নেতৃত্বহীন মানবাধিকার কমিশন, ঝুলে আছে ২ হাজারের বেশি অভিযোগ
ডেস্ক রিপোর্ট :
মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিকার পাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কোনো নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে অভিযোগ জানিয়ে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার আশায় মানুষ এই প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। কিন্তু সেই কমিশনই এখন প্রায় চার মাস ধরে কার্যত নেতৃত্বহীন।
চেয়ারম্যান নেই, কমিশনারও নেই। ফলে নতুন করে যেসব অভিযোগ জমা পড়ছে, সেগুলোর তদন্ত, শুনানি বা নিষ্পত্তি—কোনোটিই করা যাচ্ছে না। অভিযোগগুলো গ্রহণ করে শুধু সারাংশ তৈরি ও নথিভুক্ত করে রাখা হচ্ছে। চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের পর এসব অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এমন অবস্থাতেই চলছে কমিশনের কার্যক্রম।
কমিশন সূত্র জানিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৮ থেকে ১০টি নতুন অভিযোগ জমা পড়ছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে নাগরিকদের অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের বিষয় জড়িত। কিন্তু নেতৃত্ব না থাকায় অভিযোগ পাওয়ার পর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই।
ফলে একদিকে নতুন অভিযোগ জমা হচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো অভিযোগের স্তূপও বড় হচ্ছে। তদন্ত ও শুনানি বন্ধ থাকায় ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে।
১,২৮৩ অভিযোগ অনিষ্পন্ন
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত জুন পর্যন্ত কমিশনে অনিষ্পন্ন অভিযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৩টি। এর মধ্যে ৭৪৫টি অভিযোগের ক্ষেত্রে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৬৯টি অভিযোগের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে এমন অভিযোগ রয়েছে ১৪৬টি। খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ১১৭টি এবং রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে ১১৩টি অভিযোগ এখনো কার্যত পড়ে আছে।
অর্থাৎ অভিযোগ জমা পড়ার পর সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত শুরু করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ডাকা, শুনানি করা কিংবা ভুক্তভোগীকে প্রতিকার দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম থেমে আছে।
এর বাইরে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে পাঠানো হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ অভিযোগ। এসব অভিযোগও বর্তমানে সিলগালা অবস্থায় রাখা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য না থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বড় একটি অংশ এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
অভিযোগ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ব্যবস্থা নেই
কমিশন সূত্র বলছে, বর্তমানে কোনো নাগরিক অভিযোগ নিয়ে এলে সেটি ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। অভিযোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এরপর অভিযোগের সারাংশ তৈরি করা হচ্ছে এবং তা নথিভুক্ত করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
কিন্তু এর পরের ধাপেই কার্যক্রম থেমে যাচ্ছে।
কারণ অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের প্রয়োজন। তারা না থাকায় অভিযোগের তদন্ত, শুনানি কিংবা প্রতিকার দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।
কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের পর জমা থাকা অভিযোগগুলো তাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। তখন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
এর অর্থ হলো, বর্তমানে অভিযোগ জমা পড়লেও ভুক্তভোগীদের দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই। নতুন কমিশন গঠনের পরই মূল কাজ শুরু হতে পারে।
একটি অভিযোগের পেছনে থাকে একজন মানুষের কষ্ট
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, একটি অভিযোগকে শুধু একটি কাগজ বা একটি ফাইল হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায় না। প্রতিটি অভিযোগের পেছনে একজন মানুষ এবং তার জীবনের একটি গুরুতর সমস্যা থাকতে পারে।
কেউ হয়তো অন্যায়ভাবে আটক হওয়ার অভিযোগ করেছেন। কেউ হয়তো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কারও জমি বা সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। আবার কেউ হয়তো রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্যায় আচরণের শিকার হয়ে প্রতিকার চেয়েছেন।
ফলে একটি অভিযোগ দীর্ঘদিন ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকা মানে শুধু প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এর সঙ্গে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার সময়ও পিছিয়ে যায়।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো সময়েই কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা উচিত নয়।
তাদের মতে, দ্রুত কমিশনের বর্তমান জটিলতা দূর করে নতুন কমিশন গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে শুধু পদ পূরণ করলেই হবে না, কমিশনকে এমন ক্ষমতা দিতে হবে যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
বারবার বদলেছে আইন
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিক পরিবর্তন।
নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রতিকার দেওয়ার জন্য ২০০৯ সালে আইন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন এই আইনেই কমিশনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন বাতিল করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে।
নতুন অধ্যাদেশের ভিত্তিতে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি নতুন কমিশন গঠন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
তখন ধারণা করা হয়েছিল, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা হবে। কিন্তু পরিস্থিতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
পরবর্তীতে বর্তমান সরকার ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন আবার কার্যকর করে। ফলে অধ্যাদেশের অধীনে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান ও কমিশনের সব সদস্যকে পদ ছাড়তে হয়।
গত ৯ এপ্রিল চেয়ারম্যানসহ সব সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।
নেতৃত্ব না থাকায় থমকে গেছে কাজ
চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পদত্যাগ করার পর কমিশনের দাপ্তরিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কর্মকর্তারা নিয়মিত কাজ করছেন, অভিযোগ গ্রহণ করছেন এবং সেগুলো নথিভুক্ত করছেন।
কিন্তু কমিশনের মূল কাজের বড় অংশই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। চেয়ারম্যান ও সদস্য না থাকায় সেই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে শূন্যতা।
ফলে কর্মকর্তারা অভিযোগের সারাংশ তৈরি করতে পারলেও অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না। তদন্ত প্রয়োজন হলে তা এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। শুনানির আয়োজনও করা সম্ভব হচ্ছে না।
