ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে যেসব খাবার, জেনে রাখুন
ডেস্ক রিপোর্ট :
ক্যানসার একক কোনো কারণে হয় না। মানুষের বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, জীবনযাপন, পরিবেশ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ—সব মিলিয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
কিছু খাবার নিয়মিত ও বেশি পরিমাণে খেলে শরীরে এমন কিছু রাসায়নিকের প্রভাব পড়তে পারে, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, উচ্চ তাপে পোড়ানো বা ভাজা খাবার এবং কিছু সংরক্ষণকারী উপাদান নিয়ে গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
তবে কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যানসার হবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং কত পরিমাণে, কত ঘন ঘন এবং কীভাবে খাবারটি খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারসিনোজেন কী?
ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন রাসায়নিক পদার্থ, বিকিরণ বা অন্যান্য উপাদানকে সাধারণভাবে কারসিনোজেন বলা হয়। এসব উপাদান শরীরের কোষের ডিএনএতে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। দীর্ঘদিন এমন ক্ষতির প্রভাবে কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কোষ তৈরি হয়ে ক্যানসারের সৃষ্টি হতে পারে।
খাবার রান্না বা সংরক্ষণের কিছু প্রক্রিয়াতেও এমন রাসায়নিক তৈরি হতে পারে। তাই খাবার বাছাইয়ের পাশাপাশি রান্নার পদ্ধতির দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
১. অতিরিক্ত পোড়ানো ও প্রক্রিয়াজাত মাছ-মাংস
মাছ বা মাংস খুব বেশি তাপে রান্না করা, আগুনে ঝলসানো, গ্রিল করা কিংবা কাবাব তৈরির সময় কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হতে পারে।
উচ্চ তাপে রান্নার সময় হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস (HCA) এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (PAH) নামের কিছু যৌগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মাংস সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে এলে বা অতিরিক্ত পুড়িয়ে ফেললে এসব যৌগের পরিমাণ বাড়তে পারে।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত পরিমাণে এমন পোড়ানো বা উচ্চ তাপে রান্না করা মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলন বা বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
তাই মাংস রান্নার সময় অতিরিক্ত পোড়ানো বা কালো হয়ে যাওয়া অংশ নিয়মিত খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো।
২. চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও অতিরিক্ত ভাজা খাবার
আলু, শস্য বা অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবার খুব বেশি তাপমাত্রায় ভাজা বা সেঁকার সময় অ্যাক্রিলামাইড নামের রাসায়নিক তৈরি হতে পারে।
ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলুর চিপস, ক্র্যাকার, অতিরিক্ত ভাজা বিস্কুট, চানাচুরসহ বিভিন্ন খাবারে এই ধরনের যৌগ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
বিশেষ করে খাবার যত বেশি সময় ধরে এবং যত বেশি তাপে ভাজা হয়, তত বেশি অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাই প্রতিদিনের খাবারে অতিরিক্ত চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা তেলেভাজা খাবার না রাখাই ভালো।
শিশুদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের খাবারের পরিমাণ কমানো জরুরি। কারণ ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও ভাজা খাবারের অভ্যাস তৈরি হলে পরবর্তী জীবনে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৩. ফাস্ট ফুড ও ক্ষতিকর চর্বি
বার্গার, পিৎজা, ফ্রাই, চানাচুর, শিঙাড়া, পেঁয়াজু এবং বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ফাস্ট ফুডে অনেক সময় বেশি পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে।
এর মধ্যে ট্রান্সফ্যাট বিশেষভাবে ক্ষতিকর। অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিছু গবেষণায় বেশি ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের সঙ্গে কোলোরেক্টাল, ডিম্বাশয় ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—ফাস্ট ফুডের ক্ষেত্রে শুধু ট্রান্সফ্যাট নয়, অতিরিক্ত ক্যালরি, লবণ, চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত উপাদানও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই মাঝে মধ্যে খাওয়া আর নিয়মিত খাওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
৪. সসেজ, বেকন ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত মাংস
সসেজ, হটডগ, বেকন, হ্যামসহ বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য নানা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
কিছু প্রক্রিয়াজাত মাংসে নাইট্রেট ও নাইট্রাইট জাতীয় সংরক্ষণকারী উপাদান ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এসব উপাদান থেকে ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসারবিষয়ক গবেষণা সংস্থা প্রক্রিয়াজাত মাংসকে ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত খাবারের তালিকায় রেখেছে। বিশেষ করে নিয়মিত ও বেশি পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল বা বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই খাদ্যতালিকায় সসেজ, বেকন বা হটডগের মতো খাবার যতটা সম্ভব সীমিত রাখা ভালো।
