পেটের সুস্থতা ও ভালো হজমের জন্য প্রতিদিন মেনে চলুন ৫টি অভ্যাস

অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও মানসিক চাপে বাড়ছে হজমের সমস্যা; খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, পর্যাপ্ত পানি পান ও নিয়মিত হাঁটাচলায় মিলতে পারে স্বস্তি
ডেস্ক রিপোর্ট
সুস্থ থাকতে হলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গের যত্ন নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে হজমতন্ত্র ও অন্ত্রের সুস্থতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে হজমতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে অনেকেই হজমের সমস্যায় ভোগেন।
কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা, গ্যাস, বুকজ্বালা ও বদহজমের মতো সমস্যা এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কারও কারও ক্ষেত্রে এসব সমস্যা মাঝেমধ্যে দেখা দিলেও অনেকের জন্য তা দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেই মনে করেন, বয়স বাড়ার কারণেই হজমশক্তি কমে যায়। তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়। বয়সের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, দৈনন্দিন কাজের ধরন, শারীরিক সক্রিয়তা, মানসিক অবস্থা এবং কিছু ওষুধের প্রভাবও হজমের সমস্যার জন্য দায়ী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হজমতন্ত্র ভালো রাখতে প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিছু সহজ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নিয়মিত পানি পান, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, হাঁটাচলা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মতো অভ্যাস অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সব সময় জটিল চিকিৎসা বা ব্যয়বহুল খাবারের প্রয়োজন হয় না। বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাসই হজমের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
জেনে নেওয়া যাক হজমশক্তি ভালো রাখতে প্রতিদিন কোন পাঁচটি অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
১. ওষুধ গ্রহণে সতর্ক থাকুন, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানুন
অনেক সময় আমরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার জন্য নিয়মিত ওষুধ খাই। কিন্তু কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিষয়টি অনেকেরই জানা থাকে না।
কিছু ব্যথানাশক ওষুধ, বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ এবং রক্ত পাতলা করার কিছু ওষুধের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। আবার অ্যান্টিবায়োটিক ও কিছু অম্লনাশক ওষুধ গ্রহণের পর ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শুধু ওষুধ নয়, বিভিন্ন খাদ্যসম্পূরক গ্রহণের কারণেও হজমে সমস্যা হতে পারে। যেমন অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মাছের তেলের সম্পূরক গ্রহণে কারও কারও পেট ফাঁপা, গ্যাস বা পাতলা পায়খানা হতে পারে।
অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বিভিন্ন ভিটামিন, ক্যালসিয়াম বা অন্যান্য সম্পূরক গ্রহণ করেন। কিন্তু এসব উপাদান সবার শরীরে একইভাবে কাজ করে না। কারও ক্ষেত্রে উপকার হলেও অন্য কারও ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
তাই নতুন কোনো ওষুধ বা খাদ্যসম্পূরক গ্রহণের পর পেটে অস্বস্তি, গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা ডায়রিয়া দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ওষুধের ধরন বা মাত্রা পরিবর্তনের বিষয়ে পরামর্শ নিতে হবে। তবে নিজের সিদ্ধান্তে কোনো নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়। কারণ, এতে মূল রোগের চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে।
২. মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত গভীর শ্বাসের অনুশীলন করুন
মানসিক চাপ শুধু মস্তিষ্ক বা মনকে প্রভাবিত করে না, এর প্রভাব পড়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও। বিশেষ করে হজমতন্ত্রের সঙ্গে মস্তিষ্কের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের সংযোগ বা ‘গাট-ব্রেইন কানেকশন’ বলা হয়।
এ কারণে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা মানসিক চাপে অনেকের পেটে অস্বস্তি দেখা দেয়। কারও গ্যাস হয়, কারও বদহজম হয়, আবার কারও কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাতলা পায়খানার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকলে এসব সমস্যা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাঁরা কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তাঁদের হজমের সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকতে পারে।
তাই হজমতন্ত্র ভালো রাখতে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
এ ক্ষেত্রে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন সহজ একটি পদ্ধতি। প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় নিয়ে এই অনুশীলন করা যেতে পারে।
যেভাবে করবেন:
- নিরিবিলি ও আরামদায়ক জায়গায় বসুন।
- এক হাত পেটের ওপর রাখুন।
- নাক দিয়ে ধীরে তিন থেকে ছয় পর্যন্ত গুনে শ্বাস নিন।
- শ্বাস নেওয়ার সময় পেট স্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হতে দিন।
- এরপর মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন।
- এভাবে কয়েক মিনিট অনুশীলন চালিয়ে যান।
প্রতিদিন পাঁচ থেকে ১৫ মিনিট এই অনুশীলন করলে মন শান্ত হতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, অবসর সময়ে পছন্দের কাজ করা এবং পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
৩. প্রতিদিনের খাবারে আঁশযুক্ত উপাদান রাখুন
হজমতন্ত্র সুস্থ রাখতে খাদ্যআঁশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে আঁশযুক্ত খাবার উপকারী।
