সবার জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের

‘স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার’ — স্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর

অনলাইন প্রতিবেদক :

দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তাই মানুষের আয়, বসবাসের স্থান কিংবা সামাজিক অবস্থান—কোনো কিছুর ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য থাকা উচিত নয়।

স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যেতে উদ্ভাবন, রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা জোরদারের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর একটি সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. জুবাইদা রহমান এসব কথা বলেন।

‘Health Innovation for All: Expanding Access to Affordable and Quality Healthcare’ শীর্ষক সেমিনারে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বর্তমান সক্ষমতা, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার, চিকিৎসাসেবার সমতা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেন।

স্বাস্থ্যসেবা সবার অধিকার

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও যেন প্রয়োজনের সময় সহজে চিকিৎসা পান, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আয়, অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য থাকা উচিত নয়।’

তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ কেবল বড় শহর বা উন্নত হাসপাতালকেন্দ্রিক হলে দেশের সব মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হবে না। এজন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে বিশেষায়িত চিকিৎসা পর্যন্ত একটি কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

একজন রোগীর চিকিৎসা যেন বাড়ির কাছাকাছি জায়গা থেকেই শুরু হয় এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া যায়—এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

শুধু চিকিৎসা নয়, রোগ প্রতিরোধেও জোর

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রোগ প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, সচেতনতা বাড়ানো, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে অনেক জটিল রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

‘প্রতিরোধই চিকিৎসার চেয়ে উত্তম’—এই নীতিকে সামনে রেখে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সাজানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

তাঁর মতে, একজন মানুষ গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আগেই যদি তার রোগ শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা দেওয়া যায়, তাহলে রোগীর কষ্ট যেমন কমবে, তেমনি চিকিৎসার ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।

প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় উল্লেখ করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, মানুষের বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এখন বড় প্রয়োজন।

বিশেষ করে গ্রাম ও দূরবর্তী এলাকার মানুষ যেন জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা, পরামর্শ এবং রোগ শনাক্তকরণের সুযোগ বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে জটিল রোগীদের দ্রুত জেলা বা বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর জন্য কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

হৃদরোগ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসে নজর

হৃদরোগ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেন, এসব রোগের অনেকগুলোই জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

হৃদরোগকে দেশের অন্যতম প্রধান অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জনসচেতনতা এবং উন্নত চিকিৎসাসেবার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।

ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগটি দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান।

ডায়াবেটিস চিকিৎসায় সমন্বিত ব্যবস্থা

ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত করার ওপর জোর দেন ডা. জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেন, রোগ শনাক্ত হওয়ার পর শুধু ওষুধ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। রোগীকে সঠিক রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, পরামর্শ, ওষুধ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে।

তাঁর মতে, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দেশজুড়ে একটি সমন্বিত ডায়াবেটিস সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

তিনি বলেন, ডায়াবেটিসের রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিশেষায়িত চিকিৎসা পর্যন্ত রোগীর চিকিৎসা-ধারা সমন্বিত হওয়া দরকার।

বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা

দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখ করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিকল্পনায় বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

বয়স্ক মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই তাঁদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে একজন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কোনো রোগে আক্রান্ত থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেতে পারেন।

পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার আহ্বান

একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা—এমন মন্তব্য করে ডা. জুবাইদা রহমান পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, রোগের ইতিহাস এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্য থাকলে রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা দুটিই আরও কার্যকর করা সম্ভব।

এ জন্য স্বাস্থ্যসেবা মানুষের বাড়ির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার কথা বলেন তিনি।

নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

স্বাস্থ্য খাতে জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন ডা. জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেন, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যশিক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগের ব্যবস্থাপনা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

মাতৃস্বাস্থ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা প্রয়োজন

মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, গর্ভাবস্থার শেষ দিকে অনেক নারীকে চিকিৎসার জন্য দূরের হাসপাতালে যেতে হয়। এতে জরুরি মুহূর্তে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি হয়।

গর্ভকালীন জটিলতা, প্রি-একল্যাম্পসিয়া এবং অপরিণত নবজাতকের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে উপজেলা, জেলা এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, কোনো রোগীর জটিলতা দেখা দিলে তাঁকে যেন দ্রুত সঠিক চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শুধু হাসপাতালে পাঠালেই হবে না, চিকিৎসার পর রোগীর ফলোআপও নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা শেষে কোনো রোগী যেন আবার স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে চলে না যান, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

নিরাপদ রক্তসেবায় জাতীয় ব্যবস্থা

দেশের রক্তসেবা ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দিয়েছেন ডা. জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেন, স্বেচ্ছায় রক্তদান, নিরাপদভাবে রক্ত সংগ্রহ, সংক্রামক রোগের পরীক্ষা, রক্তের বিভিন্ন উপাদান পৃথক করা, সংরক্ষণ ও পরিবহন—প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।

রক্তদাতা থেকে রোগীর কাছে রক্ত পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা দরকার।

ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে প্লাজমা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের আধুনিক ব্যবস্থাও গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

উদ্ভাবন মানেই ব্যয়বহুল প্রযুক্তি নয়

স্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, উদ্ভাবন মানেই সব সময় দামি নতুন যন্ত্র বা নতুন কোনো অ্যাপ তৈরি করা নয়।

যে উদ্ভাবন দেশের মানুষের বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান করতে পারে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, দেশের মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে প্রযুক্তি ও গবেষণার ব্যবহার করতে হবে। গবেষণা, প্রযুক্তি, নীতিমালা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা জরুরি।

গবেষণাকে বাস্তব সেবার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, দেশে গবেষণার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু গবেষণার ফলাফল যেন শুধু গবেষণাপত্র বা পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণার ফল যাচাই ও মূল্যায়ন, এরপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে উদ্ভাবনের সংযোগ তৈরি করতে হবে।

এরপর সেই উদ্ভাবন যেন সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার করা যায়, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি অংশকে রোগী ও সাধারণ মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

দেশেই রয়েছে অনেক সক্ষমতা

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন আনার মতো অনেক সক্ষমতা ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ডা. জুবাইদা রহমান।

তাঁর মতে, দেশে শক্তিশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ওষুধশিল্প, ডিজিটাল প্রযুক্তির সক্ষমতা, কমিউনিটি পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠন এবং দক্ষ জনবল রয়েছে।

এখন এসব সক্ষমতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, গবেষক, চিকিৎসক, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবক, পেশাজীবী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী এবং কমিউনিটির সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা কঠিন।

সুশাসন ও জবাবদিহি জরুরি

স্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবনের পাশাপাশি সুশাসনের ওপরও গুরুত্ব দেন ডা. জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেন, সঠিক দিকনির্দেশনা, নির্দিষ্ট মানদণ্ড, জবাবদিহি এবং মানুষের আস্থা ছাড়া কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন কার্যকর রাখা সম্ভব নয়।

যেসব উদ্ভাবন বাস্তবে সফল হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিতে হবে।

একটি সফল উদ্যোগ শুধু একটি হাসপাতাল বা একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অন্য এলাকাতেও প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান এগিয়ে নিতে সরকার বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

চলতি বছর স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

বিভিন্ন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, পোস্টগ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট এবং মেধাবী চিকিৎসকদের গবেষণায় অর্থায়ন করার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

ভ্যাকসিন ও মলিকিউলার গবেষণায় জোর

স্বাস্থ্য গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা. এম এ মুহিত বলেন, ভ্যাকসিন গবেষণা, রোগ প্রতিরোধ এবং মলিকিউলার গবেষণাসহ স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।

এ লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে একটি বড় মলিকিউলার ল্যাব স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এর কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দেশের স্বাস্থ্য সমস্যার স্থানীয়ভাবে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা সহজ হবে।

বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের যুক্ত করার উদ্যোগ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের দেশের স্বাস্থ্য গবেষণায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।

তাঁর মতে, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের গবেষণা কার্যক্রমে কাজে লাগানো গেলে গবেষণার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।

এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের গবেষকদের প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে দেশের গবেষণা কার্যক্রমের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।

স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে

স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন ডা. এম এ মুহিত।

তিনি বলেন, ‘হেলথটেক’ বা স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

হাসপাতালে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, রোগীর সিরিয়াল নেওয়া, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং চিকিৎসার সময় নির্ধারণের মতো কাজে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

ইতোমধ্যে কয়েকটি হাসপাতালে পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

উদ্ভাবনকে বাজার ও মানুষের সেবায় নিতে হবে

প্লেনারি সেশনে স্বাস্থ্যসেবায় উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার, সাশ্রয়ী চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং সবার জন্য সমান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘Innovate to Market’—এই ধারণাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬ আয়োজন করা হয়েছে।

তাঁর মতে, শুধু নতুন উদ্ভাবন তৈরি করলেই হবে না। সেই উদ্ভাবনকে বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার ও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

তিনি বলেন, গবেষক, উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

একজন গবেষক যেন উদ্যোক্তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, উদ্যোক্তা যেন শিল্পখাতে পৌঁছাতে পারেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেন বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজ করতে পারে—এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

‘ইনোভেশন হাব’ গড়ে তোলার উদ্যোগ

বিজ্ঞান সচিব বলেন, দেশের উদ্ভাবনী সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ‘ইনোভেশন হাব’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই হাব উদ্ভাবক, গবেষক, উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

সরকার নীতি, অর্থায়ন, অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্ভাবনের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, উদ্ভাবনকে শুধু প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সমস্যার সমাধান, বাণিজ্যিকীকরণ এবং বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।

সমন্বিত জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর জোর

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদ্যমান সক্ষমতাগুলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা।

একজন মানুষ অসুস্থ হলে তাঁর চিকিৎসা যেন বাড়ির কাছাকাছি শুরু হয়, প্রয়োজন হলে দ্রুত উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে পারেন এবং চিকিৎসার পরও প্রয়োজনীয় ফলোআপ পান—এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি ধাপে রোগীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ, সচেতনতা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, ওষুধ, পুনর্বাসন এবং ফলোআপ—সবকিছু যুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ

প্লেনারি সেশনটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান, সভাপতি, ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। তিনি সেশনে কী-নোট স্পিকার হিসেবেও বক্তব্য দেন।

সেশনে স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনায় অংশ নেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর হোসাইন, আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমীদ আহমেদ, টিএমএসএসের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর-২ ডা. মো. মতিউর রহমান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এম. মোসাদ্দেক হোসাইন, ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের ডিরেক্টর অব মেডিকেল সার্ভিসেস ডা. আজহারুল ইসলাম খান এবং এসকেজেনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. সাদাফ সাজ সিদ্দিকী।

আলোচনায় স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবন, সাশ্রয়ী চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবায় সমতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার বিভিন্ন উপায় উঠে আসে।

মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর প্রত্যয়

সেমিনারের আলোচনায় বক্তারা একমত হন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হলে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা জরুরি।

একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং চিকিৎসার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

সবার জন্য সমান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, চিকিৎসক, ওষুধশিল্প, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ ও কমিউনিটির সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মত দেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য খাতের উদ্ভাবনকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সবার জন্য সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক, স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।