শীতে ত্বক ভালো রাখতে প্রতিদিনের যত্নে রাখুন এই ৪ অভ্যাস

বেশি প্রসাধনী নয়, নিয়ম মেনে পরিষ্কার, টোনিং, ময়েশ্চারাইজিং ও ঠোঁটের যত্নেই মিলবে সুস্থ ও কোমল ত্বক

ডেস্ক রিপোর্ট

শীতের আগমনী বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়া শুষ্ক হতে শুরু করায় অনেকের ত্বকে দেখা দিচ্ছে টানটান ভাব, রুক্ষতা ও শুষ্কতা। কারও ঠোঁট ফেটে যাচ্ছে, আবার কারও মুখের ত্বক হয়ে উঠছে খসখসে। এ সময় ত্বকের স্বাভাবিক কোমলতা ধরে রাখতে অনেকে ব্যবহার করছেন নানা ধরনের সিরাম, অ্যাম্পুল, ময়েশ্চারাইজার, পেট্রোলিয়াম জেলি ও বিভিন্ন তেল।

তবে সুন্দর ও সুস্থ ত্বকের জন্য একসঙ্গে অনেক প্রসাধনী ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। বরং ত্বকের প্রয়োজন বুঝে অল্প কিছু পণ্য নিয়মিত ব্যবহার করাই বেশি কার্যকর। রূপচর্চার জগতে এই সহজ পদ্ধতি পরিচিত ‘স্কিনিমালিজম’ নামে। অর্থাৎ কম প্রসাধনী ব্যবহার করে ত্বকের মৌলিক যত্ন নিশ্চিত করা।

কিন্তু শীতের মতো শুষ্ক আবহাওয়ায় অল্প কয়েকটি পণ্য দিয়ে ত্বকের যত্ন নেওয়া কি সম্ভব? বিশেষজ্ঞদের মতে, অবশ্যই সম্ভব। সারা বছর ত্বকের যত্নে চারটি সাধারণ ধাপ অনুসরণ করলেই অনেকটা ভালো ফল পাওয়া যায়। এগুলো হলো ক্লিনজিং, টোনিং, ময়েশ্চারাইজিং ও লিপ কেয়ার। সংক্ষেপে এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘সি-টি-এম-এল’।

বিন্দিয়া এক্সক্লুসিভ বিউটি কেয়ারের প্রধান রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচি বলেন, স্কিনিমালিজম কোনো সাময়িক ফ্যাশন বা ট্রেন্ড নয়। এটি ত্বকের যত্ন নেওয়ার একটি সহজ ও স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে অনেকে এখন আট থেকে দশ ধাপের রূপচর্চায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অথচ সুস্থ ও সতেজ ত্বকের জন্য এত কিছু ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। ত্বকের ধরন অনুযায়ী কয়েকটি প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়মিত ব্যবহার করলেই ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

সি-টি-এম-এল: ত্বকের যত্নে চার ধাপ

১. সি—ক্লিনজিং বা ত্বক পরিষ্কার করা

ত্বকের যত্ন শুরু করতে হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে। প্রতিদিন বাইরে বের হলে ধুলাবালু, ঘাম ও ময়লা ত্বকে জমে। শীতকালে ত্বকে মরা কোষও জমতে পারে। এসব দূর করতে নিয়মিত মুখ পরিষ্কার করা জরুরি।

তবে শীতের সময় ত্বক এমনিতেই শুষ্ক হয়ে পড়ে। তাই অতিরিক্ত শক্তিশালী বা বেশি ফেনা তৈরি করে এমন ফেসওয়াশ ব্যবহার না করাই ভালো। ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে মৃদু ক্লিনজার বেছে নেওয়া উচিত।

এ সময় তেলভিত্তিক ক্লিনজারও ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত মেকআপ করেন বা সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন, তাঁরা ডাবল ক্লিনজিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। এ পদ্ধতিতে প্রথমে তেলভিত্তিক ক্লিনজার দিয়ে মুখের মেকআপ, সানস্ক্রিন ও জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে হয়। এরপর মৃদু জেল বা পানিভিত্তিক ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিতে হয়।

তবে ত্বকের ধরন বুঝে ক্লিনজার নির্বাচন করা জরুরি। পরিষ্কারের পর ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক বা টানটান হয়ে গেলে বুঝতে হবে ব্যবহৃত পণ্যটি ত্বকের জন্য উপযুক্ত নয়।

