পুনর্গঠন বা নতুন করে মূলধন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু জনগণের অর্থ দিয়ে ব্যাংককে সহায়তা করার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রথমে ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদের মান যাচাই করতে হবে। কারা ব্যাংককে দুর্বল করেছে, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের বাস্তব পরিকল্পনা থাকতে হবে।

ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

তা না হলে ব্যাংক সংস্কারের নামে পুরোনো ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ওপর পড়বে।

সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ

এই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি চালু করছে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এসব উদ্যোগ দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ রয়েছে। নারীর ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থাও ইতিবাচক ফল দিতে পারে।

তবে বড় পরিসরে চালু করার আগে কর্মসূচির পরীক্ষামূলক ফলাফল যাচাই করা জরুরি।

কারা প্রকৃত দরিদ্র, কারা সুবিধা থেকে বাদ পড়ছেন, একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা পাচ্ছেন কি না এবং অভিযোগ করলে তার সমাধান কীভাবে হবে—এসব বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।

তা না হলে সামাজিক সুরক্ষার অর্থ অপচয় হতে পারে। রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

কৃষক কার্ডেও দরকার বাস্তব সেবা

কৃষক কার্ডের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা আছে। একটি কার্ডের মাধ্যমে কৃষক যদি সার, বীজ, কৃষিঋণ, বিমা, কৃষিযন্ত্র, আবহাওয়ার তথ্য ও বাজারদর সম্পর্কে সহজে সেবা পান, তাহলে তাঁর সময় ও খরচ দুটোই কমতে পারে।

কিন্তু শুধু কার্ড তৈরি করলেই কৃষকের সমস্যা সমাধান হবে না।

সময়মতো সার না পাওয়া, কৃষিঋণ প্রকৃত কৃষকের কাছে না পৌঁছানো কিংবা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ার সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

আরেকটি ঝুঁকি হলো জমির মালিকানার তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। এতে বর্গাচাষি বা ভূমিহীন প্রকৃত কৃষকেরা বাদ পড়তে পারেন।

তাই প্রযুক্তির চেয়ে কৃষকের কাছে বাস্তব সেবা পৌঁছানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে আরও কিছু ঝুঁকি

সামনের দিনগুলোতে অর্থনীতির ওপর বেশ কিছু বাড়তি চাপ আসতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি দুটোই বাড়বে।

রপ্তানি দুর্বল থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আবার ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হলে সরকারের বাজেটেও তার প্রভাব পড়বে।

অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় কঠোর মুদ্রানীতি চালু থাকলে বিনিয়োগ আরও কিছুদিন দুর্বল থাকতে পারে।

এর সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের ঝুঁকিও রয়েছে।

এখন কী করা দরকার

স্বল্প মেয়াদে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি আরও কমানো। তবে এমনভাবে নয়, যাতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

খাদ্য, জ্বালানি ও সারের মজুত এবং সরবরাহের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে বাজারে অনিশ্চয়তা কমবে।

সবার জন্য বড় ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার বদলে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারকে লক্ষ্য করে সহায়তা দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার ঠিক করা দরকার। হাসপাতাল, সেচ, সার কারখানা, খাদ্য সংরক্ষণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

মধ্য মেয়াদে দেশের গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। এলএনজি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে। শিল্পে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।

করছাড়ের প্রকৃত সুবিধা ও খরচও প্রকাশ করা দরকার। যেসব করছাড় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য সুফল দিচ্ছে না, সেগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করা যেতে পারে।

ব্যাংক সংস্কারকে শুধু একটি আর্থিক খাতের সংস্কার হিসেবে দেখলে হবে না। বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবেই ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হবে।

কর্মসংস্থানকে কেন্দ্রে আনতে হবে

সবশেষে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে কর্মসংস্থানকে।

স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দেশের বিপুল শ্রমশক্তির জন্য শুধু এসব খাত যথেষ্ট নয়।

শ্রমঘন শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও লজিস্টিকস, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং উৎপাদন খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।

দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচিগুলোও বাস্তব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; প্রশিক্ষণের পর মানুষ যেন বাস্তবে চাকরি বা আয় করার সুযোগ পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতির সাফল্য শুধু মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। মানুষের প্রকৃত আয় কতটা বাড়ল, নতুন কত কর্মসংস্থান হলো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে এল—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে কঠিন সমীকরণ

সরকারের ছয় মাসের সময়ে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও বড় সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। প্রবাসী আয় ভালো থাকায় বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। মূল্যস্ফীতিও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

কিন্তু বিনিয়োগ দুর্বল, ব্যাংক খাত ঝুঁকিতে, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর সঙ্গে সরকারি ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।

তাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে অগ্রাধিকার ঠিক করা।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাস্তবসম্মত রাজস্বনীতি, ব্যাংক খাতে জবাবদিহি, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান—এই কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

সরকার কতগুলো নতুন কর্মসূচি নিল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেগুলোর বাস্তব ফল কী হলো।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। তাই সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধানের চেষ্টা না করে জরুরি বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে এগোনোই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

আগামী ছয় মাসে সরকার এই কঠিন সমীকরণ কতটা দক্ষতার সঙ্গে মেলাতে পারে, তার ওপরই অর্থনীতিতে মানুষের আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করবে।