ঢাকার বাতাসে বিষ, বাঁচতে চাই কার্যকর উদ্যোগ
বায়ুদূষণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি
রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দূষিত বাতাস এখন নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষণা অনুযায়ী, উত্তরার খালপাড় এলাকায় বাতাসে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৪৪ মাইক্রোগ্রাম, যা জাতীয় মানমাত্রার চার গুণেরও বেশি। অন্যদিকে, মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরের নিকুঞ্জ এলাকায় এই মাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রামের নিচে। অর্থাৎ ঢাকার একেক এলাকার বাতাসের মানে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য।
গবেষণায় রাজধানীর গণপরিবহনের অবস্থাও উঠে এসেছে। পরীক্ষা করা ১০টি বাসের মধ্যে আটটিই পরিবেশগত ও কাঠামোগত মানদণ্ডে ব্যর্থ হয়েছে। এসব বাসের চালক ও সহকারীদের কেবিনে বিষাক্ত ধোঁয়া প্রবেশ করে। অনেক বাসের ইঞ্জিন থেকে বের হয় কালো ধোঁয়া। নেই প্রয়োজনীয় ফিটনেস সনদ কিংবা চালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। কোনো বাসই ভালো মানের তালিকায় স্থান পায়নি। এটি গণপরিবহন খাতের দুর্বল তদারকি ও দায়িত্বহীনতার স্পষ্ট চিত্র।
বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছেন সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরাও। প্রতিদিন ধুলাবালু ও যানবাহনের কালো ধোঁয়ার মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষের জন্য দূষিত বাতাস আরও বিপজ্জনক।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের বাংলাদেশ পরিবেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণসহ বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে সৃষ্ট রোগে দেশে প্রতিবছর অন্তত ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকিউএয়ারের তালিকাতেও ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে থাকে। অপরিকল্পিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণকাজের ধুলা, খোলা জায়গায় মাটি ও বালু ফেলে রাখা এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন এই দূষণের অন্যতম কারণ।
এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদে সিটি করপোরেশনকে নিয়মিত সড়ক ও নির্মাণাধীন এলাকায় পানি ছিটাতে হবে। খোলা জায়গার মাটি ঢেকে রাখা এবং রাস্তার পাশে সবুজায়ন বাড়াতে হবে। নির্মাণসামগ্রী খোলা অবস্থায় রাখা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো ফিটনেসবিহীন ও অতিরিক্ত ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া। গণপরিবহনের মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরীক্ষা ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। শুধু নির্দেশনা বা অভিযান নয়, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকার বাতাস দূষণমুক্ত করা শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। উন্নয়ন ও নগরায়ণের নামে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে রাখা যায় না। তাই দায় এড়ানোর প্রবণতা বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরিষ্কার বাতাস কোনো বিলাসিতা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এখন প্রয়োজন প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ।