এর পরিবর্তে তাজা মাছ, ডাল, ডিম, বাদাম এবং পরিমিত পরিমাণে তাজা মাংস রাখা যেতে পারে।
৫. তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে থাকুন
তামাক কোনো খাবার নয়। তবে ক্যানসারের ঝুঁকির ক্ষেত্রে এটি এত গুরুত্বপূর্ণ যে তালিকায় আলাদা করে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল, সাদাপাতা বা অন্যান্য তামাকজাত পণ্যে বহু ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। তামাকের ধোঁয়া ও তামাকজাত পণ্যের বিভিন্ন উপাদান শরীরে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
তামাক ব্যবহারের সঙ্গে মুখ, গলা, ফুসফুসসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে।
তাই ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি তামাক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।
৬. কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়েও সতর্কতা
ফল ও শাকসবজি আমাদের সুস্থ থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ক্যানসারের ভয় থেকে শাকসবজি বা ফল খাওয়া বন্ধ করার কোনো কারণ নেই।
তবে কৃষিকাজে ব্যবহৃত কিছু কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ খাবারে থেকে যেতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মাত্রায় কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত কীটনাশক ও ভারী ধাতু নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে বাজার থেকে ফল ও সবজি আনার পর পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে প্রবাহমান পানিতে ঘষে ধোয়া ভালো।
খোসা ছাড়ানো যায় এমন ফলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া যেতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শাকসবজি ও ফল খাওয়া বন্ধ নয়, বরং নিরাপদভাবে খাওয়া। কারণ স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় এগুলোর গুরুত্ব অনেক।
৭. অ্যালকোহলও ঝুঁকি বাড়াতে পারে
অ্যালকোহল পান শরীরে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। অ্যালকোহল ভাঙার সময় শরীরে অ্যাসিটালডিহাইড নামের একটি রাসায়নিক তৈরি হয়, যা ক্যানসার সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত।
নিয়মিত অ্যালকোহল পান মুখ, গলা, খাদ্যনালি, লিভার, স্তন ও বৃহদান্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ।
শুধু খাবার নয়, রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ
একই খাবার কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, তার ওপরও স্বাস্থ্যের প্রভাব অনেকটা নির্ভর করে।
যেমন মাছ বা মাংস অতিরিক্ত পুড়িয়ে কালো করে খাওয়ার বদলে কম তাপে ভালোভাবে রান্না করা যেতে পারে। বারবার একই তেল ব্যবহার না করাই ভালো।
অতিরিক্ত তেলেভাজা খাবারের বদলে সেদ্ধ, ভাপানো, ঝোল বা কম তেলে রান্না করা খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।
এতে শুধু ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনাই নয়, হৃদ্রোগ, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তাহলে কী খাবেন?
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে বেশি করে শাকসবজি, বিভিন্ন ধরনের ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন রাখা যেতে পারে।
মাছ, ডিম ও পরিমিত তাজা মাংস খাওয়া যেতে পারে। তবে প্রক্রিয়াজাত মাংস, অতিরিক্ত ভাজা খাবার, ফাস্ট ফুড এবং অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার কমানো ভালো।
পানি পান করতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে। একই সঙ্গে শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও জরুরি।
আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি
কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যানসার হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। আবার কোনো খাবার সম্পূর্ণ নিরাপদ বলেও ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ক্যানসার সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ঝুঁকির সমন্বিত প্রভাবে তৈরি হয়। তাই একটি খাবারকে ভয় পাওয়ার চেয়ে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন ঠিক করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত মাংস, অতিরিক্ত ভাজা ও পোড়ানো খাবার, ফাস্ট ফুড এবং অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস থাকলে তা কমানোর চেষ্টা করা উচিত।
শেষ কথা
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন। খাবারের ক্ষেত্রে তাজা ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অতিরিক্ত পোড়ানো বা ভাজা খাবার এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস কমাতে হবে। পাশাপাশি তামাক ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য কোনো একক খাবার বা কোনো একক নিয়ম নেই। বরং দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন এবং ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায়।
