জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমান, জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য

ডেস্ক রিপোর্ট :

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ।

এর আগে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছেন। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পরিবারের এই ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হচ্ছেন তারেক রহমান।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে। এবারের সাধারণ বিতর্ক বা জেনারেল ডিবেট ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এবং ২৮ সেপ্টেম্বর আবার অনুষ্ঠিত হবে।

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ

আগামীকাল সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। তিনি ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেবেন। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার। সফরে তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে দেশের অবস্থান তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। তাঁর ভাষণে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হবে।

জিয়াউর রহমানের ভাষণ ১৯৮০ সালে

জিয়া পরিবারের জাতিসংঘে অংশগ্রহণের শুরু হয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে তিনি ভাষণ দেন।

তাঁর সেই ভাষণে বিশ্বের ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা বৈষম্য, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

জিয়াউর রহমান প্রশ্ন তোলেন, উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নানা প্রতিশ্রুতি থাকার পরও কেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা থেকে যাচ্ছে। তিনি শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

একই সঙ্গে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

১৩ বছর পর বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া

জিয়াউর রহমানের ভাষণের ১৩ বছর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন তাঁর স্ত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন তিনি। এরপর বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেন খালেদা জিয়া।

জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বক্তব্য দেন তিনি।

১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মারকসভায় বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক জাতিসংঘের ২৭তম বিশেষ অধিবেশনেও তিনি বক্তব্য রাখেন।

এ ছাড়া ২০০৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬০তম অধিবেশনের দুটি পৃথক সভায় বক্তব্য দেন তিনি।

ফলে জিয়া পরিবারের দুই প্রজন্মের পর এবার তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।

বাংলাদেশের নতুন অবস্থান তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভাষণে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক রূপান্তর, উন্নয়নের অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে বিশ্বনেতাদের সামনে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রয়োজন ও অবস্থানও আলোচনায় থাকবে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

এবারও সেই বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট থাকবে অগ্রাধিকারে

প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরে রোহিঙ্গা সংকটও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থাকছে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা রয়েছে।

এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে বাংলাদেশ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতি

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এ কারণে জলবায়ু অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, উন্নয়নের বিভিন্ন অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসতে পারে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোও তুলে ধরার প্রস্তুতি রয়েছে।

জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশের বাড়তি গুরুত্ব

এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২ জুন ২০২৬ এই পদে নির্বাচিত হন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য হলো—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’ বা ‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য ফলপ্রসূ জাতিসংঘ’।

এই অধিবেশনে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, নতুন প্রযুক্তি এবং জাতিসংঘের সংস্কারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা রয়েছে।

ব্যস্ত কর্মসূচি নিয়ে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর এবারের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণের পাশাপাশি একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে এবার তুলনামূলক ছোট একটি প্রতিনিধি দল নিউইয়র্কে যাবে বলে জানানো হয়েছে।

চার দশকের ধারাবাহিকতায় নতুন অধ্যায়

১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের জাতিসংঘে ভাষণের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের যে অধ্যায়ের শুরু, ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণের মাধ্যমে তা আরও বিস্তৃত হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নেন খালেদা জিয়া।

চার দশকের বেশি সময় পর সেই ধারাবাহিকতায় এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দেবেন তারেক রহমান।

তাঁর এই ভাষণের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা ঘটবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার সুযোগ পাবেন তিনি।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বরও সাধারণ বিতর্কের কার্যক্রম রয়েছে।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেন এবং বিশ্বনেতাদের সামনে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বার্তা দেন, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।