বরিশালে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জেই দিনে বিদ্যুৎ খরচ ১ কোটি টাকার বেশি

বিশেষ প্রতিবেদন :

বরিশাল নগরীর রাস্তায় এখন ব্যাটারিচালিত হলুদ অটোরিকশা ও রিকশার আধিপত্য। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য এসব যান সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম খরচের হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে এর সংখ্যা। কিন্তু এসব যানবাহনের সংখ্যা কত, কোথায় কোথায় চার্জ দেওয়া হয় এবং এর জন্য কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে—এসবের নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই কোনো দপ্তরের কাছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাটারি একবার পুরো চার্জ দিতে প্রায় ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। অনেক চালক দিনে দুইবার ব্যাটারি চার্জ দেন। সে হিসাবে একটি অটোরিকশায় দিনে প্রায় ২০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে।

বরিশাল নগরে প্রায় ৩০ হাজার হলুদ অটোরিকশা ও ৪০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে বলে ধারণা করছে মহানগর ট্রাফিক পুলিশ। অর্থাৎ মোট প্রায় ৭০ হাজার ব্যাটারিচালিত যান।

প্রতিটি যান দিনে একবার করে চার্জ দেওয়া হলেও ৭০ হাজার যানবাহনের জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৪ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে এর আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা প্রতিদিন

আর যদি কোনো কোনো যান দিনে দুইবার চার্জ দেওয়া হয়, তাহলে বিদ্যুৎ খরচ ও আর্থিক মূল্য আরও অনেক বেড়ে যায়।

এ বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় একটি অংশ বৈধ বাণিজ্যিক সংযোগের মাধ্যমে হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে ১২৭টি ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে। এর বাইরে প্রায় ২০০টি গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার নেই বলে জানা গেছে।

এসব গ্যারেজের কোথাও আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

কত অটোরিকশা চলছে, সঠিক হিসাব নেই

বরিশাল নগরীতে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও এর সঠিক হিসাব কোনো সরকারি দপ্তরের কাছে নেই।

বরিশাল মহানগর ট্রাফিক পুলিশের সম্ভাব্য হিসাব অনুযায়ী, নগরীতে প্রায় ৩০ হাজার হলুদ অটোরিকশা রয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার।

অর্থাৎ নগরের রাস্তায় প্রায় ৭০ হাজার ব্যাটারিচালিত যান চলাচল করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই সংখ্যা অনুমাননির্ভর। কারণ এসব যান চালানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা কার্যকর অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে একদিকে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে সেগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণও তৈরি হচ্ছে না।

সিটি করপোরেশন একসময় ৭ হাজার ৬১০টি হলুদ অটোরিকশার অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু এসব অনুমোদনের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে কোনো অনুমোদন নবায়ন করা হয়নি।

তারপরও নগরের সড়কে হাজার হাজার অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে।

প্রতিদিন বিদ্যুতের বড় চাপ

অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব যান চার্জ দেওয়ার জন্য বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে।

ওজোপাডিকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, একটি অটোরিকশার ব্যাটারি একবার চার্জ দিতে প্রায় ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে।

অনেক চালক দিনে দুইবার ব্যাটারি চার্জ করেন। সেক্ষেত্রে একটি অটোরিকশায় দিনে প্রায় ২০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে।

৭০ হাজার যান যদি গড়ে দিনে একবার চার্জ দেওয়া হয়, তাহলে প্রয়োজন হবে প্রায় ৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরে এর মূল্য প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

এটি শুধু একবার চার্জ দেওয়ার হিসাব। অনেক অটোরিকশা দিনে দুইবার চার্জ হওয়ায় প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

অর্থাৎ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

বাসাবাড়িতেও চলছে চার্জ

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু নির্দিষ্ট গ্যারেজেই যে ব্যাটারিচালিত যান চার্জ দেওয়া হচ্ছে তা নয়। নগরের বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও গ্যারেজ তৈরি করে অটোরিকশা ও রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।

এ ধরনের সংযোগের প্রকৃত সংখ্যা কত, সেটিও বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে পরিষ্কার নয়।

ওজোপাডিকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, তার আওতাধীন এলাকায় অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার গ্যারেজের প্রকৃত সংখ্যা তাদের জানা নেই।

তিনি জানান, বিভিন্ন জায়গায় বাসাবাড়ির সংযোগ ব্যবহার করেও ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এসব বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

কারণ একটি আবাসিক সংযোগে একটি বাড়ির স্বাভাবিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি যদি একাধিক অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়, তাহলে সেটি সহজে শনাক্ত করা সব সময় সম্ভব হয় না।

১২৭ গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল নগরীতে ১২৭টি ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে।

অর্থাৎ এসব গ্যারেজে বাণিজ্যিক সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এর বাইরে প্রায় ২০০টি গ্যারেজ রয়েছে, যেগুলোতে বাণিজ্যিক মিটার নেই বলে জানা গেছে।

এসব গ্যারেজে কী ধরনের সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, আবাসিক সংযোগ দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে অটোরিকশা চার্জ করা নিয়মসঙ্গত নয়। আবার মূল লাইন থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে সেটি সরাসরি চুরি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এ কারণে ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালানোর প্রয়োজন রয়েছে।

‘বিদ্যুতের লোকজনকে মাসে টাকা দিতে হয়’

নগরের একটি ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজের মালিক অভিযোগ করেছেন, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ না করার জন্য তাকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়।

স্টেডিয়াম কলোনির ওই গ্যারেজ মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যুতের লোকজনকে মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে সংযোগ কেটে দেওয়ার ভয় থাকে বলেও দাবি করেন তিনি।

তার দাবি, আবাসিক মিটার ব্যবহার করেই বেশি সংখ্যক যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যায়।

তবে ওই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও জড়িয়ে পড়ে। ফলে বিদ্যুৎ বিভাগের অভ্যন্তরীণ নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

রাতের অন্ধকারে মেইন লাইন থেকে সংযোগ

বিসিক এলাকার আরেক গ্যারেজ মালিক আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, রাতে প্রায় ১টার পর মেইন লাইনে হুক লাগিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এতে বিদ্যুতের খরচ কম হয় বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের সংযোগ ব্যবহার করলেও বিষয়টি ধরা না পড়ার জন্য মিটার রিডারকেও মাঝেমধ্যে টাকা দিতে হয়।

তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যদি এ ধরনের অবৈধ সংযোগ বাস্তবে থেকে থাকে, তাহলে তা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সরাসরি মেইন লাইন থেকে হুক লাগিয়ে বিদ্যুৎ নেওয়া হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অনিয়ন্ত্রিত চাপ তৈরি হতে পারে।

ছয় মাসে ৬৮১ মামলা

অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিরুদ্ধে গত ছয় মাসে বরিশাল নগরীতে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে ৬৮১টি মামলা করা হয়েছে। মামলাগুলোতে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ঘটনায় তিনজনকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান বলছে, নগরীতে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ঘটনা কম নয়। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশার চার্জিং গ্যারেজগুলোর মধ্যে কতটি অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করছে, তার আলাদা কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই।

ফলে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি বড় ক্ষেত্র এখনো পুরোপুরি নজরদারির আওতায় এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নগরের তুলনায় অটোরিকশা বেশি

ওজোপাডিকোর পরিচালন ও সংরক্ষণ বরিশাল সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরিতোষ চন্দ্র সরকার বলেন, বরিশাল নগরীর আয়তনের তুলনায় এখানে যে পরিমাণ অটোরিকশা রয়েছে, তা দেশের অন্য কোনো শহরে নেই।

তার এই বক্তব্যে নগরে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নয়, এসব যান নগরের সড়কব্যবস্থা, যানজট ও নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা একই সময়ে সড়কে চলাচল করায় বিভিন্ন এলাকায় যানজট তৈরি হচ্ছে।

তার ওপর চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

অবৈধ সংযোগে কঠোর ব্যবস্থা

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরিতোষ চন্দ্র সরকার বলেন, বরিশাল নগরের কোথাও ব্যাটারিচালিত যান চার্জ দেওয়ার জন্য অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বৈধ সংযোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাটারি চার্জ করা হলে সেটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও ট্যারিফের আওতায় থাকে। কিন্তু আবাসিক মিটার ব্যবহার করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো বা মূল লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নেওয়া আইনবহির্ভূত।