২. টি—টোনিং বা টোনার ব্যবহার

মুখ পরিষ্কার করার পর ত্বকের যত্নে দ্বিতীয় ধাপ হলো টোনিং। টোনার ত্বককে সতেজ রাখতে এবং পরবর্তী যত্নের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।

রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচির মতে, আমাদের দেশের আবহাওয়ায় পানিভিত্তিক টোনার ব্যবহার করা ভালো। এটি ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং ত্বককে কোমল অনুভূতি দেয়।

মুখ ধোয়ার পর ত্বক হালকা ভেজা থাকা অবস্থায় টোনার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অ্যালকোহলযুক্ত বা অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত টোনার এড়িয়ে চলা ভালো। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে মৃদু উপাদানসমৃদ্ধ টোনার বেছে নেওয়া প্রয়োজন।

টোনার ব্যবহারের পর ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। এতে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সুবিধা হয়।

৩. এম—ময়েশ্চারাইজিং বা আর্দ্রতা ধরে রাখা

শীতকালে ত্বকের যত্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো ময়েশ্চারাইজিং। ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসের কারণে ত্বক থেকে স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যায়। ফলে ত্বক রুক্ষ, খসখসে ও প্রাণহীন দেখাতে পারে।

এ সমস্যা এড়াতে প্রতিদিন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা জরুরি। মুখ ধোয়া ও টোনার ব্যবহারের পর ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে।

যাঁদের ত্বক শুষ্ক, তাঁরা ক্রিমভিত্তিক বা তুলনামূলক ঘন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন। অন্যদিকে তৈলাক্ত ত্বকের জন্য হালকা জেল বা পানিভিত্তিক ময়েশ্চারাইজার ভালো হতে পারে।

ময়েশ্চারাইজার শুধু মুখে নয়, হাত, পা, কনুই ও শরীরের শুষ্ক অংশেও ব্যবহার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গোসলের পর ত্বক সামান্য ভেজা থাকতেই ময়েশ্চারাইজার লাগালে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সুবিধা হয়।

৪. এল—লিপ কেয়ার বা ঠোঁটের যত্ন

শীত এলে ঠোঁট ফেটে যাওয়া খুব সাধারণ সমস্যা। মুখের ত্বকের তুলনায় ঠোঁটের আবরণ পাতলা হওয়ায় শুষ্ক আবহাওয়ায় এটি দ্রুত আর্দ্রতা হারায়।

ফলে ঠোঁট শুকিয়ে যায়, চামড়া ওঠে এবং কখনো কখনো ফেটেও যায়। তাই শীতের সময় ঠোঁটের যত্নকে অবহেলা করা উচিত নয়।

নিয়মিত লিপবাম বা লিপজেল ব্যবহার করলে ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। বাইরে যাওয়ার আগে এবং রাতে ঘুমানোর আগে লিপবাম ব্যবহার করা যেতে পারে। ঠোঁট শুকিয়ে গেলে বারবার জিব দিয়ে ভেজানোর অভ্যাসও বাদ দিতে হবে। এতে ঠোঁট আরও বেশি শুকিয়ে যেতে পারে।

ত্বকের ধরন বুঝে বেছে নিন প্রসাধনী

সবার ত্বকের ধরন এক নয়। কারও ত্বক তৈলাক্ত, কারও শুষ্ক, আবার কারও ত্বক মিশ্র প্রকৃতির। তাই একই ধরনের প্রসাধনী সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।

রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচি বলেন, স্কিনিমালিজম অনুসরণ করলেও ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য নির্বাচন করতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রসাধনী ব্যবহার না করে ত্বকের চাহিদা বুঝে যত্ন নেওয়াই ভালো।

তৈলাক্ত ও সংবেদনশীল ত্বক

তৈলাক্ত ত্বকে স্বাভাবিকভাবেই তেল বেশি তৈরি হয়। শীতকালেও অনেকের মুখের কপাল, নাক ও থুতনির অংশে তেল জমে। এ ধরনের ত্বকে ভারী ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করলে রোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণের সমস্যা বাড়তে পারে।

তাই তৈলাক্ত ত্বকের জন্য হালকা, পানিভিত্তিক বা জেল ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। এতে ত্বকের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় থাকবে, আবার অতিরিক্ত তৈলাক্ত ভাবও তৈরি হবে না।

