দেশভাগের ক্ষত, হারানো প্রেম আর স্মৃতির টান—‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ মিস করবেন না

বিনোদন ডেস্ক রিপোর্ট

৯৫ বছর বয়সী ইশার সিং গ্রেওয়ালের শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না। স্মৃতিও ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। কখনো তিনি বর্তমানের কথা বলেন, আবার হঠাৎ চলে যান বহু বছর আগের কোনো সময়ে। দিনের বেশির ভাগ সময় একটি কথাই বলতে থাকেন—‘আমাকে ওখানে যেতে হবে। একটা কাজ অর্ধেক রয়ে গেছে, সেটা শেষ করতে হবে।’

দুই ছেলে ইকবাল ও অঙ্গদ এবং পুত্রবধূ মেহের প্রথমে তাঁর এসব কথাকে বৃদ্ধ বয়সের প্রলাপ বলেই মনে করেন। কিন্তু পরে তাঁরা বুঝতে পারেন, এই কথাগুলোর পেছনে রয়েছে ৭৮ বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা একটি গল্প।

সেখান থেকেই শুরু হয় ইমতিয়াজ আলীর নতুন সিনেমা ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’। সিনেমাটিতে ইশার সিং গ্রেওয়ালের চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসিরউদ্দিন শাহ। নাতি নিভির চরিত্রে দেখা গেছে দিলজিৎ দোসাঞ্জকে। তরুণ বয়সের ইশার ওরফে কিনুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন বেদাং রায়না। আফসানার চরিত্রে রয়েছেন শর্বরী বাগ।

শুরুতে ছবিটি মনে হতে পারে একজন বৃদ্ধের স্মৃতি হারানোর গল্প। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই বোঝা যায়, এটি শুধু স্মৃতির গল্প নয়। এর ভেতরে আছে দেশভাগের ভয়াবহতা, হারিয়ে যাওয়া প্রেম, বাস্তুচ্যুতি, পারিবারিক গোপন ইতিহাস এবং কয়েক প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক গভীর মানসিক ক্ষত।

দাদার কথার রহস্য খুঁজতে নামে নাতি

ইশার সিং অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসে তাঁর নাতি নিভি। নিজের জীবনেও নানা সমস্যা রয়েছে তার। অভিবাসী জীবনের চাপ, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে নিভির জীবনও খুব সহজ নয়।

তবু দাদার দেখাশোনার দায়িত্ব নেয় সে।

দাদার মুখে বারবার একই কথা শুনতে শুনতে একসময় নিভির মনে প্রশ্ন জাগে—ইশার সিং আসলে কোথায় যেতে চাইছেন? কোন কাজটি তাঁর অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে?

বৃদ্ধের কথাগুলো কখনো অস্পষ্ট, কখনো এলোমেলো। কিন্তু নিভি সেগুলোকে অর্থহীন প্রলাপ হিসেবে উড়িয়ে দেয় না। বরং প্রতিটি শব্দের অর্থ খুঁজতে শুরু করে।

একটি নাম, একটি জায়গা, একটি পুরোনো স্মৃতি কিংবা কোনো অদ্ভুত বাক্য—সবকিছু জোড়া লাগিয়ে সে ধীরে ধীরে দাদার অতীতে পৌঁছাতে থাকে।

এভাবেই সামনে আসে একটি পুরোনো প্রেমের গল্প।

ফিরে যায় দেশভাগের আগের পাঞ্জাবে

গল্পের সময় তখন দেশভাগের আগের পাঞ্জাব।

তরুণ কিনু ছিল প্রাণবন্ত এক কিশোর। সেই সময় মুসলিম তরুণী আফসানার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয় ভালোবাসা।

চোখাচোখি, লুকিয়ে দেখা করা, ছোট ছোট কথা আর অপরিণত উর্দু কবিতা—সব মিলিয়ে তাদের প্রেম ছিল খুবই সরল ও নিষ্পাপ।

তাদের ভালোবাসায় বড় কোনো দাবি ছিল না। ছিল শুধু একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন।

কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত স্বপ্নের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় ইতিহাস।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ মানুষের জীবনকে রাতারাতি বদলে দেয়। বদলে যায় মানুষের পরিচয়, ঠিকানা, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ। যে মানুষটি একদিন প্রতিবেশী ছিল, পরদিনই সে হয়ে যায় অন্য দেশের মানুষ।

কিনু ও আফসানার প্রেমও সেই বিভাজনের সামনে এসে থেমে যায়।

একটি প্রতিশ্রুতি, ‘আমি ফিরে আসব’

দেশভাগের কারণে কিনুকে ভারত চলে আসতে হয়। আফসানাকে রেখে যাওয়ার সময় তাঁর কাছে দেওয়ার মতো ছিল না কোনো নিশ্চয়তা।

ছিল শুধু একটি প্রতিশ্রুতি—‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’, অর্থাৎ ‘আমি ফিরে আসব’।

এই ছোট্ট বাক্যটিই পরে কিনুর জীবনের সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে ওঠে।

সে ফিরে আসতে পারেনি। সময় চলে গেছে। দেশ বদলেছে। মানুষ বদলেছে। কিন্তু অতীতের সেই প্রতিশ্রুতি তাঁর ভেতরে থেকে গেছে।

বহু বছর পর বয়সের ভারে স্মৃতি যখন দুর্বল হয়ে আসে, তখন সেই চাপা পড়ে থাকা অতীতই আবার ফিরে আসে।

তাই ইশার সিংয়ের বারবার ‘ওখানে যেতে হবে’ বলা আসলে কোনো অসংলগ্ন কথা নয়। এর পেছনে রয়েছে তাঁর কৈশোর, প্রেম এবং হারিয়ে যাওয়া একটি জীবন।

ব্যক্তিগত প্রেম থেকে ইতিহাসের গল্প

‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’র সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।

প্রথমে মনে হয়, এটি একজন বৃদ্ধের হারানো প্রেম খুঁজে পাওয়ার গল্প। কিন্তু গল্প যত এগোয়, ততই দেশভাগের ভয়াবহতা সামনে আসে।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মানুষের ঘরছাড়া হওয়া, নারী নির্যাতন, লাশভর্তি ট্রেন, বিচ্ছিন্ন পরিবার—দেশভাগের সময়কার নানা ঘটনা ব্যক্তিগত গল্পটির সঙ্গে মিশে যায়।

কিনুর ব্যক্তিগত কষ্ট তখন আর শুধু তার নিজের কষ্ট থাকে না। চারপাশের অসংখ্য মানুষের দুঃখের সঙ্গে সেটি মিশে যায়।

যে তরুণ নিজের ভালোবাসা নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, ইতিহাসের নির্মমতা তাকে এক রাতের মধ্যে পরিণত করে দেয়।

নিজের প্রেম হারানোর পাশাপাশি সে দেখতে পায় অসংখ্য মানুষ কীভাবে ঘর, পরিবার ও পরিচয় হারাচ্ছে।

দেশভাগের যন্ত্রণা কীভাবে প্রজন্ম পেরোয়

সিনেমাটি শুধু দেশভাগের ঘটনা দেখায় না। বরং প্রশ্ন তোলে—সেই ঘটনার প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে?

কিনু তার অতীতকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। হয়তো বেঁচে থাকার জন্যই তাকে সেই স্মৃতি চাপা দিতে হয়েছিল।

জীবনের প্রথম ১৭ বছর যেন তাঁর জীবনের একটি বন্ধ দরজা হয়ে যায়। সেখানে ছিল তাঁর শৈশব, কৈশোর, প্রেম ও পুরোনো পরিচয়।

কিন্তু মানুষ যতই অতীত ভুলে থাকার চেষ্টা করুক, সব স্মৃতি কি সত্যিই মুছে যায়?

