ভবন বেড়েছে ৫০ হাজার, বাড়েনি সড়ক; যানজটে নাকাল ময়মনসিংহবাসী

অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে নাগরিক দুর্ভোগ, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি
স্টাফ রিপোর্টার
ময়মনসিংহ শহরে বাড়ছে বহুতল ভবন, জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা। কিন্তু বাড়ছে না সড়কের প্রশস্ততা। ফলে প্রতিদিনই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট। পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগছে। এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
শহরে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ভবনের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২২ তলা পর্যন্ত বহুতল ভবনও। কিন্তু এসব ভবনের অনেকগুলো নির্মাণের সময় নিয়ম অনুযায়ী চারপাশে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়নি। কোনো কোনো ভবন তৈরি হয়েছে সড়কের একেবারে পাশে। ফলে শহরের সড়কগুলো আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ ও নগরায়ণের কারণে শুধু যানজটই বাড়ছে না, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের মতো দুর্ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
শহরের গাঙ্গিনারপাড়, চরপাড়া মোড়, নতুনবাজার ও পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় যানজটের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব এলাকায় যানবাহনের চাপ থাকে। সরু সড়কে বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সময়ে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে।
আট বছরে বেড়েছে হাজার হাজার ভবন
১৭৮৭ সালে ময়মনসিংহ শহরের গোড়াপত্তন হয়। ১৮৬৯ সালে এটি পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১৫ সালে বিভাগীয় শহরের মর্যাদা পায় ময়মনসিংহ। ২০১৮ সালে গঠিত হয় ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন। বর্তমানে ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই নগরীতে গত ১৪ অক্টোবর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার আট বছর পূর্ণ হয়েছে।
সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর শহরে ভবন নির্মাণের গতি বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের বসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহন। কিন্তু সেই তুলনায় সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার উন্নয়ন হয়নি। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ণের অভাবে শহরটি ক্রমেই ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ময়মনসিংহ শহরে এক থেকে সাততলা পর্যন্ত ভবনের সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৫৭১টি। সাততলার বেশি উচ্চতার ভবন ছিল ২৭০টি।
২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত শহরে নতুন করে এক থেকে সাততলা পর্যন্ত ভবন নির্মিত হয়েছে ৪ হাজার ৯৩৯টি। একই সময়ে আটতলা থেকে সর্বোচ্চ ২২তলা পর্যন্ত ভবন নির্মিত হয়েছে আরও ৫৩টি।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত এক থেকে সাততলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৯৯৫টি। আটতলা বা তার বেশি উচ্চতার ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৭৯টি।
সব মিলিয়ে বর্তমানে শহরে এক থেকে সাততলা পর্যন্ত ভবন রয়েছে ৫০ হাজার ৫৬৫টি। অন্যদিকে আট থেকে ২২তলা পর্যন্ত ভবনের সংখ্যা ৪০২টি। অর্থাৎ শহরে ভবনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে সড়ক প্রশস্ত করা হয়নি।
সরু সড়কে বাড়ছে যানবাহনের চাপ
শহরের প্রধান সড়কগুলোর অনেক জায়গায় যানবাহন চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। কোথাও সড়কের দুই পাশে দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কোথাও আবার ভবন নির্মাণ করা হয়েছে সড়কের একেবারে ঘেঁষে। ফলে সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা আরও কমে গেছে।
গাঙ্গিনারপাড়, নতুনবাজার, চরপাড়া ও পাটগুদাম ব্রিজ মোড় শহরের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। এসব এলাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সড়কের সীমিত জায়গায় এত যানবাহনের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ায় যানজট আরও দীর্ঘ হচ্ছে। অনেক সময় সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে জ্বালানি খরচ ও ভোগান্তি।
নগরবাসীর অভিযোগ, শহরের যানজট এখন নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ দীর্ঘদিনেও এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগ
শহরে ভবনের সংখ্যা বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা খালি রাখার কথা থাকলেও অনেক ভবনে তা মানা হয়নি। কোথাও কোথাও সড়কের পাশে পর্যাপ্ত জায়গা না রেখেই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
এতে একদিকে সড়কের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভবনগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা না থাকায় অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজ পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে এমন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও বেশি।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নগর-পরিকল্পনাবিদ মানস কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, সীমিত জনবল দিয়ে তাঁরা ভবন নির্মাণের বিষয়গুলো তদারক করছেন। কিন্তু নিয়ম মানানোর ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের সীমিত জনবল দিয়েই তদারকি করছি। কিন্তু এখানকার মানুষের সমস্যা হলো জোর করেও কাউকে নিয়ম মানানো যায় না।’
