সন্দেহ, নির্যাতন ও অসম্মান: যে কারণে ভেঙেছিল সালমান–ঐশ্বরিয়ার প্রেম


বিনোদন ডেস্ক

একসময় বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রেমিক যুগল ছিলেন সালমান খান ও ঐশ্বরিয়া রাই। তাঁদের প্রেম নিয়ে ভক্তদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। এমনকি তাঁদের বিয়ে নিয়েও কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু যে সম্পর্ক একসময় ভালোবাসা আর স্বপ্নে ঘেরা ছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে ওঠে তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণ। সন্দেহ, ঝগড়া, পারিবারিক দূরত্ব এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে ভেঙে যায় তাঁদের সম্পর্ক।

সালমানের সঙ্গে সম্পর্কের সময় নানা ধরনের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন বলে পরে জানিয়েছেন ঐশ্বরিয়া। তাঁর অভিযোগ ছিল, সম্পর্কের মধ্যে তাঁকে মানসিক চাপ, অসম্মান এবং শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। অন্যদিকে সালমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি কখনো ঐশ্বরিয়াকে শারীরিকভাবে আঘাত করেননি।

দুজনের সম্পর্কের শুরু থেকে বিচ্ছেদ পর্যন্ত নানা ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। একসময় বিয়ের স্বপ্ন দেখা এই জুটি কেন আলাদা হয়ে গেলেন? তাঁদের সম্পর্কের ভাঙনের পেছনে কী কী কারণ কাজ করেছিল? আজ ১ নভেম্বর ঐশ্বরিয়ার জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক বলিউডের অন্যতম আলোচিত এই প্রেম ও বিচ্ছেদের গল্প।

সিনেমার সেটেই শুরু হয়েছিল প্রেম
সালমান খান ও ঐশ্বরিয়া রাইয়ের পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা বাড়ে সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ ছবির শুটিংয়ের সময়। ১৯৯৯ সালে ছবিটির কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে বলিউডে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

ছবিতে দুজনকে প্রেমিক-প্রেমিকার চরিত্রে দেখা গিয়েছিল। পর্দায় তাঁদের অভিনয় ও রসায়ন দর্শকের মন জয় করে। তবে শুধু পর্দাতেই নয়, বাস্তব জীবনেও তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল বলে সে সময় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ছবিটি মুক্তির পর তাঁদের প্রেম নিয়ে আলোচনা আরও বেড়ে যায়।

তখন সালমান খান বলিউডের প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় অভিনেতা। ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’, ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ ও ‘করণ অর্জুন’-এর মতো সফল ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে ১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ড হওয়ার পর ঐশ্বরিয়া রাইও ধীরে ধীরে হিন্দি সিনেমায় নিজের অবস্থান তৈরি করছিলেন।

সৌন্দর্য, অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের কারণে ঐশ্বরিয়াকে নিয়ে তখন বলিউডে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। অন্যদিকে সালমান ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। সব মিলিয়ে তাঁদের জুটি হয়ে ওঠে দর্শক ও সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

বিভিন্ন অনুষ্ঠান, পার্টি ও জনসমক্ষে তাঁদের একসঙ্গে দেখা যেত। দুজনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রায়ই সংবাদ প্রকাশিত হতো। তাঁদের সম্পর্কের ছোটখাটো ঘটনাও তখন বিনোদনজগতের খবরের শিরোনাম হয়ে উঠত।

বিয়ের স্বপ্নও দেখেছিলেন দুজন
সালমান ও ঐশ্বরিয়ার সম্পর্ক যে বেশ গভীর ছিল, তা নিয়ে সে সময় বলিউডে অনেক আলোচনা হয়েছে। তাঁদের ঘনিষ্ঠজনদের বিভিন্ন বক্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দুজনই সম্পর্কটিকে বিয়ের মাধ্যমে স্থায়ী রূপ দিতে চেয়েছিলেন।

তবে তাঁদের সম্পর্কের পথে শুরু থেকেই কিছু জটিলতা ছিল। বিশেষ করে ঐশ্বরিয়ার পরিবারের সঙ্গে সালমানের সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না বলে বিভিন্ন সময় খবর প্রকাশিত হয়।

সাংবাদিক হানিফ জাভেরি পরবর্তী সময়ে দাবি করেন, সালমানের অতীত প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে ঐশ্বরিয়ার পরিবারের আপত্তি ছিল। সোমি আলী ও সংগীতা বিজলানির সঙ্গে সালমানের আগের সম্পর্কের বিষয়টিও পরিবারকে ভাবিয়ে তুলেছিল বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