অন্যদিকে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে প্রসাধনী নির্বাচনে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সুগন্ধি বা ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান এড়িয়ে চলা উচিত। নতুন কোনো পণ্য ব্যবহারের আগে ত্বকের ছোট একটি অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।

ব্রণ বা মেছতার সমস্যা থাকলেও সানস্ক্রিন ব্যবহার জরুরি। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য তেলমুক্ত বা নন-কমেডোজেনিক সানস্ক্রিন বেছে নেওয়া যেতে পারে।

শুষ্ক ত্বক

শীতকালে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন শুষ্ক ত্বকের অধিকারীরা। ঠান্ডা বাতাস ও কম আর্দ্রতার কারণে এ ধরনের ত্বক দ্রুত পানি হারায়। ফলে মুখে টান পড়ে, চামড়া ওঠে এবং কখনো কখনো চুলকানিও হতে পারে।

এ সময় শুষ্ক ত্বকের জন্য ঘন ক্রিমভিত্তিক ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে পুষ্টিকর উপাদানসমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার বেছে নেওয়া যেতে পারে।

প্রয়োজনে রাতে ঘুমানোর আগে শুষ্ক অংশে একটু বেশি ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যায়। তবে অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে মুখ ধোয়া বা দীর্ঘ সময় গরম পানিতে গোসল করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা আরও কমে যেতে পারে।

মিশ্র ত্বক

মিশ্র ত্বকে মুখের কিছু অংশ তৈলাক্ত থাকে, আবার কিছু অংশ শুষ্ক হয়। সাধারণত কপাল, নাক ও থুতনিতে তেল বেশি থাকে। অন্যদিকে গাল শুষ্ক হয়ে যেতে পারে।

এ ধরনের ত্বকের যত্নে ভারী প্রসাধনী ব্যবহার না করাই ভালো। হালকা ও পানিভিত্তিক ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখা সহজ হয়।

যেসব অংশ বেশি শুষ্ক, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে মুখের বিভিন্ন অংশের তেল ও আর্দ্রতার ভারসাম্য বজায় থাকে।

শীতেও সানস্ক্রিন ব্যবহার জরুরি

শীতের সকালে বা বিকেলে মিষ্টি রোদ উপভোগ করতে অনেকেই ভালোবাসেন। এ সময় অনেকের ধারণা, রোদ কম থাকায় সানস্ক্রিন ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়।

রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচি বলেন, সানস্ক্রিন কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর প্রসাধনী নয়। গরম হোক বা শীত, ত্বকের সুরক্ষায় এটি ব্যবহার করা প্রয়োজন। আকাশ মেঘলা থাকলেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।

দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা বিশেষভাবে জরুরি। ত্বকের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন বেছে নেওয়া যেতে পারে। বাইরে থাকলে সাধারণত দুই ঘণ্টা পরপর এবং ঘাম বা মুখ ধোয়ার পর আবার সানস্ক্রিন লাগাতে হয়।

রান্নাঘরে চুলার তাপ বা ঘরের আলোকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সমতুল্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে ত্বকের সুরক্ষায় নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস বজায় রাখা উচিত।

শীত আসার আগেই শুরু হোক যত্ন

শীত পুরোপুরি নেমে আসার পর ত্বকের যত্ন শুরু না করে আবহাওয়া শুষ্ক হতে শুরু করলেই নিয়মিত পরিচর্যা করা ভালো। এতে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখা সহজ হয়।

শারমিন কচির মতে, শীতের শুরু থেকেই ত্বক পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী টোনার ব্যবহার এবং নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে সুবিধা হয় এবং শীতের তীব্রতায় ত্বক অতিরিক্ত রুক্ষ হয়ে পড়ার আশঙ্কা কমে।

এ ছাড়া পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত ঘুমও ত্বকের স্বাভাবিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।

ত্বকের যত্ন নিতে গিয়ে একসঙ্গে অনেক প্রসাধনী ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের ত্বকের ধরন বুঝে প্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্য নিয়মিত ব্যবহার করাই ভালো।

শীতের রুক্ষতা থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে তাই জটিল রূপচর্চার বদলে মেনে চলুন সহজ চার ধাপের নিয়ম—ক্লিনজিং, টোনিং, ময়েশ্চারাইজিং ও লিপ কেয়ার। নিয়মিত যত্নে শীতেও ত্বক থাকতে পারে কোমল, সতেজ ও প্রাণবন্ত।