খাদ্যআঁশ মূলত উদ্ভিজ্জ খাবারে পাওয়া যায়। এটি খাবার হজমের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে এবং মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি অন্ত্রে বসবাসকারী উপকারী অণুজীবের জন্যও খাদ্যআঁশ গুরুত্বপূর্ণ।
যাঁদের খাবারে আঁশের পরিমাণ কম, তাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্যসহ বিভিন্ন হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার রাখা জরুরি।
যেসব খাবারে বেশি আঁশ পাওয়া যায়:
- শাকসবজি, যেমন পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক ও অন্যান্য সবুজ শাক।
- ফলমূল, যেমন পেয়ারা, আপেল, কমলা, পেঁপে ও নাশপাতি।
- ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার।
- ওটস ও অন্যান্য পূর্ণশস্য।
- লাল চাল, লাল আটা ও আটার রুটি।
প্রতিদিনের খাবারে সাদা চাল ও ময়দার পাশাপাশি লাল চাল, লাল আটা এবং অন্যান্য পূর্ণশস্য রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে।
তবে হঠাৎ করে খাদ্যতালিকায় অনেক বেশি আঁশ যোগ করা উচিত নয়। এতে কারও কারও পেটে গ্যাস, ফাঁপা ভাব বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ বাড়ানো ভালো।
এ ছাড়া আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। কারণ, পানি ছাড়া খাদ্যআঁশের উপকার পুরোপুরি পাওয়া কঠিন।
৪. প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন
হজমতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পানির প্রয়োজনীয়তা অনেক। শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে।
আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা হজম ও পুষ্টি উপাদান শোষণের বিভিন্ন ধাপে পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে অন্ত্রে মল নরম রাখতে পানির প্রয়োজন হয়।
শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে মল শক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে মলত্যাগে সমস্যা হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি বাড়ে।
যাঁরা প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার খান, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খাদ্যআঁশ পানি শোষণ করে মলের পরিমাণ ও গঠন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
তাই শুধু খাবারে আঁশ বাড়ালেই হবে না, শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পানি পান করতে হবে।
পানি পানের অভ্যাস গড়ে তুলতে যা করবেন:
- ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস পানি পান করুন।
- দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে পানি পান করুন।
- খাবারের সঙ্গে এবং খাবারের মাঝের সময়ে পানি পান করুন।
- বাইরে বের হলে সঙ্গে পানির বোতল রাখুন।
- অতিরিক্ত গরম বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় পানির চাহিদার দিকে নজর দিন।
তবে সবার পানির চাহিদা এক নয়। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর পানির প্রয়োজন নির্ভর করে। যাঁদের কিডনি বা হৃদ্রোগের কারণে চিকিৎসক পানি পানের পরিমাণ সীমিত করে দিয়েছেন, তাঁদের চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
৫. প্রতিদিন হাঁটুন, দীর্ঘ সময় বসে থাকা কমান
সুস্থ হজমতন্ত্রের জন্য শরীরকে সচল রাখা জরুরি। কিন্তু আধুনিক জীবনযাপনে অনেকেই দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন। অফিস, ব্যবসা কিংবা বাড়িতে টানা বসে থাকার কারণে শারীরিক পরিশ্রম কমে যায়।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যসহ বিভিন্ন হজমের সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
এ সমস্যা এড়াতে প্রতিদিন হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। হাঁটা এমন একটি সহজ ব্যায়াম, যা প্রায় সব বয়সের মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করতে পারেন।
নিয়মিত হাঁটলে শরীর সচল থাকে এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও সহায়তা পাওয়া যায়। বিশেষ করে খাবারের পর হালকা হাঁটাচলা অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।
হজমশক্তি ভালো রাখতে শুধু হাঁটাই নয়, অন্যান্য হালকা ব্যায়ামও করা যেতে পারে। যেমন যোগব্যায়াম ও তাই চি। এসব ব্যায়াম শরীরের নমনীয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিনের চলাফেরায় যে অভ্যাসগুলো রাখবেন:
- প্রতিদিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটুন।
- দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করুন।
- লিফটের পরিবর্তে সম্ভব হলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।
- খাবারের পর কিছুক্ষণ হালকা হাঁটুন।
- সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস বজায় রাখুন।
যাঁরা আগে নিয়মিত ব্যায়াম করেননি, তাঁরা অল্প সময় হাঁটা দিয়ে শুরু করতে পারেন। পরে ধীরে ধীরে সময় ও হাঁটার পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।
হজমের সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিবর্তন আনলে অনেক ক্ষেত্রে হজমের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা সম্ভব। তবে সব ধরনের হজমের সমস্যা শুধু জীবনযাপনের পরিবর্তনে দূর হয় না।
কোষ্ঠকাঠিন্য, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, বারবার পেটব্যথা, অস্বাভাবিক পেট ফাঁপা কিংবা খাবার হজমে দীর্ঘদিন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বমির মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়।
মনে রাখতে হবে, সুস্থ হজমতন্ত্র এক দিনে তৈরি হয় না। এর জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ছোট ছোট এসব অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে মেনে চলতে পারলে হজমের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং পেটের নানা সমস্যা থেকে দূরে থাকা সহজ হতে পারে।
তাই সুস্থ থাকতে আজ থেকেই নিজের খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের দিকে নজর দিন। কারণ, ভালো হজম শুধু পেটের স্বস্তিই নয়, সামগ্রিক সুস্থতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সূত্র: ইউনাইটেড হেলথকেয়ার