২০২৫ সালে ‘মেরি সহেলি’ পডকাস্টে বলিউডের বিভিন্ন প্রেম ও বিতর্ক নিয়ে কথা বলার সময় হানিফ জাভেরি এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, সালমান ও ঐশ্বরিয়া দুজনই সম্পর্ককে পরবর্তী ধাপে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সালমানের নাম অন্য অভিনেত্রীদের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় ঐশ্বরিয়ার পরিবার তাঁকে নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেনি।

তবে এটি সাংবাদিকের পরবর্তী সময়ের বক্তব্য। ঐশ্বরিয়া কখনো প্রকাশ্যে বলেননি যে শুধু পরিবারের আপত্তির কারণেই তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল। বরং নিজের দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি সম্পর্কের ভেতরের আচরণ, সন্দেহ ও দুর্ব্যবহারের বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সন্দেহ আর ঝগড়ায় বাড়ছিল দূরত্ব
সম্পর্কের শুরুতে ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সময়ের সঙ্গে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ঐশ্বরিয়ার সঙ্গে অন্য অভিনেতাদের নাম জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে সালমান তা সহজভাবে নিতে পারতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঐশ্বরিয়ার সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও সালমানের সন্দেহ ছিল বলে পরবর্তী সময়ে নিজেই জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।

২০০২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঐশ্বরিয়া বলেন, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও সালমান বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। তিনি ফোন করে নানা ধরনের কথা বলতেন। এমনকি ঐশ্বরিয়ার সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করতেন।

ঐশ্বরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, শাহরুখ খান থেকে শুরু করে অভিষেক বচ্চন—বিভিন্ন অভিনেতার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে নানা ধরনের আলোচনা হতো। এসব বিষয় নিয়ে সালমানের সন্দেহ ও প্রতিক্রিয়া তাঁদের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছিল।

শুধু সন্দেহ বা মনোমালিন্যই নয়, সম্পর্কের সময় আরও কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন ঐশ্বরিয়া। তাঁর দাবি, কখনো কখনো সালমান তাঁর সঙ্গে শারীরিকভাবে দুর্ব্যবহার করতেন। এমন পরিস্থিতির পরও তাঁকে স্বাভাবিকভাবে কাজে যেতে হতো।

বাইরে থেকে মানুষ তাঁদের সম্পর্কের ভালো দিকটিই দেখত। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যে কঠিন সময় পার করছিলেন, তা অনেকের কাছেই অজানা ছিল বলে জানান ঐশ্বরিয়া।

মধ্যরাতে বাড়ির সামনে উত্তেজনা
সালমান ও ঐশ্বরিয়ার সম্পর্কের অবনতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০০১ সালের নভেম্বরে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক রাতে সালমান মুম্বাইয়ে ঐশ্বরিয়ার বাসায় যান। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে দরজায় ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

ঘটনাটি সে সময় বলিউডে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

২০১৬ সালে ‘রেডিফ’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সালমানের পুরোনো সাক্ষাৎকারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সালমান ওই ঘটনার কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে তাঁর দাবি ছিল, সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে বাড়িয়ে প্রকাশ করেছিল।

সালমান তখন বলেছিলেন, প্রেমের সম্পর্কে ঝগড়া বা মনোমালিন্য হতেই পারে। তাঁর মতে, ভালোবাসার সম্পর্কে আবেগ ও রাগ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ঘটনাটি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যেভাবে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি তাঁর কাছে অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল।

ঐশ্বরিয়ার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কথাও তখন স্বীকার করেছিলেন সালমান। তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর অতীত সম্পর্ক নিয়ে ঐশ্বরিয়ার পরিবার সন্তুষ্ট ছিল না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও তাঁর কিছু ভুল হয়েছিল বলে স্বীকার করেন তিনি।

এই ঘটনা তাঁদের সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল বলে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। একদিকে ঐশ্বরিয়ার পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে বাড়তে থাকা অশান্তি—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছিল।

শুটিং সেটেও পৌঁছেছিল সম্পর্কের অশান্তি
ঐশ্বরিয়া তখন একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করছিলেন। বলিউডে তাঁর অবস্থানও ধীরে ধীরে শক্ত হচ্ছিল। কিন্তু তাঁর পেশাগত জীবন নিয়েও সালমানের আপত্তি ছিল বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে ঐশ্বরিয়ার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সালমানের সন্দেহের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়।