একইভাবে ভুক্তভোগীকে কোনো প্রতিকার দেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় কমিশনের কর্মকর্তাদের কাজ অনেকটা অভিযোগ সংরক্ষণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর জমা থাকা অভিযোগগুলো একে একে পর্যালোচনা করতে হবে।
নতুন আইন প্রক্রিয়ায়, কিন্তু কমিশন এখনো নেই
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার জন্য নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াও চলছে।
গত ১০ আগস্ট ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রস্তাবিত আইনে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে বেশ কিছু বিধান রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা ক্ষতি ঠেকাতে কমিশনকে অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব।
এ ধরনের ক্ষমতা থাকলে কোনো অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা মোকাবিলায় কমিশনের ভূমিকা আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে নতুন আইন তৈরির প্রক্রিয়া চললেও বর্তমান সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। কারণ আইন নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদনের পাশাপাশি কমিশনের নেতৃত্বও প্রয়োজন।
আইন প্রণয়ন শেষ হতে যত সময় লাগছে, ততদিন অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তিও আটকে থাকছে। ফলে ভুক্তভোগীদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
‘মানবাধিকার রক্ষার মেকানিজম নেই’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সরাসরি জবাব পাওয়ার যে ব্যবস্থা ছিল, সেটি এখন কার্যত নেই।
তার মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কাজ করার যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল, কমিশনের নেতৃত্ব না থাকায় সেটি কার্যকরভাবে কাজ করছে না।
তিনি বলেন, কোনো সময়েই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পদ খালি থাকা উচিত নয়। দ্রুত কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।
তবে শুধু চেয়ারম্যান বা কমিশনার নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মনে করেন তিনি। কমিশনকে কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা থাকে।
তার মতে, একটি কমিশন থাকলেই হবে না; সেই কমিশনকে কাজ করার মতো বাস্তব ক্ষমতাও দিতে হবে। তা না হলে প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে থাকলেও মানুষের জন্য কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
সপ্তাহে ৮ থেকে ১০টি নতুন অভিযোগ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব ও জেলা ও দায়রা জজ কুদরত-এ-ইলাহী কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে জানান, প্রতি সপ্তাহেই ৮ থেকে ১০টি নতুন অভিযোগ আসছে।
তিনি বলেন, চেয়ারম্যান বা কমিশনার কেউ না থাকায় ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।
তবে অভিযোগগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে কোনো অভিযোগ এলে তার সারাংশ তৈরি করা হচ্ছে এবং তা নথিভুক্ত করে রাখা হচ্ছে।
পরে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ হলে এসব অভিযোগ তাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। তখন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
অর্থাৎ কমিশনের প্রশাসনিক কাজ চলছে, কিন্তু অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ।
দ্রুত কমিশন গঠনের দাবি
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, রাষ্ট্রের অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেরও একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন। চেয়ারম্যান বা সদস্যদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন কমিশন গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত, যাতে কখনো প্রতিষ্ঠানটি নেতৃত্বশূন্য না হয়।
তাদের মতে, একজন নাগরিক যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কমিশনে আসেন, তখন তিনি দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার আশা করেন। কিন্তু অভিযোগ নেওয়ার পর যদি দীর্ঘদিন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ওই নাগরিকের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাও কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে গুম, নির্যাতন, বেআইনি আটক, নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের অধিকার কিংবা অন্য কোনো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা আরও গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই কমিশন গঠনের বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক বা আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে সরাসরি মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন জড়িত।
সংস্কারের লক্ষ্য যেন অচলাবস্থায় না থামে
গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু আইন পরিবর্তন, অধ্যাদেশ জারি ও বাতিল এবং পুরোনো আইন পুনর্বহালের ধারাবাহিকতায় কমিশন এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বই নেই।
সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় কমিশন নেতৃত্বহীন থাকলে সেই উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
নতুন আইন প্রণয়ন যেমন জরুরি, তেমনি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনও জরুরি। একই সঙ্গে নতুন কমিশনকে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ও ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তারা অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
অপেক্ষায় ভুক্তভোগীরা
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে জমা থাকা প্রতিটি অভিযোগের সঙ্গে একজন নাগরিকের প্রত্যাশা জড়িয়ে আছে। কেউ চান অন্যায়ের প্রতিকার, কেউ চান নিরাপত্তা, কেউ চান নিজের অধিকার ফিরে পেতে।
কিন্তু চেয়ারম্যান ও সদস্য না থাকায় বর্তমানে এসব অভিযোগের বড় অংশ শুধু ফাইল ও নথির মধ্যে আটকে আছে। প্রতি সপ্তাহে নতুন অভিযোগ যোগ হচ্ছে। পুরোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি হচ্ছে না। গুম-সংক্রান্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ অভিযোগও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
এ অবস্থার দ্রুত অবসান না হলে অভিযোগের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের সামনে বিপুলসংখ্যক পুরোনো অভিযোগের চাপ তৈরি হবে।
তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কমিশনের নেতৃত্ব নির্ধারণ, নতুন আইন প্রণয়ন এবং কমিশনের কার্যকর ক্ষমতা নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে জরুরি।
মানবাধিকার রক্ষার জন্য একটি কমিশন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই কমিশন যেন প্রয়োজনের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। অভিযোগ গ্রহণ করে ফাইলবন্দি করে রাখার প্রতিষ্ঠান নয়, নাগরিকের অধিকার রক্ষা ও প্রতিকার নিশ্চিত করার মতো কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেখতে হবে। নেতৃত্বহীনতার বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত অবসান ঘটানো তাই সময়ের দাবি।