তাই ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজগুলোর বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

একই সঙ্গে কোন গ্যারেজ বৈধ, কোনটি অবৈধ এবং কোন সংযোগে কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে—এসব তথ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিয়ন্ত্রণহীন বাড়ছে যান

বরিশাল নগরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ সহজে যাতায়াত করা যায় এবং তুলনামূলকভাবে ভাড়া কম।

শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রী পরিবহনে এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গেও এই যানগুলো সরাসরি যুক্ত।

তবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সংখ্যা বাড়তে থাকলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। কারণ একটি নির্দিষ্ট শহরের সড়ক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও যান চলাচলের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবহন ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

কিন্তু বরিশালে কতটি ব্যাটারিচালিত যান চলাচল করছে, কতটি অনুমোদিত, কতটি চার্জিং গ্যারেজ রয়েছে এবং সেগুলোর কতটি বৈধ—এসব তথ্যই যদি নির্ভরযোগ্যভাবে না থাকে, তাহলে কার্যকর পরিকল্পনা করা কঠিন।

একদিকে যাতায়াতের সুবিধা, অন্যদিকে বড় চাপ

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা নগরের সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এসব যান বন্ধ করে দিলে হঠাৎ করে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তাই সমাধান হিসেবে শুধু যানবাহন বন্ধ করার চিন্তা যথেষ্ট নয়। বরং কতটি যান প্রয়োজন, কোন এলাকায় চলবে, চালকদের কী প্রশিক্ষণ লাগবে, অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হবে এবং কোথায় বৈধভাবে চার্জ দেওয়া হবে—এসব বিষয় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন তৈরি করে সেখানে বাণিজ্যিক মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে অবৈধ সংযোগের সুযোগ কমতে পারে।

একই সঙ্গে বাসাবাড়ির আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া বন্ধ করাও জরুরি।

হিসাবের বাইরে আরও বড় হতে পারে ব্যয়

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ৭০ হাজার ব্যাটারিচালিত যান প্রতিদিন একবার করে চার্জ নিলে প্রায় ৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে এর মূল্য প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

কিন্তু বাস্তবে অনেক চালক দিনে দুইবার চার্জ দেন। ফলে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার এই হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে।

এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশের অনুমান করা ৭০ হাজার যানবাহনের সংখ্যাটিও চূড়ান্ত নয়। প্রকৃত সংখ্যা আরও কম বা বেশি হতে পারে।

তাই অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ না হলে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং এর আর্থিক মূল্য নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

তবু বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া হিসাব থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—বরিশাল নগরে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চার্জ দিতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে।

দরকার সমন্বিত উদ্যোগ

বরিশাল নগরের পরিবহন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ কমাতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

প্রথমে নগরে মোট কতটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা চলছে, তার সঠিক হিসাব তৈরি করা দরকার। এরপর বৈধ ও অবৈধ যান আলাদা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

চার্জিং গ্যারেজগুলোরও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। কোন গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে, কোথায় আবাসিক সংযোগ ব্যবহার হচ্ছে এবং কোথাও অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।

একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেলে শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই হবে না; অভিযোগের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কারণ ব্যাটারিচালিত যান এখন বরিশাল নগরের বাস্তবতা। তাই এ খাতকে পুরোপুরি অস্বীকার না করে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা দরকার।

সঠিক হিসাব, বৈধ চার্জিং ব্যবস্থা, অনুমোদিত যান, প্রশিক্ষিত চালক এবং কঠোর নজরদারি—এই কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে একদিকে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধা বজায় থাকবে, অন্যদিকে বিদ্যুতের অপচয় ও অবৈধ ব্যবহারও কমানো সম্ভব হবে।

বরিশাল নগরে প্রতিদিন কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে ব্যাটারিচালিত যান চার্জ দিতে—এমন হিসাবই দেখিয়ে দিচ্ছে, বিষয়টি আর ছোট কোনো সমস্যা নয়। এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ।