সরকারে গিয়ে কি বিএনপির দলীয় রাজনীতি আড়ালে পড়ছে?
ডেস্ক রিপোর্ট :
দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে যুক্ত। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এমপি-মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিএনপি কি সরকার পরিচালনায় সহযোগিতা করতে গিয়ে ধীরে ধীরে সরকারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে? নাকি দল ও সরকারের মধ্যে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রেখেই এগোতে পারবে?
দলের নেতারা অবশ্য বলছেন, বিএনপি সরকারে আছে, কিন্তু দল সরকারে ঢুকে যায়নি। সরকারের কাজে সহযোগিতা করা আর দলকে সরকারের অংশ বানানো এক বিষয় নয়। তবে সরকার গঠনের পর দলীয় ও অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে—এ কথাও দলের নেতাদের কেউ কেউ স্বীকার করছেন।
এমপির সমর্থন পেতে তৎপর তৃণমূলের নেতারা
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আমানউল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাহরুল আলম এর একটি উদাহরণ। ব্যবসা, চিকিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় এলেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করেন তিনি।
গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির সমর্থনে জয়ী হওয়া বাহরুল আলম এবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী। তাই নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টিও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তিনি সম্প্রতি বলেন, নির্বাচনে অংশ নিতে হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য নোয়াখালী-৩ আসনের মো. বরকতউল্লা বুলুর সমর্থন প্রয়োজন। এ কারণেই এমপি এলাকায় গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং তিনি ঢাকায় এলে এমপির বাসায় যান।
শুধু বাহরুল আলম নন, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিএনপি নেতাদের অনেকের তৎপরতাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তৃণমূলের নেতাদের কেউ ঢাকায় এসে এমপি-মন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করছেন। কেউ নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরছেন। আবার কেউ আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এর পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ, সরকারি বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিংবা মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে বলে দলীয় ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ফলে দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি অংশ সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি দলের সাংগঠনিক চরিত্র ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সরকার ও দল—দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে
তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিএনপির সামনে মূলত দুটি বড় দায়িত্ব তৈরি হয়। একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখা।
সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি দায়িত্বে থাকা নেতাদের সময়ের বড় অংশ রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যয় হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে দলীয় রাজনীতিতেও।
দলের নেতারাই স্বীকার করছেন, সরকার গঠনের পর বিএনপির নিয়মিত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি আগের তুলনায় কমেছে। দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে মাঠপর্যায়ে দলীয় তৎপরতা খুব বেশি চোখে পড়েনি।
এদিকে বিরোধী দলগুলো সংসদের ভেতরে ও বাইরে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ফলে ক্ষমতাসীন বিএনপির দলীয় রাজনীতি কতটা সক্রিয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
তবে এর পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে।
বিএনপির মাঠপর্যায়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা এখন সংসদ সদস্য। অনেকে মন্ত্রিসভায় রয়েছেন। জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বেও দলের নেতাদের অনেকে আছেন।
এ ছাড়া ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের কেউ কেউ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় দায়িত্ব পেয়েছেন।
ফলে দলের বড় একটি অংশ এখন সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। আর যাঁরা কোনো সরকারি পদ পাননি, তাঁদের অনেকের দৃষ্টি এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও দলের সম্ভাব্য মনোনয়নের দিকে।
স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতা
চলতি বছরের মধ্যেই সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কথা জানিয়েছে সরকার। এ কারণে তৃণমূল বিএনপিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা শুরু হয়েছে।
তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে এখন শুধু নির্বাচনে অংশ নেওয়াই বড় বিষয় নয়। দলের সমর্থন কে পাবেন, সেটিও বড় প্রশ্ন।
এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতা এমপি ও মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। কারণ স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁদের সমর্থন নির্বাচনী মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন প্রার্থীরা।
এতে এমপি-মন্ত্রীদের কাছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
দলের জন্য এখানেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কারণ তৃণমূলের নেতারা যদি রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তে শুধু পদ, নির্বাচনী সমর্থন বা সরকারি সুযোগ-সুবিধার দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন, তাহলে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক রাজনীতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
‘সরকারের কাজে সহযোগিতা মানেই সরকারে মিশে যাওয়া নয়’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, সরকার পরিচালনায় দলের সহযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। তবে এর অর্থ দল সরকারের সঙ্গে মিশে যাওয়া নয়।
