পায়রা বন্দরের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে আগ্রহী চীনা প্রতিষ্ঠান
চায়না এনার্জি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের আগ্রহ, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক; জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ
ডেস্ক রিপোর্ট
দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা বন্দরে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনের জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান চায়না এনার্জি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির একটি প্রতিনিধি দল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে পায়রা বন্দরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা, বিনিয়োগ এবং বন্দরের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা নিয়ে আলোচনা হয়।
রোববার সকালে রাজধানীর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, এমপি উপস্থিত ছিলেন। চায়না এনার্জি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের প্রতিনিধিরা তাঁদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
প্রতিনিধি দল জানায়, চীনে জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। শুধু চীনেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি খাতে কাজ করছে। বাংলাদেশেও তাদের কার্যক্রম রয়েছে। পায়রা বন্দরের সম্ভাবনা বিবেচনা করে সেখানে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে তারা আগ্রহী।
পায়রা বন্দরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা
বৈঠকে চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা পায়রা বন্দরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্দরের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়তা করা সম্ভব হতে পারে।
বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সমুদ্রবন্দরগুলোর গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা, পণ্য ওঠানামা, জাহাজ চলাচল এবং বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে পায়রা বন্দরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
চায়না এনার্জি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব সম্ভাবনা কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
বিনিয়োগের আগ্রহকে স্বাগত জানালেন প্রতিমন্ত্রী
চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান।
তিনি বলেন, পায়রা বন্দর দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। বন্দরের কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর অবকাঠামো উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। একই সঙ্গে বন্দরের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে আসছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীও অত্যন্ত আন্তরিক।
তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা এবং বিনিয়োগ এলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগ বাড়ে।
তবে যেকোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন, জাতীয় স্বার্থ এবং বিদ্যমান নীতিমালা বিবেচনায় রাখতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বন্দরের উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তায় গুরুত্ব
বৈঠকে পায়রা বন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পায়রা বন্দর দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা। তাই এ বন্দরের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তাঁর মতে, বন্দরের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি সবার আগে বিবেচনায় রাখতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইন, নীতিমালা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও গুরুত্বারোপ করেন, যেকোনো বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের সার্বিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা জরুরি। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বন্দরের নিরাপত্তা, কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজনীয় সরকারি বিধিবিধান মেনে চলতে হবে।
বিশেষ করে সমুদ্রবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় রাখা প্রয়োজন।
সম্প্রসারণের সঙ্গে বাড়ছে পায়রা বন্দরের গুরুত্ব
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত পায়রা বন্দর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরগুলোর একটি। দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বন্দরের অবকাঠামো ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পণ্য সংরক্ষণ এবং অন্যান্য সেবার চাহিদাও বাড়ছে। এসব কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব নতুন সম্ভাবনার বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে এর কারিগরি সম্ভাব্যতা, বিনিয়োগের পরিমাণ, জমির প্রাপ্যতা, উৎপাদন সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং আর্থিক দিকগুলো বিস্তারিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
রোববারের এ বৈঠকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে চায়না এনার্জি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের প্রতিনিধি দল তাদের অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের আগ্রহ তুলে ধরে। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী পায়রা বন্দরের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ চাহিদা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা জানান।
চীনা প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে পায়রা বন্দরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত বিনিয়োগ চুক্তি বা প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
সব মিলিয়ে পায়রা বন্দরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে চীনা প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ দেশের বন্দর অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। এখন প্রস্তাবটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক যাচাই এবং জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