তাঁর বক্তব্যে নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনবলের সীমাবদ্ধতা এবং নাগরিকদের নিয়ম না মানার প্রবণতা—দুই বিষয়ই উঠে এসেছে।
পুরোনো ভবন নিয়ে ব্যবস্থা নিতে জটিলতা
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান বলেন, তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ ছয় মাসের কিছু বেশি। এ সময়ে শহরের আর কোনো ক্ষতি যেন না হয়, সে চেষ্টা করছেন তাঁরা।
আগে নির্মিত বহুতল ভবনগুলোর অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো ভবন অন্যায়ভাবে নির্মিত হয়ে থাকলে সেটি নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। এখন ভবন ভেঙে ফেলা বা উচ্ছেদ অভিযান চালানো অমানবিক হবে।
তবে নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড বা ভবন নির্মাণসংক্রান্ত বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রশাসক আরও বলেন, শহরের কিছু সড়ক সরু হওয়ায় যানজট তৈরি হচ্ছে। বিদ্যমান অনেক সড়ক প্রশস্ত করার সুযোগ না থাকায় নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শহরের ওপর চাপ কমাতে নগরায়ণ বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি জানান, শহরের বর্ধিত এলাকায় পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে মানুষ তুলনামূলক কম খরচে বাড়ি নির্মাণের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি সবাইকে শহরের কেন্দ্রের দিকে বসতি গড়তে হবে না।
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যাত্রা শুরু
অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ এবং পরিকল্পিতভাবে শহর গড়ে তোলার লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৮ জুন যাত্রা শুরু করেছে ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। নগরের ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব এখন এই কর্তৃপক্ষের।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন জেলা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। তিনি জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ নগরীকে পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নতুন এই কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নির্ভর করছে সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি এবং বিধিমালা বাস্তবায়নের ওপর।
মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় বাড়ছে সমস্যা
ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরের মর্যাদা পাওয়ার পর নগরীর অবকাঠামো উন্নয়নে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সেই পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী খ. মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, প্রধান শহর হিসেবে ময়মনসিংহের সড়কগুলোর প্রশস্ততা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। তারপরও বিদ্যমান সড়কগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিভাগীয় শহর হওয়ার পর একটি মাস্টারপ্ল্যান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সড়ক প্রশস্ত করতে গেলে অনেক স্থাপনা ও অবকাঠামো ভাঙতে হবে। সরকার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কোনো পরিকল্পনা নিলে সে ক্ষেত্রে সড়ক প্রশস্ত করা সম্ভব হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাঁদের কোনো পরিকল্পনা নেই।
পরিকল্পিত নগরায়ণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
ময়মনসিংহ শহরের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, শুধু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিলেই একটি নগরীর উন্নয়ন হয় না। পাশাপাশি প্রয়োজন প্রশস্ত সড়ক, পর্যাপ্ত ফুটপাত, পরিকল্পিত আবাসন, উন্নত ড্রেনেজব্যবস্থা, পার্কিং সুবিধা এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করা।
শহরের জনসংখ্যা ও যানবাহন বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে যানজট আরও ভয়াবহ হবে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের কারণে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পে ঝুঁকিও বাড়বে।
এ অবস্থায় ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। শহরের জন্য দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পুরোনো ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাই এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে যানজটপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিকল্প সড়ক, পার্কিং ও যানবাহন ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু নতুন সড়ক নির্মাণ নয়, বিদ্যমান সড়কগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
ময়মনসিংহ এখন বিভাগীয় শহর। তাই এর উন্নয়নও হতে হবে পরিকল্পিত ও নাগরিকবান্ধব। ৫০ হাজারের বেশি ভবনের এই নগরীতে যদি সড়ক ও নাগরিক সুবিধার উন্নয়ন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।