নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে স্বামী বলেছিলেন, ‘বোনকে নিয়ে যাও’—দুই দিন পর মিলল মুক্তার লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’

মুঠোফোনে বোন মুক্তা ইসলামকে নির্যাতনের একটি ভিডিও পাঠিয়ে ভাই তানভীর রহমানকে এ কথাই লিখেছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি সোহেল শিকদার। প্রায় তিন মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল পরানো। তাঁকে খাটের সঙ্গে বেঁধে চামড়ার বেল্ট দিয়ে মারধর করছেন সোহেল।

নির্যাতনের সময় পাশের কক্ষে কাঁদছিল মুক্তার দুই সন্তান। সন্তানদের কান্না শুনে স্বামীকে মারধর বন্ধ করতে অনুরোধ করেছিলেন মুক্তা। বলেছিলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’

কিন্তু সেই নির্যাতনের দুই দিন পরই মুক্তার মৃত্যুর খবর পান তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলক্ষেতের একটি বাসা থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে তাঁর লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় মুক্তার ছোট ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারকে। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশের হেফাজতে থাকা সোহেলের মুঠোফোন থেকেও মুক্তাকে নির্যাতনের ওই ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নির্যাতনের কারণেই মুক্তার মৃত্যু হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।


পায়ে শিকল, খাটের সঙ্গে বাঁধা মুক্তা

পুলিশের হাতে আসা প্রায় তিন মিনিটের ভিডিওতে মুক্তার ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের দৃশ্য দেখা গেছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার দুই পা শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বাঁধা। তিনি খাটের ওপর পড়ে আছেন। তাঁর স্বামী সোহেল শিকদার হাতে থাকা চামড়ার বেল্ট দিয়ে তাঁকে বারবার আঘাত করছেন।

নির্যাতনের সময় সোহেলকে বলতে শোনা যায়, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’

এর জবাবে মুক্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’

ভিডিওতে মুক্তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্নও দেখা যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, নির্যাতনের সময় পাশের কক্ষে ছিলেন মুক্তার দুই সন্তান। তাদের কান্নার শব্দও ভিডিওতে শোনা যায়।

সন্তানদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে অনুরোধ করেন, তাঁকে মারধর করা হলেও যেন আগে সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে আসতে দেওয়া হয়।

এই ভিডিওই এখন মুক্তার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে দেখছে পুলিশ।


ভাইকে ভিডিও পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘বোনকে নিয়ে যাও’

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর মুক্তাকে মারধরের ভিডিও তাঁর ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠান সোহেল শিকদার।

ভিডিও পাঠানোর সঙ্গে তিনি তানভীরকে তাঁর বোনকে নিয়ে যেতে বলেন।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভিডিও পাওয়ার পর তাঁরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু এর মাত্র দুই দিন পরই মুক্তার মৃত্যুর খবর তাঁদের কাছে আসে।

স্বজনেরা খিলক্ষেতের বাসায় গিয়ে মুক্তাকে আর জীবিত অবস্থায় পাননি।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর সোহেলের মুঠোফোন জব্দ করা হয়। ওই ফোন পরীক্ষা করে মুক্তাকে নির্যাতনের ভিডিওটি পাওয়া গেছে।

ভিডিওটি কখন ধারণ করা হয়েছিল, কী কারণে মুক্তাকে এভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং ভিডিও পাঠানোর পর কী ঘটেছিল—এসব বিষয় এখন তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।

তদন্তকারীরা মুক্তার মৃত্যুর আগে ও পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও খতিয়ে দেখছেন।


খিলক্ষেতের বাসায় ঝুলন্ত লাশ

মুক্তার মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে।

গত বৃহস্পতিবার ওই বাসা থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরিবারের অভিযোগ, মুক্তাকে নির্যাতন করার পর হত্যা করা হয়েছে। পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে তাঁর লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

তবে পুলিশের তদন্তে এখনো এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।

খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজীব ভৌমিক জানিয়েছেন, মুক্তার মৃত্যুর দুই দিন আগে তাঁকে মারধর করা হয়েছিল—এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তবে সেই মারধরের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

তিনি বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

অন্যদিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল দাবি করেছেন, মুক্তা নিজেই ফাঁস নিয়ে মারা গেছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোহেলের এই দাবি এবং পরিবারের অভিযোগ—দুই বিষয়ই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।