সিনেমাটি বলে, গভীর ক্ষতকে চাপা দিয়ে রাখা যায়, কিন্তু পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।

সেই ক্ষত কখনো আচরণে ফিরে আসে, কখনো সম্পর্কের মধ্যে, আবার কখনো স্মৃতিভ্রংশের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া কোনো কথার মধ্যে।

দূরত্ব তৈরি হয়েছিল নিজের পরিবারের সঙ্গেও

কিনুর পরবর্তী জীবনেও সেই অতীতের প্রভাব দেখা যায়।

তিনি নিজের সন্তানদের কাছ থেকেও যেন কিছুটা দূরে থাকেন। কেন তিনি এমন, তার উত্তর শুরুতে পাওয়া যায় না।

কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা যায়, নিজের অতীতকে মুছে ফেলতে গিয়ে তিনি নিজের আবেগের একটি অংশও হারিয়ে ফেলেছিলেন।

একটি মানুষ যখন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নিজের ভেতর আটকে রাখে, তখন তার প্রভাব বর্তমান সম্পর্কেও পড়ে।

এই জায়গাটিকে সিনেমাটি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।

দাদার অতীত খুঁজতে গিয়ে নিভি শুধু একটি প্রেমের গল্প খুঁজে পায় না। সে নিজের পরিবারেরও অনেক অজানা দিক জানতে পারে।

নাসিরউদ্দিন শাহ সিনেমার প্রাণ

ইশার সিংয়ের চরিত্রে নাসিরউদ্দিন শাহর অভিনয় ছবিটির অন্যতম বড় আকর্ষণ।

৯৫ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ, যিনি একই সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশে ভুগছেন এবং নিজের অতীতে ফিরে যাচ্ছেন—এই জটিল চরিত্রটি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন।

কখনো তাঁর চোখেমুখে শিশুসুলভ অসহায়ত্ব দেখা যায়। আবার কখনো মনে হয়, তিনি বহু বছর ধরে নিজের ভেতরে একটি গোপন কষ্ট বহন করে চলেছেন।

বাস্তবতা আর স্মৃতির মধ্যে তাঁর যে ওঠানামা, সেটিও অভিনয়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কখনো তিনি বর্তমানের মানুষ। আবার পরের মুহূর্তেই যেন ফিরে যান সেই তরুণ বয়সে, যখন তাঁর জীবনে আফসানা ছিল।

বিশেষ করে সিনেমার আবেগঘন শেষ অংশে নাসিরউদ্দিন শাহর অভিনয় দর্শকের মনে দীর্ঘ সময় থেকে যাবে।

মনে হয়, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন মানুষ তাঁর হারিয়ে যাওয়া পরিচয়, ভালোবাসা ও অসম্পূর্ণ কাজের কাছে ফিরে যেতে চাইছেন।

দিলজিৎ দোসাঞ্জও নজর কেড়েছেন

নিভির চরিত্রে দিলজিৎ দোসাঞ্জও ভালো অভিনয় করেছেন।

দাদার কথার রহস্য অনুসন্ধান করতে করতে তাঁর চরিত্রটি ধীরে ধীরে বদলে যায়। শুরুতে বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও পরে দাদার অতীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে।

একসময় সে বুঝতে পারে, দাদার কথাগুলোর পেছনে শুধু একজন বৃদ্ধের স্মৃতিভ্রংশ নেই। রয়েছে একটি পরিবারের চাপা ইতিহাস।

দিলজিৎ চরিত্রটির আবেগ ও দ্বন্দ্ব ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন।

ইমতিয়াজ আলীর আগের সিনেমা **‘অমর সিং চমকিলা’**তেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল। এই ছবিতেও তিনি নিজের অভিনয়ের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন।

তরুণ কিনু ও আফসানা

তরুণ কিনুর চরিত্রে বেদাং রায়না আন্তরিক অভিনয় করেছেন। তবে তাঁর অভিনয়ে সেই গভীরতা পুরোপুরি পাওয়া যায়নি, যা দর্শককে সহজেই বিশ্বাস করাবে যে এই তরুণই একদিন নাসিরউদ্দিন শাহর অভিনীত বৃদ্ধ ইশার সিংয়ে পরিণত হবে।

