দুই আলমাসের নামের মিল, এক বছর কারাভোগের পর মুক্তির নির্দেশ নিরপরাধ ব্যক্তিকে

২২ বছর আগের অস্ত্র মামলায় প্রকৃত আসামির বদলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আলমাস, তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে তিনি সাজাপ্রাপ্ত নন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুই যুগ আগের একটি অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল মো. আলমাছ নামের এক ব্যক্তির। কিন্তু সেই মামলায় প্রকৃত আসামির পরিবর্তে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে ছিলেন নিরপরাধ মো. আলমাস। নামের মিল এবং ঠিকানাসংক্রান্ত ভুলের কারণে তাঁকে এই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। অবশেষে আদালতের নির্দেশে মুক্তি পাচ্ছেন তিনি।

কারাগারে থাকা আলমাসকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রোববার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালত কারা কর্তৃপক্ষকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলেছেন।

তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, কারাগারে থাকা আলমাস ২০০২ সালের অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। ওই মামলার প্রকৃত আসামি মো. আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। ফলে অন্যের অপরাধে নিরপরাধ একজনকে দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হয়েছে।

নামের মিলেই শুরু বিপত্তি

ঘটনার সূত্রপাত দুই ব্যক্তির নামের মিল থেকে। অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম মো. আলমাছ। অন্যদিকে যাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল, তাঁর নাম মো. আলমাস। দুজনের বাবার নামেও কিছুটা মিল রয়েছে। এ ছাড়া তাঁদের গ্রামের ঠিকানা নিয়েও নথিপত্রে বিভ্রান্তি ছিল।

এসব কারণে প্রকৃত আসামিকে শনাক্ত না করেই আলমাসকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

কারাগারে থাকা আলমাস দাবি করেন, তিনি ওই অস্ত্র মামলার আসামি নন। নামের মিলের কারণে তাঁকে ভুলভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ এবং মুক্তির জন্য তিনি শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।

রিট আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং তিনি সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। তাঁর দাবি যাচাইয়ের জন্য আদালতের কাছে প্রয়োজনীয় তদন্তের আবেদন জানানো হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্ত

আলমাসের রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা আলমাস এবং অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশ দেন আদালত।

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে একজন জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালত আদেশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দিতে বলেন।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সেই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কারাগারে থাকা মো. আলমাস এবং অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছ সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।

তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ার পর রিট আবেদনটি রোববার আদেশের জন্য ওঠে। শুনানি শেষে হাইকোর্ট কারাগারে থাকা আলমাসকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন।

আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ ও আবদুল্লাহ আবু সাঈদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শিহাব উদ্দিন খান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ।

ভুল গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি কারণ

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আলমাসের পরিবর্তে আলমাছের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রথম কারণ, দুই ব্যক্তির গ্রামের ঠিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি। তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস ২০০৭ সালের আগে পরিবারের সঙ্গে ঢাকা জেলার দোহারের দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন। অন্যদিকে অস্ত্র মামলার প্রকৃত আসামি আলমাছের বাড়ি একই ডাকঘরের অধীন পূর্ব ধোয়াইর গ্রামে।

স্থানীয়ভাবে ঠিকানা পরিচয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় গ্রামের নামের পরিবর্তে ডাকঘরের নাম ব্যবহার করা হয়। ফলে দুই ব্যক্তির ঠিকানা একই বলে মনে হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তদন্তকারীদের মতে, এ বিষয়টি ভুল পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।

দ্বিতীয় কারণ, দুজনের বাবার নামের আংশিক মিল। প্রকৃত আসামি আলমাছের বাবার নাম মো. খলিলুর রহমান। তিনি খলিল নামেও পরিচিত। অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল। বাবার নামের এই সাদৃশ্যও দুই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে।

তৃতীয় কারণ, মামলার নথিতে ঠিকানা ভুল লেখা। ২০০২ সালে করা অস্ত্র মামলায় আসামি আলমাছের গ্রামের নাম পূর্ব ধোয়াইরের পরিবর্তে ভুল করে দক্ষিণ বাহ্রা লেখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মামলার বিভিন্ন নথিতেও সেই ভুল ঠিকানা থেকে যায়।

এমনকি মামলার রায়ের পর আলমাছের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও পূর্ব ধোয়াইরের পরিবর্তে দক্ষিণ বাহ্রা লেখা হয়। ফলে ওই পরোয়ানার ভিত্তিতে প্রকৃত আসামিকে শনাক্ত করতে গিয়ে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঠিকানা, বাবার নাম ও অন্যান্য তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হলে এ ধরনের ভুল এড়ানো সম্ভব হতো।

২০০২ সালের অস্ত্র মামলার ঘটনা

আদালতে জমা দেওয়া রিট আবেদন ও এর সঙ্গে সংযুক্ত নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মিরপুর থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা করে পুলিশ। মামলার আসামি ছিলেন মো. আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুন (২২)।

মামলার বিচার শেষে ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মো. আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য আসামি নাজমুল আলম মামুনকে খালাস দেওয়া হয়।

রায়ের সময় আলমাছ পলাতক ছিলেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। মামলার নথিতে তাঁর বর্তমান ঠিকানা হিসেবে মিরপুরের পাইকপাড়ার আহমেদনগরের কথা উল্লেখ ছিল।

এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

এক পরোয়ানায় গ্রেপ্তার আলমাস

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ মার্চের পরোয়ানার ভিত্তিতে পুলিশ মো. আলমাসকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বাবার নাম শেখ খলিল। গত বছরের ৫ নভেম্বর তাঁকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আদালতে হাজির করা হয়।

আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই কারাগারে ছিলেন আলমাস।

কিন্তু তিনি শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন, ওই মামলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃত আসামি অন্য একজন। শুধু নামের মিল ও ঠিকানার বিভ্রান্তির কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর তিনি আইনি সহায়তা নেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট তদন্তের নির্দেশ দেন। সেই তদন্তেই তাঁর দাবির সত্যতা পাওয়া যায়।

 গত ৪ অক্টোবর ‘নামের মিলে ১০ মাস ধরে কারাগারে, প্রকৃত আসামি কে তদন্তের নির্দেশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে আলমাসের ভুল গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

পরিচয় যাচাইয়ে অবহেলার প্রশ্ন

এই ঘটনা শুধু একজন নিরপরাধ মানুষের কারাভোগের বিষয় নয়; একই সঙ্গে গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাইয়ের গুরুত্বও সামনে এনেছে।

একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে শুধু নামের মিল থাকলেই যথেষ্ট নয়। বাবার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, বয়স, অন্যান্য পরিচয় এবং মামলার নথিতে থাকা তথ্যও ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকলে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

আলমাসের ঘটনায় দেখা গেছে, ঠিকানার ভুল এবং বাবার নামের আংশিক মিলের কারণে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসায় শেষ পর্যন্ত তাঁর মুক্তির পথ তৈরি হয়েছে।

হাইকোর্টের নির্দেশের ফলে এখন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন আলমাস। তবে প্রায় এক বছরের কারাভোগ এবং এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ভোগান্তি তাঁর জীবনে যে প্রভাব ফেলেছে, তা সহজে কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

নামের সামান্য পার্থক্য, ঠিকানার ভুল এবং যথাযথ যাচাইয়ের অভাব যে একজন মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে, আলমাসের ঘটনা তারই দুঃখজনক উদাহরণ। ভবিষ্যতে এমন ভুল এড়াতে গ্রেপ্তারের আগে আসামির পরিচয় ও মামলার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।