টাকার জন্যও নির্যাতনের অভিযোগ

মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, টাকা-পয়সা নিয়েও তাঁর ওপর নির্যাতন করতেন সোহেল।

পুলিশ পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে, কয়েক মাস আগে মুক্তার ভাই তানভীরের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় মুক্তাকে মারধর করা হতো বলে অভিযোগ পরিবারের।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকেই সোহেল ও মুক্তার মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে কলহ চলছিল।

তাঁদের অভিযোগ, মুক্তার স্বামী তাঁকে যৌতুকের জন্য চাপ দিতেন। পাশাপাশি মুক্তার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে—এমন সন্দেহ থেকেও তাঁকে নির্যাতন করা হতো বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।

তবে এসব নির্যাতনের কথা মুক্তা পরিবারের সদস্যদের খুব বেশি জানাতেন না।

স্বজনেরা বলছেন, সংসারে নানা সমস্যা থাকলেও মুক্তা সেগুলো অনেক সময় নিজের মধ্যেই রাখতেন। ফলে তাঁর ওপর কতটা নির্যাতন চলছিল, তা পরিবারের লোকজন পুরোপুরি জানতে পারেননি।

মৃত্যুর আগে তাঁকে যেভাবে মারধর করা হয়েছে, তার ভিডিও পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিষয়টির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারেন।


ব্যবসায় লোকসানের পর বাড়ে দাম্পত্য কলহ

মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার বাসিন্দা সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়।

বিয়ের পর স্বামীকে নিয়ে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় বসবাস করতেন মুক্তা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোহেল প্রথমে মুদিদোকান করতেন। পরে তিনি এমব্রয়ডারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।

তবে ব্যবসায় ভালো করতে না পারায় সংসারে আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্যও বাড়তে থাকে বলে জানিয়েছেন মুক্তার পরিবারের সদস্যরা।

টাকার প্রয়োজন, সংসারের বিভিন্ন বিষয় এবং পারস্পরিক সন্দেহকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো বলে পরিবার জানিয়েছে।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায় বলে তাঁদের অভিযোগ।

তবে এসব বিষয়ে সোহেলের বক্তব্য এখনো বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়নি। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং তাঁর বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।


মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, খতিয়ে দেখছে পুলিশ

মুক্তার মৃত্যুর আগের কয়েকটি দিন এখন তদন্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

১ সেপ্টেম্বর মুক্তাকে নির্যাতনের ভিডিও তাঁর ভাইয়ের কাছে পাঠান সোহেল। এরপর ২ সেপ্টেম্বর কী ঘটেছিল, মুক্তা কোথায় ছিলেন, তাঁর সঙ্গে কারা ছিলেন এবং কী পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

মুক্তাকে নির্যাতনের ভিডিওতে যে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে, সেগুলোর সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

এ ছাড়া মৃত্যুর আগে মুক্তার সঙ্গে কারও ফোনে কথা হয়েছিল কি না, তাঁর মুঠোফোনে কী ধরনের তথ্য রয়েছে এবং ঘটনার সময় বাসায় কারা ছিলেন—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে মুক্তার মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা—চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


‘মারবা ঠিক আছে, বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’

মুক্তাকে নির্যাতনের ভিডিওতে তাঁর দুই সন্তানের কান্নার শব্দ শোনা যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সন্তানদের কান্না থামাতে মুক্তা স্বামীর কাছে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁকে মারধর করা হলেও আগে যেন দুই সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে আসতে দেওয়া হয়।

মায়ের ওপর নির্যাতনের সময় সন্তানরা পাশের কক্ষে ছিল—এই তথ্যটি ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, মুক্তা তাঁর সন্তানদের নিয়ে সব সময় চিন্তিত থাকতেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতেন।

নির্যাতনের ভিডিওতে নিজের ওপর চলা আঘাতের মধ্যেও সন্তানদের কথা বলছিলেন তিনি।

এখন তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ওই সময় বাসার অন্য কোনো কক্ষে আর কেউ ছিলেন কি না এবং নির্যাতনের পুরো ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল।

ভিডিওতে যা দেখা গেছে, তার বাইরেও কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা জানতে পুলিশ সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলবে বলে জানিয়েছে।


স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার সোহেল

মুক্তার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই তানভীর রহমান খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারকে। মামলার পর পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।

সোহেলের কাছ থেকে মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। ওই ফোনেই মুক্তাকে নির্যাতনের ভিডিও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজীব ভৌমিক বলেছেন, ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

মুক্তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল, আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা হবে।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘মৃত্যুর দুই দিন আগে মুক্তাকে মারধরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে মারধরের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

তিনি আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল দাবি করেছেন, মুক্তা নিজেই ফাঁস নিয়েছেন।


পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে পুলিশের তদন্ত

মুক্তার পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু বা আত্মহত্যা নয়। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং পরে তাঁর লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সোহেল পুলিশের কাছে মুক্তার আত্মহত্যার দাবি করেছেন।

এই দুই বক্তব্যের মধ্যে কোনটি সত্য, সেটি এখন তদন্তের বিষয়।

মুক্তাকে নির্যাতনের ভিডিও পাওয়ায় ঘটনাটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। ভিডিওতে নির্যাতনের দৃশ্য থাকলেও সেটি সরাসরি মুক্তার মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করে কি না, তা চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ময়নাতদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

পুলিশও এ কারণে এখনই মৃত্যুকে হত্যা হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করছে না।

তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামলাটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।


আরও যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ

মুক্তার মৃত্যুর ঘটনায় বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

নির্যাতনের ভিডিও কেন ধারণ করা হয়েছিল? ভিডিওটি মুক্তার ভাইয়ের কাছে পাঠানোর উদ্দেশ্য কী ছিল? ভিডিও পাঠানোর পর মুক্তার সঙ্গে কী ঘটেছিল? তাঁকে কে বা কারা হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল কি না? মৃত্যুর সময় বাসায় কারা ছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া মুক্তার শরীরে যে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, সেগুলো কতটা পুরোনো এবং কতটা নতুন—এটিও ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসা পরীক্ষায় জানা যেতে পারে।

মুক্তার মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারও ফোনে যোগাযোগ হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পুলিশ বলছে, সব তথ্য একসঙ্গে যাচাই করেই ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করা হবে।


দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ

মুক্তার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর দুই সন্তান এখন মাকে হারিয়েছে। অথচ মায়ের ওপর নির্যাতনের সময় তারা পাশের কক্ষে ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ঘটনাটি তাঁদের ওপর কী ধরনের মানসিক প্রভাব ফেলেছে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের জন্যও এটি বড় ধাক্কা। একদিকে তাঁরা মুক্তার মৃত্যুর কারণ জানতে চাইছেন, অন্যদিকে তাঁর দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁদের ভাবতে হচ্ছে।

মুক্তার স্বজনেরা চান, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক। তাঁদের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


তদন্তের ফলেই বের হবে মৃত্যুর আসল কারণ

মুক্তা ইসলামের মৃত্যুকে ঘিরে এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে তাঁর ওপর গুরুতর নির্যাতনের প্রমাণ মিলেছে। নির্যাতনের ভিডিও পুলিশ উদ্ধার করেছে। সেই ভিডিওতে তাঁকে শিকল দিয়ে বেঁধে বেল্ট দিয়ে মারধরের দৃশ্য রয়েছে।

ভিডিওটি তাঁর ভাইকে পাঠিয়ে তাঁকে ‘বোনকে নিয়ে যাও’ বলেছিলেন সোহেল—এ তথ্যও পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

এর দুই দিন পর মুক্তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

পরিবারের দাবি, নির্যাতনের পর তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বামী সোহেল দাবি করেছেন, মুক্তা নিজেই ফাঁস নিয়ে মারা গেছেন।

এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের দাবিকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ঘোষণা করেনি পুলিশ।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, উদ্ধার হওয়া ভিডিও, মুঠোফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে।

খিলক্ষেত থানার তদন্ত কর্মকর্তা রাজীব ভৌমিক জানিয়েছেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। সোহেল শিকদারের বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একই সঙ্গে মুক্তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলবে পুলিশ।

মুক্তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—হত্যা, নাকি আত্মহত্যা—এই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলের ওপর নির্ভর করছে। তবে মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে তাঁর ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার ভিডিও ইতিমধ্যে পুলিশের হাতে এসেছে। সেই ভিডিওই এখন মামলার তদন্তে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে।