দক্ষ তরুণরাই গড়বে আগামীর বাংলাদেশ: সমাজকল্যাণমন্ত্রী

ডেস্ক রিপোর্ট

তরুণদের শিক্ষিত, দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে পারলে তারা শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো বিশ্বের সম্পদে পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।

বুধবার (১২ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের আলোকিতে সেভ দ্য চিলড্রেন আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক যুব দিবসের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, কাজের ধরন বদলাচ্ছে এবং নতুন নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে দেশের তরুণদের আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতায় প্রস্তুত করতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই হবে না। তরুণদের কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগও বাড়াতে হবে। এতে তারা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দেশে ও বিদেশে ভালো কাজের সুযোগ পাবে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে সবার অংশগ্রহণ

সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। তবে শুধু সরকারের উদ্যোগে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। আর তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো না গেলে দেশের জন্য তা বড় ধরনের অপচয় হবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য তরুণদের শুধু শিক্ষিত করলেই হবে না, তাদের দক্ষ ও কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে।’

তিনি সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বর্তমান শ্রমবাজারে বিভিন্ন ধরনের দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। সেই চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম সাজাতে হবে।

তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান

শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন তরুণ উদ্যোক্তা নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।

তিনি জানান, সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর অনেক তরুণের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় অর্থের অভাব। ব্যবসা শুরু করার মতো প্রয়োজনীয় মূলধন না থাকায় অনেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পান না।

এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, যেসব তরুণের ব্যবসা শুরু করার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই, তাদের সিড মানি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ ছাড়া উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহ দিতে বাজেটে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল রাখা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

মন্ত্রী বলেন, তরুণদের মধ্যে নতুন কিছু করার আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। এসব সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখতে পারবেন।

শ্রমবাজারের সঙ্গে মিল রেখে দক্ষতা

অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেন, শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করলেই তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে না। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, তা বুঝে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

তাঁরা বলেন, প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনের কারণে চাকরির বাজারেও দ্রুত পরিবর্তন আসছে। ফলে তরুণদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সমস্যা সমাধান ও দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

আলোচকরা তরুণদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, বিভিন্ন এলাকার, প্রতিষ্ঠান ও পেশার তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে। এতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পথও সহজ হবে।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, নেতৃত্বেও তরুণরা

অনুষ্ঠানে তরুণদের নিজেদের ভূমিকা আরও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়। তাঁরা শুধু শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, নেতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবেও নিজেদের প্রস্তুত করবেন—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বক্তারা।

তাঁদের মতে, দেশের নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, ব্যবসা, সামাজিক উন্নয়ন ও সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।

তরুণদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তরুণরা নিজেদের সক্ষমতা প্রকাশের সুযোগ পাবেন এবং দেশের উন্নয়নেও সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবেন।

উন্নয়নের অংশীদার তরুণ প্রজন্ম

সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়নে তরুণদের অংশগ্রহণ কোনো বিকল্প বিষয় নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। তরুণদের শক্তি, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারবে।

তিনি বলেন, সরকার তরুণদের জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়াতে কাজ করছে। তবে এসব উদ্যোগকে আরও কার্যকর করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং তরুণদের নিজেদেরও একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

মন্ত্রী তরুণদের উদ্দেশে বলেন, নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতাও তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, একটি মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানো জরুরি। তরুণদের সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পারলে তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন

আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত, নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের প্রথম সচিব জাওয়াদ আজাউই এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তূজা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, এনজিও, সুশীল সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা তৈরি, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বক্তারা তরুণদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তাঁদের মতে, বাংলাদেশের সামনে যে বড় জনমিতিক সুযোগ রয়েছে, তা কাজে লাগানোর এখনই সময়। তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই প্রজন্মই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।