রাতে কোরআন তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদা
ডেস্ক রিপোর্ট :
পবিত্র কোরআন আল্লাহ তাআলার কালাম। কোরআন তিলাওয়াত মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। দিনের ব্যস্ততার পাশাপাশি রাতের কিছু সময় আল্লাহর ইবাদত, জিকির ও কোরআন তিলাওয়াতের জন্য রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
রাতের নীরব পরিবেশে কোরআন তিলাওয়াত করলে মনোযোগ বাড়ে, অন্তর প্রশান্ত হয় এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক আরও গভীর হয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে রাতের ইবাদত এবং কোরআন পাঠের বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাতের ইবাদতের প্রতি উৎসাহ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রাতের কিছু সময় তাঁর তাসবিহ ও ইবাদতে কাটানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন, ‘এবং রাতের একাংশেও তুমি তাঁর তাসবিহ পাঠ কোরো এবং নামাজের পরও।’ (সুরা ক্বফ, আয়াত : ৪০)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘রাতের একাংশে তাঁর উদ্দেশে সিজদা কোরো এবং দীর্ঘ রাত ধরে তাঁর তাসবিহ পাঠ কোরো।’ (সুরা দাহর, আয়াত : ২৬)
এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, একজন মুমিনের জীবনে রাতের ইবাদতেরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। রাতের নিরিবিলি সময় আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতে কাটানো ঈমানদারের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
রাতের ইবাদত আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের রাতের ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। বেলাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই রাতে ইবাদত করবে। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তী সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের সাধারণ আমল।’
হাদিসে রাতের ইবাদতের বিভিন্ন উপকারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম, পাপ থেকে দূরে থাকার সহায়ক এবং গুনাহের কাফফারা হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি দেহের বিভিন্ন রোগের জন্যও উপকারী বলে হাদিসে বর্ণনা এসেছে। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৯)
তাই রাতকে শুধু ঘুম ও বিশ্রামের সময় হিসেবে না দেখে এর কিছু অংশ ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করা মুমিনের জন্য কল্যাণকর।
রাতে কোরআন পাঠের বিশেষ গুরুত্ব
রাতের ইবাদত শুধু নামাজ ও জিকিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ সময় কোরআন তিলাওয়াত করাও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল।
সুরা মুজ্জাম্মিলের শুরুতে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রাতে নামাজে দাঁড়ানোর এবং ধীরে, স্পষ্টভাবে কোরআন তিলাওয়াত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন, ‘হে বস্ত্রাবৃত! রাতে নামাজে দাঁড়াও, কিছু অংশ ছাড়া, রাতের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম অথবা তার চেয়ে বাড়াও এবং ধীরে ধীরে সুস্পষ্টভাবে কোরআন পাঠ করো।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ১-৪)
এই নির্দেশের মধ্যে রাতের কোরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
রাতে চারপাশ যখন শান্ত থাকে, তখন একজন মানুষ সহজেই মনোযোগ দিয়ে কোরআন পড়তে পারেন। ফলে তিলাওয়াতের পাশাপাশি আয়াতের অর্থ ও শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগও তৈরি হয়।
কিয়ামতের দিন কোরআন সুপারিশ করবে
কোরআন তিলাওয়াতের অন্যতম বড় ফজিলত হলো—কিয়ামতের দিন কোরআন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন রোজা ও কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।
রোজা বলবে, সে দিনের বেলা পানাহার থেকে তাকে বিরত রেখেছিল। আর কোরআন বলবে, সে রাতে ওই বান্দাকে ঘুম থেকে বিরত রেখেছিল। তাই উভয়েই তার জন্য সুপারিশ করবে। এরপর তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৬৬২৬)
এই হাদিস একজন মুমিনকে রাতের কোরআন তিলাওয়াতে আরও উৎসাহিত করে। কারণ দুনিয়ার জীবনে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা আখিরাতেও তার জন্য উপকারের কারণ হতে পারে।
কোরআনের জ্ঞান ও আমলের প্রতি ঈর্ষা
কোরআন শিক্ষা করে তা নিয়মিত তিলাওয়াত ও আমল করার মর্যাদাও অনেক বেশি।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রতি ঈর্ষা করা যায় না।
এর মধ্যে একজন হলেন সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ কোরআনের জ্ঞান দিয়েছেন এবং তিনি দিন-রাত তা তিলাওয়াত করেন। তাঁর কোরআন তিলাওয়াত শুনে অন্যরা আফসোস করে বলেন, তাঁকেও যদি এমন জ্ঞান দেওয়া হতো, তাহলে তিনিও একইভাবে আমল করতেন।
হাদিসটি কোরআন শেখা, পড়া এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনার গুরুত্ব তুলে ধরে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৭৩৮)
অর্থাৎ কোরআন শুধু পড়লেই হবে না; এর শিক্ষা বোঝা এবং জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করাও জরুরি।
রাতে ১০০ আয়াত পড়ার ফজিলত
রাতে কোরআন তিলাওয়াতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলতের কথা হাদিসে এসেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি গুরুত্বের সঙ্গে ফরজ নামাজ আদায় করবে, সে উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। আর যে ব্যক্তি রাতে কোরআনের ১০০ আয়াত তিলাওয়াত করবে, তার নামও উদাসীনদের তালিকায় লেখা হবে না। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৯৮)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, নিয়মিত রাতের কোরআন তিলাওয়াত একজন মানুষকে আল্লাহর স্মরণে সচেতন থাকতে সাহায্য করে।
তবে কারও জন্য একসঙ্গে ১০০ আয়াত পড়া সম্ভব না হলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে কোরআন পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত তিলাওয়াতের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখা।
সাহাবিদের রাতের কোরআন তিলাওয়াত
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা কোরআনের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। তাঁদের জীবনে রাতের কোরআন তিলাওয়াত ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।
একবার একটি যুদ্ধের সফরে সাহাবিরা বিশ্রামের জন্য তাঁবু স্থাপন করেছিলেন। কাফেলায় থাকা কিছু আশআরি সাহাবি রাতে নিজেদের তাঁবুতে কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন।
তাঁদের তিলাওয়াতের আওয়াজ রাসুলুল্লাহ (সা.) শুনতে পেয়েছিলেন। পরদিন তিনি তাঁদের তিলাওয়াতের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, দিনের বেলায় তাঁদের তাঁবু কোথায় তা জানা না থাকলেও রাতে তাঁদের কোরআন তিলাওয়াতের সুমধুর আওয়াজ শুনে তিনি তাঁদের অবস্থান বুঝতে পেরেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪২৩২)
এ ঘটনা সাহাবিদের কোরআনের প্রতি গভীর ভালোবাসার একটি সুন্দর উদাহরণ।
উসমান (রা.)-এর কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক
সাহাবিদের মধ্যে হজরত উসমান (রা.)-এর কোরআন তিলাওয়াতের প্রতি বিশেষ ভালোবাসার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়।
তাঁর স্ত্রী নায়েলা বিনতে ফারাফেসা বর্ণনা করেন, উসমান (রা.) দীর্ঘ সময় কোরআন তিলাওয়াত করতেন। এমনকি তিনি এক রাকাত নামাজে পুরো রাত কাটিয়ে কোরআন খতম করার মতো ইবাদতও করতেন বলে বর্ণনায় এসেছে।
এ থেকে সাহাবিদের জীবনে কোরআনের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাঁরা কোরআনকে শুধু পাঠের বিষয় হিসেবে দেখতেন না; বরং তাঁদের জীবন, চিন্তা ও ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পবিত্র কোরআন।
রাতের নিরিবিলি সময় কাজে লাগানো
বর্তমান সময়ে মানুষের জীবন নানা ব্যস্ততায় পূর্ণ। দিনের বড় একটি অংশ কাজ, পড়াশোনা, ব্যবসা ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনে চলে যায়। ফলে অনেকেই নিয়মিত কোরআন পড়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করতে পারেন না।
এ ক্ষেত্রে রাতের কিছু সময় কাজে লাগানো যেতে পারে। ঘুমানোর আগে অল্প সময় কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস করা সম্ভব। কেউ চাইলে কয়েকটি আয়াত পড়তে পারেন, আবার সময় ও সুযোগ থাকলে আরও বেশি পড়তে পারেন।
তিলাওয়াতের সময় ধীরে ও স্পষ্টভাবে পড়া এবং সম্ভব হলে আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করা ভালো। এতে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করার সুযোগ তৈরি হবে।
কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়াই মূল কথা
রাতে কোরআন তিলাওয়াতের ফজিলত অনেক। তবে শুধু বেশি বেশি পড়াই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। কোরআন বুঝে পড়া, এর নির্দেশনা মেনে চলা এবং জীবনে তার শিক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত মানুষের অন্তরে আল্লাহর স্মরণ বাড়াতে পারে এবং তাকে ভালো কাজের দিকে উৎসাহিত করতে পারে। রাতের নীরব পরিবেশে কোরআন পাঠ তাই একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমেরও সুযোগ তৈরি করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআন শেখা, নিয়মিত তিলাওয়াত করা, এর অর্থ বোঝা এবং জীবনে কোরআনের শিক্ষা বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমিন।