অন্যদিকে আফসানা চরিত্রে শর্বরী বাগ বেশ প্রাণবন্ত।

তাঁর হাসি, দুষ্টুমি, কথা বলার ধরন এবং উপস্থিতি পুরোনো দিনের প্রেমের আবহকে আরও জীবন্ত করে তোলে।

আফসানার চরিত্রে একদিকে যেমন নিষ্পাপ প্রেম আছে, অন্যদিকে আছে দেশভাগের ভয়াবহতার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একজন তরুণীর অসহায়ত্ব।

সম্পাদনায় সময়ের সঙ্গে খেলা

সিনেমাটির আরেকটি শক্তিশালী দিক সম্পাদনা।

সম্পাদক আরতি বাজাজ অতীত ও বর্তমানকে সরলভাবে আলাদা করে দেখাননি। বরং স্মৃতি, বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে গল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন।

বৃদ্ধ যখন কোনো পুরোনো স্মৃতির কথা বলেন, দর্শকও যেন তাঁর সঙ্গে সেই সময়ে চলে যায়।

আবার বর্তমানের দৃশ্যের মধ্যে হঠাৎ অতীত ঢুকে পড়ে। ফলে গল্পটি অনেকটা একজন স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষের মনের মতো এগোয়।

শুরুতে বিষয়টি কিছুটা জটিল মনে হলেও ধীরে ধীরে দর্শক গল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিতে পারেন।

এ আর রাহমানের সংগীত

সিনেমার আবহ তৈরিতে সংগীতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এ আর রাহমান বিভিন্ন অঞ্চল, সংস্কৃতি ও সংগীতের উপাদানকে একসঙ্গে ব্যবহার করে ছবির জন্য আলাদা একটি আবহ তৈরি করেছেন।

দেশভাগের আগের পাঞ্জাব, প্রেমের মুহূর্ত এবং বর্তমান সময়ের বিষণ্নতা—প্রতিটি জায়গায় সংগীত গল্পের আবেগকে আরও গভীর করেছে।

কিছু দৃশ্যে সংলাপের চেয়েও সংগীত বেশি কথা বলেছে।

কিছু জায়গায় দুর্বলতাও আছে

তবে সিনেমাটি পুরোপুরি নিখুঁত নয়।

কাবির চরিত্রের ব্যবহার, নাতির স্ট্যান্ডআপ কমেডির কিছু অংশ এবং তাঁর নিজের ইচ্ছায় বিদেশে যাওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে দাদার জোর করে দেশছাড়া হওয়ার তুলনা কিছুটা কৃত্রিম মনে হতে পারে।

গল্পের মূল আবেগের তুলনায় এসব অংশ কিছুটা আলাদা মনে হয়েছে।

তবে এই দুর্বলতাগুলো সিনেমার মূল শক্তিকে পুরোপুরি নষ্ট করতে পারেনি।

ইমতিয়াজ আলীর পুরোনো সিনেমার ছায়া

‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ দেখতে গিয়ে ইমতিয়াজ আলীর আগের সিনেমাগুলোর কথা মনে পড়তে পারে।

‘যব উই মেট’, ‘লাভ আজ কাল’, ‘রকস্টার’, ‘তামাশা’, ‘যব হ্যারি মেট সেজাল’ কিংবা ‘অমর সিং চমকিলা’—তাঁর আগের সিনেমাগুলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ছাপ এই ছবিতেও দেখা যায়।

কোথাও ভ্রমণ, কোথাও হারিয়ে যাওয়া পরিচয়, কোথাও প্রেম, আবার কোথাও অতীতের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—ইমতিয়াজের পরিচিত বিষয়গুলোই নতুনভাবে এসেছে।

তবে এবার তাঁর গল্প বলার ধরনে একটি বড় পরিবর্তন আছে।

আগের অনেক সিনেমায় প্রেম ছিল চরিত্রদের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা। কিন্তু এখানে প্রেমকে শুধু নিজেদের অনুভূতির সঙ্গে নয়, পুরো ইতিহাসের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে।