২০২৫ সালে ভারতীয় অভিনেত্রী হিমানি শিবপুরি এক সাক্ষাৎকারে সে সময়ের কিছু ঘটনা স্মরণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান কখনো কখনো শুটিং সেটে এসে ঐশ্বরিয়াকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন।

হিমানি আরও দাবি করেন, একবার ঐশ্বরিয়ার সৌন্দর্য নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন সালমান। পরিস্থিতি সামাল দিতে তখন তিনি সালমানকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।

যদিও এসব ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণই মূলত আলোচনায় এসেছে, তবু ঘটনাগুলো তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের চিত্র তুলে ধরে।

শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ঐশ্বরিয়ার
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সালমানের বিরুদ্ধে আরও স্পষ্টভাবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেন ঐশ্বরিয়া। তাঁর অভিযোগ ছিল, সালমানের মদ্যপ অবস্থায় দুর্ব্যবহার, অতিরিক্ত সন্দেহ, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নির্যাতনের কারণে তিনি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন।

ঐশ্বরিয়া জানান, সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি অনেক কিছু সহ্য করেছিলেন। কিন্তু বিনিময়ে তাঁকে মৌখিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক দুর্ব্যবহার এবং অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস ও সম্মানের অভাব তৈরি হয়েছিল। বারবার সন্দেহ, ঝগড়া এবং অপমানের কারণে পরিস্থিতি তাঁর জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে।

একসময় তিনি বুঝতে পারেন, এভাবে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। নিজের আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তির কথা ভেবেই সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

তবে সালমান খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘মিড-ডে’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ঐশ্বরিয়াকে তিনি কখনো মারধর করেননি।

সালমানের দাবি ছিল, রাগ বা আবেগের মুহূর্তে তিনি কখনো নিজের ক্ষতি করতেন। দেয়ালে মাথা ঠুকতেন বলেও জানান তিনি। তবে অন্য কাউকে আঘাত করার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

পরবর্তী সময়েও এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে একই অবস্থান ধরে রাখেন সালমান। ২০২৫ সালে এনডিটিভির একটি প্রতিবেদনে তাঁর পুরোনো বক্তব্য আবার সামনে আসে। সেখানে তিনি ঐশ্বরিয়াকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন।

অর্থাৎ, এই সম্পর্কের ভাঙন নিয়ে দুজনের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ঐশ্বরিয়া যেখানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, সেখানে সালমান সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

‘চলতে চলতে’ সিনেমা ঘিরেও বিতর্ক
সালমান ও ঐশ্বরিয়ার বিচ্ছেদের পরও তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা থামেনি। বরং বিভিন্ন ঘটনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল শাহরুখ খানের ‘চলতে চলতে’ সিনেমা।

ছবিটিতে শাহরুখ খানের বিপরীতে অভিনয় করার কথা ছিল ঐশ্বরিয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর ছবিতে দেখা যায়নি। তাঁর পরিবর্তে অভিনয় করেন রানি মুখার্জি।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ছবির শুটিং চলার সময় সালমান সেখানে উপস্থিত হয়ে উত্তেজিত আচরণ করেছিলেন। ঐশ্বরিয়ার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব সিনেমার কাজেও পড়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়।

এ নিয়ে সে সময় বলিউডে ব্যাপক আলোচনা হয়। একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের অশান্তি কীভাবে তাঁর পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে, ‘চলতে চলতে’ ছবিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তবে ছবিটি থেকে ঐশ্বরিয়ার বাদ পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে।

২০০৩ সালে সম্পর্কের ইতি টানেন ঐশ্বরিয়া
দীর্ঘদিন ধরে চলা নানা ঘটনা ও বিতর্কের পর ২০০৩ সালের ৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সালমানের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার ঘোষণা দেন ঐশ্বরিয়া।

দুই পৃষ্ঠার একটি বিবৃতিতে তিনি জানান, ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি সালমানের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্কও আর রাখতে চান না।

নিজের ভালো থাকা, মানসিক শান্তি, আত্মমর্যাদা এবং পরিবারের সম্মানের কথা বিবেচনা করেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন।

সালমানের সঙ্গে কাটানো সময়কে জীবনের দুঃস্বপ্ন বলেও উল্লেখ করেছিলেন ঐশ্বরিয়া। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর আগেই তিনি সম্পর্কটি শেষ করেছিলেন। কিন্তু এরপরও তাঁকে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে নানা ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এই বিবৃতির মাধ্যমে ঐশ্বরিয়া তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সালমানের সঙ্গে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা পেশাগত সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্তও স্পষ্ট করে দেন।

এরপর থেকে তাঁদের দুজনকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখা যায়নি। একসময় যে জুটিকে ঘিরে বিয়ের আলোচনা চলেছিল, সেই সম্পর্কের পরিণতি দাঁড়ায় সম্পূর্ণ বিচ্ছেদে।

বিচ্ছেদের পর দুজনের আলাদা জীবন
সালমান ও ঐশ্বরিয়ার সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর দুজনই নিজেদের মতো করে জীবন এগিয়ে নিয়েছেন। ঐশ্বরিয়ার জীবনে পরে আসেন অভিনেতা অভিষেক বচ্চন।

অভিষেকের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা বাড়ার পর একসময় তাঁদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০০৭ সালের এপ্রিলে বিয়ে করেন তাঁরা। এরপর বলিউডের অন্যতম আলোচিত তারকা দম্পতি হয়ে ওঠেন অভিষেক ও ঐশ্বরিয়া।

২০১১ সালে তাঁদের কন্যা আরাধ্যার জন্ম হয়। পরিবার ও কাজ—দুই দিক সামলেই এগিয়ে চলেছেন ঐশ্বরিয়া।

অন্যদিকে সালমান খানও নিজের অভিনয়জীবনে ব্যস্ত থেকেছেন। ‘তেরে নাম’, ‘ওয়ান্টেড’, ‘দাবাং’, ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ ও ‘সুলতান’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে বলিউডে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি।

বিভিন্ন সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গেলেও এখনো বিয়ে করেননি সালমান।

অতীতের সম্পর্ক নিয়ে আর কথা বলতে চান না ঐশ্বরিয়া
সালমানের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বহু বছর পরও তাঁদের প্রেম নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। তবে একটা সময়ের পর এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাননি ঐশ্বরিয়া।

২০১২ সালে সিমি গারেওয়ালের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘রঁদেভু উইথ সিমি গারেওয়াল’-এ অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে সালমানের সঙ্গে অতীত সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠলেও সরাসরি বিস্তারিত আলোচনায় যেতে চাননি এই অভিনেত্রী।

অনুষ্ঠানে সিমি তাঁকে অতীতের সম্পর্কটি নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করতে বলেন। উত্তরে ঐশ্বরিয়া জানান, তিনি জীবনের সেই অধ্যায় পেছনে ফেলে এসেছেন। অতীতকে অতীত হিসেবেই রাখতে চান।

ঐশ্বরিয়ার বক্তব্য ছিল, সেই সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো তিনি নিজের জীবন থেকে সরিয়ে ফেলেছেন। এ নিয়ে প্রকাশ্যে আর আলোচনা করতে চান না।

এর পেছনে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও কাছের মানুষদের ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়টিও রয়েছে বলে জানান তিনি। পুরোনো ঘটনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হলে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনও আলোচনায় চলে আসতে পারে। সেটি তিনি চান না।

ভালোবাসার গল্পের শেষ হয়েছিল তিক্ততায়
সালমান খান ও ঐশ্বরিয়া রাইয়ের সম্পর্ক একসময় বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রেমের গল্পগুলোর একটি ছিল। তাঁদের ঘিরে ছিল ভালোবাসা, বিয়ের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কেই তৈরি হয় অবিশ্বাস, সন্দেহ ও দূরত্ব।

ঐশ্বরিয়ার অভিযোগ অনুযায়ী, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অসম্মান এবং অতিরিক্ত সন্দেহ তাঁকে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল। অন্যদিকে সালমান বরাবরই শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তাঁদের বিচ্ছেদের পেছনে পারিবারিক আপত্তি, ব্যক্তিগত মতবিরোধ এবং পেশাগত জীবনের নানা ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। তবে সম্পর্ক ভাঙার কারণ নিয়ে দুজনের বক্তব্য এক নয়।

সব মিলিয়ে সালমান ও ঐশ্বরিয়ার প্রেমের গল্প শুধু একটি তারকা জুটির বিচ্ছেদের ঘটনা নয়; বরং ভালোবাসার সম্পর্কে বিশ্বাস, সম্মান ও ব্যক্তিগত মর্যাদার গুরুত্ব নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। একসময় যে সম্পর্ককে ঘিরে বিয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন অনেকে, শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক থেকেই বেরিয়ে এসে নিজের মতো করে জীবন সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ঐশ্বরিয়া।