তিনি বলেন, দল সরকারে গেলে সরকারের কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে দল সরকারে ঢুকে গেছে।
তবে সরকার গঠনের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে দ্রুত পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি—এ বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এখন অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠন এবং দলের জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ (প্রিন্স) অবশ্য সরকারে দল মিশে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
তাঁর বক্তব্য, যাঁরা দলের নেতা, তাঁদের অনেকেই এখন এমপি-মন্ত্রী। অনেকে স্থানীয় সরকারে প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করছেন। ফলে সরকারি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছে।
তবে তিনি মনে করেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক। সরকারের কাজে দলের সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও দলকে সরকারের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না—এমন নির্দেশনা দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ছয় মাসে সরকারের অগ্রাধিকার
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাস ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো সচল করা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের প্রস্তুতির সময়।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে থাকা পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানীসহ কয়েকটি কর্মসূচি এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
এপ্রিল মাসে কৃষক কার্ডের প্রাক্-পাইলট কর্মসূচি শুরু করা হয়। প্রাথমিকভাবে ২২ হাজারের বেশি কৃষকের কাছে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পৌঁছে দেওয়ার কথা জানানো হয়।
জুন মাসে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচিও উদ্বোধন করা হয়েছে।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনকে স্বাভাবিক করা, অর্থনীতি সামলানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু করাই ছিল সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।
এ কারণে প্রথম দিকে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি তৈরি হওয়াকে তারা স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন।
রাজনীতি ও মতপ্রকাশের পরিবেশ
সরকারের প্রথম ছয় মাসের একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে রাজনৈতিক পরিসর তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
আগের সরকারের সময়ে বিরোধী দল ও ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ ছিল। গুম, খুন, হামলা ও মামলার মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতিকে চাপে রাখার অভিযোগও ছিল।
বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধী দলগুলো সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের সুযোগও রয়েছে।
গণমাধ্যমও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। নাগরিক সমাজও বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরছে।
এ কারণে রাজনৈতিক পরিবেশ, গণমাধ্যম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বস্তির একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে সরকারের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই উন্মুক্ত পরিবেশকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা হবে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা স্বাধীন ও কার্যকর করা যাবে।
সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন
গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হয়ে উঠেছিল।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
বিএনপিও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল। কিন্তু সরকারে যাওয়ার পর কোন সংস্কার আগে হবে, কোনটি পরে হবে এবং কোন সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন—এসব বিষয়ে বিএনপির অবস্থান নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সামনে এখন শুধু সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্ন নয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের মধ্যে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সরকার সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের বৈধতা পেয়েছে। একই সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের রাজনৈতিক দায়িত্বও দলটির ওপর রয়েছে।
সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক শক্তির ঘাটতি নেই। তাই এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্কার সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কতটা জায়গা দখল করছে।
সরকারি নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক
সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ নিয়েও আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্ব, কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়োগ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। কেউ কেউ এসব নিয়োগকে দলীয় নেতাদের পুনর্বাসন হিসেবে দেখছেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা যোগ্য এবং তাঁদের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ বিষয়ে বলেছেন, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা অযোগ্য নন; তাঁদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি হতে পারে, একটি রাজনৈতিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আস্থাভাজন ও যোগ্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন দায়িত্বে রাখতে পারে। তবে বিএনপির ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা বেশি আলোচনায় আসছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে দলটি আগের সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ করে এসেছে।