কোনো সম্প্রদায়কে একক খলনায়ক করা হয়নি

দেশভাগ নিয়ে তৈরি অনেক গল্পেই কোনো একটি সম্প্রদায়কে সরাসরি খলনায়ক হিসেবে দেখানোর প্রবণতা থাকে।

‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ সে পথে হাঁটেনি।

এখানে মূল খলনায়ক কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায় নয়। বরং সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, হিংসা এবং অমানবিক পরিস্থিতিকেই দায়ী করা হয়েছে।

এ কারণে গল্পটি শুধু হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের গল্প হয়ে ওঠেনি। এটি হয়ে উঠেছে মানুষের ঘর হারানোর, প্রিয়জন হারানোর এবং পরিচয় হারানোর গল্প।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—স্মৃতি কি লুকিয়ে রাখা যায়?

সিনেমাটি দর্শকের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রেখে যায়।

আগের প্রজন্ম কি ইচ্ছা করেই নিজেদের কষ্ট ও ভয়াবহ স্মৃতি পরের প্রজন্মের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল?

হয়তো তাঁরা ভেবেছিলেন, সন্তানদের এসব জানালে তারা কষ্ট পাবে। তাই ইতিহাসের কিছু অংশ চেপে গেছেন।

কিন্তু কোনো ঘটনা লুকিয়ে রাখলেই তার প্রভাব শেষ হয়ে যায় না।

বরং না বলা গল্প কখনো কখনো পরবর্তী প্রজন্মের ওপর আরও বড় প্রভাব ফেলে।

নিভি যখন দাদার পুরোনো স্মৃতির সন্ধান করতে শুরু করে, তখন সে শুধু একটি পরিবারের রহস্যই আবিষ্কার করে না। সে আবিষ্কার করে তার নিজের শিকড়ের একটি হারিয়ে যাওয়া অংশ।

প্রেমের গল্প, নাকি ইতিহাসের আয়না?

‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’কে শুধু প্রেমের সিনেমা বললে ছবিটির বড় অংশই বাদ পড়ে যাবে।

এটি একই সঙ্গে একটি প্রেমের গল্প, পারিবারিক গল্প, দেশভাগের গল্প এবং স্মৃতির গল্প।

একজন বৃদ্ধ তাঁর জীবনের শেষ সময়ে ফিরে যেতে চান সেই জায়গায়, যেখানে তাঁর শৈশব কেটেছে। সেখানে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর প্রথম প্রেম, হারিয়ে যাওয়া মানুষ এবং অসম্পূর্ণ একটি প্রতিশ্রুতি।

অন্যদিকে তাঁর নাতি সেই গল্প খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারে, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। ইতিহাস মানুষের জীবনেও বেঁচে থাকে।

কেন সিনেমাটি দেখা যেতে পারে

‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ তাঁদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যাঁরা দেশভাগের ইতিহাসকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে নয়, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে চান।

ছবিটি মনে করিয়ে দেয়, একটি সীমারেখা টেনে দিলেই মানুষের সম্পর্ক, স্মৃতি বা ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় না।

দেশভাগের সময় লাখ লাখ মানুষ ঘর হারিয়েছিল। কেউ হারিয়েছিল পরিবার, কেউ প্রিয়জন, কেউ নিজের শৈশব। সেই ক্ষতের অনেকটাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের ভেতরে রয়ে গেছে।

ইমতিয়াজ আলী সেই বিশাল ইতিহাসকে একটি পরিবারের গল্পের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন।

সবশেষে ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ দর্শককে একটি কথাই ভাবতে বাধ্য করে—মানুষ কি সত্যিই তার অতীত থেকে পালাতে পারে?

সম্ভবত পারে না।

কখনো সেই অতীত স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে, কখনো স্বপ্ন হয়ে, কখনো ভালোবাসার মানুষটির মুখ হয়ে। আর কখনো জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি মাত্র বাক্য—

‘আমাকে ওখানে যেতে হবে।’