টুকরো লাশের রহস্য বাড়ছে, মিলছে না পরিচয়

রাজধানীতে একের পর এক খণ্ডিত দেহ উদ্ধার; কোথাও মিলছে না স্বজনের সন্ধান, কোথাও অধরা খুনি

ডেস্ক রিপোর্ট :

রাজধানীর সবুজবাগে ময়লার স্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল পলিথিনে মোড়ানো একটি খণ্ডিত মাথা ও দুই হাত। ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো ওই তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁর শরীরের বাকি অংশেরও সন্ধান মেলেনি। ঘটনাস্থলে কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এর এক দিন পর কামরাঙ্গীরচরের শহীদনগর এলাকায় উদ্ধার হয় আরও দুটি খণ্ডিত হাত। পচন ধরায় সেগুলো থেকেও ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। হাত দুটি একই ব্যক্তির কি না, সেটিও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ফলে এই দুই ঘটনায় একদিকে যেমন নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় অজানা, অন্যদিকে হত্যার কারণ ও খুনিদের সম্পর্কেও কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই।

শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে হত্যার পর লাশ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। কোনো কোনো ঘটনার রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। আবার অনেক ঘটনায় পরিচয় ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত না পাওয়ায় তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে।

সবুজবাগে মাথা ও দুই হাত

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সবুজবাগের বাগানবাড়ি খালপাড় কালভার্টের নিচে ময়লার স্তূপে একটি পলিথিনের শপিং ব্যাগ দেখতে পান কয়েকজন পথচারী। ব্যাগের ভেতরে ছিল একটি খণ্ডিত মাথা। পরে পুলিশ তল্লাশি করে সেখান থেকে দুই হাতও উদ্ধার করে।

উদ্ধার করা খণ্ডিত অংশগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। মাথাটি দেখে তদন্তকারীদের ধারণা, ওই তরুণীকে অন্য কোথাও হত্যার পর লাশ টুকরো করা হয়েছে। পরে দেহের বিভিন্ন অংশ গোপন করার উদ্দেশ্যে সেখানে ফেলে রাখা হয়।

পরিচয় শনাক্তের জন্য ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। খণ্ডিত মাথার মুখমণ্ডলের ছবিও সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এসবের মাধ্যমে এখনো নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

ঘটনার চার দিন পরও লাশের অন্য অংশ পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকায় সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কামরাঙ্গীরচরেও মিলল খণ্ডিত হাত

সবুজবাগের ঘটনার পরদিন শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের শহীদনগর বউবাজারের বিপরীত পাশের একটি ঢাল থেকে দুটি খণ্ডিত হাত উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সেগুলোও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠায়। কিন্তু পচন ধরায় হাত থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল থেকেও এমন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি, যা দিয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

এমনকি উদ্ধার হওয়া দুটি হাত একই ব্যক্তির কি না, সেটিও নিশ্চিত নয় পুলিশ। যদি হাত দুটি ভিন্ন ব্যক্তির হয়, তাহলে তাঁদের পরিচয় কী এবং দেহের বাকি অংশ কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তরও এখনো পাওয়া যায়নি।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দুই ঘটনাতেই হত্যাকাণ্ড অন্য কোথাও ঘটতে পারে। পরে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে দেহের বিভিন্ন অংশ আলাদা করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের খোঁজ

দুই ঘটনায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট থানার পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় তথ্য পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত দেহের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায়নি।

ফলে তদন্তকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—প্রথমে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা। পরিচয় পাওয়া গেলে তাঁদের সাম্প্রতিক চলাফেরা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং কোথায় শেষবার দেখা গিয়েছিল—এসব তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।

থামছে না খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনা

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হত্যার পর লাশ টুকরো করে ফেলে দেওয়ার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করছে।

কিছু ঘটনায় দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে। পুলিশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারও করেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পরিচয়ই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তদন্ত শুরুর প্রথম ধাপেই বড় ধরনের বাধা তৈরি হচ্ছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল কুমিল্লার গৃহবধূ ফরিদা বেগম হত্যাকাণ্ড। গত শনিবার তাঁকে হত্যার পর লাশ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনা সামনে আসে। বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এর আগে গত মে মাসে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা ও লাশ খণ্ডিত করার অভিযোগের ঘটনাও দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শিশুটির হত্যার বিচার দাবিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে অংশ নেন।

আট টুকরো লাশ থেকে ২৬ টুকরো

রামিসা হত্যার আগের দিন রাজধানীর মুগদা-মান্ডা এলাকা থেকে মোকাররম মিয়া নামের এক প্রবাসীর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে তাঁর মস্তকবিহীন সাতটি অংশ পাওয়া যায়। পরে উদ্ধার করা হয় মাথা।