ফলে বিএনপি সরকারের নিয়োগগুলোও এখন সেই অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষ বিচার করছে।
বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকায় এসব নিয়োগ নিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি ও জনজীবনের চাপ
সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা।
মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ রয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি এবং বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাট শিল্পকারখানার উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও প্রভাব রয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব দেশের ওপরও পড়ছে।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে এসব কারণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজারদর, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়।
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি বড় অংশই ছিল মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই বাজারের চাপ ও জ্বালানি সংকট সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সংগঠনকে আবার সক্রিয় করার চেষ্টা
সরকার গঠনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিলেও এখন দলকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা শুরু হয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের পর দলের সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সরকারে দায়িত্ব বণ্টনেও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এরই মধ্যে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রুহুল কবির রিজভীসহ চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে তাঁদের কারও কারও বিষয়ে নেতা-কর্মীদের একাংশের অসন্তোষ রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
সরকার গঠনের পর বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আনুষ্ঠানিক বৈঠক এখনো হয়নি। এ সময়ে স্থায়ী কমিটির কয়েকটি সভা হয়েছে।
সর্বশেষ সভায় রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়।
অঙ্গসংগঠন পুনর্গঠনের প্রস্তুতি
ছয় মাস পূর্তির সময় এসে বিএনপির মধ্যে দলকে নতুন করে সক্রিয় করার তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রস্তুতি চলছে।
৪ জুলাই থেকে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন।
ঢাকা জেলা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে তৃণমূলে দলকে আরও শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দলের নেতারা মনে করছেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছিল। শীর্ষ নেতৃত্বও বিষয়টি উপলব্ধি করেছে। তাই মাঠপর্যায়ে দলকে আবার সক্রিয় করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাঠের রাজনীতিতে ফিরতে হবে
বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম বলেছেন, বিএনপি মাঠে নেই—এমনটি বলা ঠিক হবে না। প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন সফরে নেতা-কর্মীরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন।
তবে তিনি জানান, খুব শিগগিরই বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও জোরদার হবে। অঙ্গসংগঠনসহ মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকার ও দল—এই দুইয়ের ভূমিকা পরিষ্কারভাবে আলাদা রাখা।
সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই নিতে হবে। আবার দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাবও সরকারের ওপর পড়বে।
এ অবস্থায় দল যদি শুধু সরকারি পদ-পদবি, এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নির্বাচনী সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে দীর্ঘদিনের মাঠের সংগঠন দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে দল যদি সরকার পরিচালনার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে সরকার ও দলের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বিএনপির সামনে মূল পরীক্ষা
বিএনপি এখন এমন একটি সময় পার করছে, যখন দলটির সামনে একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কয়েকটি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক ও মতপ্রকাশের পরিবেশও তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত রয়েছে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করছে।
তবে এর পাশাপাশি সংস্কার বাস্তবায়ন, সরকারি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এবং দলীয় সাংগঠনিক দুর্বলতা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই শুধু সরকার কতটা সফল হচ্ছে, তা নয়। দলটি সরকারে থেকেও কতটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সক্রিয় থাকতে পারছে—সেটিও এখন বড় বিষয়।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দল সরকারে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নানা সুযোগ ও দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হবে। কিন্তু সেই কারণে দলীয় রাজনীতি যদি সরকারের কর্মকাণ্ডের আড়ালে চলে যায়, তাহলে তৃণমূলের সঙ্গে দলের দূরত্ব বাড়তে পারে।
আবার সরকার ও দলের মধ্যে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রেখে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে পারলে বিএনপি একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক সংগঠন—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
তাই এখন বিএনপির সামনে মূল পরীক্ষা হলো—ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কীভাবে মাঠের নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ এবং দলীয় সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ধরে রাখা যায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এ কারণেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—বিএনপি কি সরকার পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবেও সক্রিয় থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে সরকারের ছায়ায় দলীয় রাজনীতি আড়ালে পড়ে যাবে?