গত বছরের নভেম্বরেও রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ মাঠের সামনে থেকে রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনা আলোচনায় আসে। তাঁর লাশ ২৬ টুকরো করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের ঘটনায় হত্যার নৃশংসতার পাশাপাশি আরও একটি বিষয় সামনে আসে—হত্যার পর অপরাধীরা কীভাবে ঠাণ্ডা মাথায় লাশের অংশ বিভিন্ন জায়গায় ফেলে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে।

কেন বাড়ছে এমন নৃশংসতা

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলেন, মানুষের মধ্যে রাগ, ঘৃণা, হিংসা ও প্রতিশোধের মতো আবেগ থাকেই। তবে সামাজিক অস্থিরতা ও নানা ধরনের মানসিক চাপ এসব নেতিবাচক আবেগকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাঁর মতে, বর্তমানে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস কমে যাওয়া, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পরকীয়া, দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ এবং সহমর্মিতার ঘাটতি অনেককে হিংস্র করে তুলছে।

তিনি বলেন, কেউ যখন হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন অনেক সময় তার মধ্যে স্বাভাবিক আবেগ ও নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর অপরাধের পর কীভাবে ধরা পড়া থেকে বাঁচা যায়, সেটি নিয়ে চিন্তা শুরু করে।

এ ধরনের অপরাধের পদ্ধতি বিভিন্ন সিনেমা, সিরিজ বা ক্রাইমভিত্তিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অপরাধীদের মাথায় আসতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। তবে এসব কনটেন্টই অপরাধের মূল কারণ নয়; ব্যক্তির মানসিকতা ও সামাজিক পরিবেশের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

তদন্তে বিশেষ ইউনিটের পরামর্শ

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, লাশের পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে হত্যার তদন্ত অনেক কঠিন হয়ে যায়। এতে অপরাধীরা পার পাওয়ার সুযোগ পায়।

তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনায় পুলিশের আরও দক্ষতা ও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতির পাশাপাশি প্রযুক্তি ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র ব্যবহার করে নিহত ব্যক্তির পরিচয় বের করতে হবে।

প্রয়োজনে খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের মতো জটিল হত্যাকাণ্ড তদন্তের জন্য বিশেষ ইউনিট গঠনের পরামর্শও দেন তিনি। দক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে এসব মামলার তদন্ত করানো এবং তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে না রাখার ওপর গুরুত্ব দেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।

ডিএনএ সংরক্ষণ করা হয়

সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল বাশার মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, খণ্ডিত লাশের জন্য আলাদা কোনো পরিসংখ্যান রাখা হয় না। তবে কোনো অজ্ঞাত লাশ বা দেহের অংশ উদ্ধার হলে বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হয়।

প্রথমে ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষাও করা হয়। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় আলামত ও তথ্য দেওয়া হয়।

তিনি জানান, খণ্ডিত দেহ থেকে পাওয়া ডিএনএ ও ভিসেরা রিপোর্ট সংরক্ষণ করে রাখা হয়। পরে কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজন পাওয়া গেলে তাঁদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে সংরক্ষিত নমুনা মিলিয়ে দেখা যায়। এতে পরিচয় শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।

নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বিশেষ নজর

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সব হত্যাকাণ্ডই গুরুতর। তবে যেসব হত্যাকাণ্ডে অতিরিক্ত নৃশংসতা দেখা যায়, সেগুলো পুলিশ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে।

খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনাগুলোও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয় বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, বেশির ভাগ ঘটনায় হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

তবে যেসব ঘটনায় নিহতের পরিচয় বা হত্যাকাণ্ডের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় না, সেসব মামলার তদন্তে স্বাভাবিকভাবেই জটিলতা তৈরি হয়। কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতার ঘাটতি বা পর্যাপ্ত ক্লু না পাওয়ার কারণে তদন্ত ধীরগতির হওয়ার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন।

পরিচয় শনাক্তই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

সবুজবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—নিহত ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা কারা? তাঁদের কোথায় হত্যা করা হয়েছিল? কেন হত্যা করা হলো? আর কারা লাশের অংশগুলো বিভিন্ন স্থানে ফেলে গেল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা যাচাই, ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিএনএ সংরক্ষণ ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে।

তদন্তকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা। কারণ পরিচয় নিশ্চিত হলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ, ভুক্তভোগীর সঙ্গে কার কার যোগাযোগ ছিল এবং শেষ সময়ে তিনি কোথায় ছিলেন—এসব তথ্য বের করার পথ খুলে যাবে।

অন্যদিকে, একের পর এক খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি সমাজের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। হত্যার পর লাশ গুম করতে এমন নৃশংসতার আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করছে। তাই এসব ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।